আগের বছর যেখানে দাঁড়িয়ে পিয়েরের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল সেখানেই তারা ফেরিটা পার হল। কর্দমাক্ত রাস্তা ধরে ঝাড়াই উঠোন ও শীতকালীন গমের সবুজ ক্ষেত পেরিয়ে, কখনো সেতুর কাছে বরফজমা পাহাড়ের উত্রাই বেয়ে, কখনো-বা বৃষ্টিতে গলে যাওয়া কাদার চড়াই ভেঙে, ফসল কাটা মাঠ পেরিয়ে, সবুজের ছোপ-লাগা ঝোঁপঝাড় ডিঙিয়ে রাস্তার দুপাশে গজিয়েওঠা বার্চের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে তারা এগিয়ে চলল। বনের মধ্যে বেশ গরম, বাতাসের ছোঁয়াও লাগছে না। কাঠির মতো সবুজ পাতাওয়ালা বাচগাছগুলি নিশ্চল, লিলাক-রঙের ফুল আর সবুজ ঘাসের প্রথম শিসগুলি মাথা তুলেছে। বাচগাছের ফাঁকে ফাঁকে এখানে ওখানে ছড়ানো ছোট ছোট চিরসবুজ ফারগাছগুলি শীতের অপ্রীতিকর স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। জঙ্গলে ঢুকে ঘোড়াগুলি নাক ডাকাতে লাগল, তাদের শরীরও ঘেমে উঠেছে।
পরিচারক পিতর কোচয়ানকে কী যেন বলল, সেও তাতে সায় দিল। কিন্তু বোঝা গেল যে কোচয়ানের সহানুভূতিকে যথেষ্ট মনে না করে পিতর বক্সের উপর থেকেই মনিবের দিকে ফিরে সশ্রদ্ধ হাসির সঙ্গে বলল, কী চমৎকার ইয়োর এক্সেলেন্সি!
কী?
বড় চমৎকার ইয়োর এক্সেলেন্সি!
প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, ওক কিসের কথা বলছে? মনে হচ্ছে, বসন্তের কথা। সত্যি, এর মধ্যেই সবকিছু কেমন সবুজ হয়ে উঠেছে।… এত আগে থেকেই! বার্চ, চেরি ও অ্যান্ডার গাছের পাতা বেরিয়েছে… কিন্তু ওকগাছের এখনো দেখা নেই। আরে, এই তো একটা ওক!।
পথের প্রান্তেই একটা ওকগাছ দাঁড়িয়েছিল। সম্ভবত এই বার্চের জঙ্গলের চাইতে বয়সে দশগুণ বড় এই ওকগাছটা ওগুলোর চাইতে দশগুণ মোটা এবং দুগুণ উঁচু। গাছটা প্রকাণ্ড, একটা লোক যতটা জড়িয়ে ধরতে পারে তার দ্বিগুণ এর বেড়টা, অনেকদিন আগেই ডালপালা অনেক ভেঙে গেছে, অনেক বাকল কেটে তুলে নেয়া হয়েছে। মস্ত বড় বড় বিশ্রী ডালপালাগুলো এলোমেলোভাবে বেড়ে উঠেছে। কেমন গিট-পাকানো হাত ও আঙুল, দেখে মনে হয়, হাসি-হাসি বার্চগাছগুলি মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কঠোর ও ঘৃণ্য এক বুড়ো দানব। কেবল জঙ্গলের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু মড়ার মতো দেখতে ফারগাছ এবং ওকগাছটাই যেন বসন্তের মাধুর্যের কছে হার মানতে চাইছে না, চাইছে না বসন্ত ও তার রোদকে চোখ মেলে দেখতে।
ওকটা যেন বলতে চাইছে, বসন্ত, ভালোবাসা, সুখ! এইসব অর্থহীন, ফাঁকা বুলি অনবরত শুনতে কি তোমাদের ক্লান্তি আসে না? সব সময়ই সেই এক কথা, সর্বদাই ফাঁকি! এখানে বসন্ত নেই, সূর্য নেই, সুখ নেই! এই কুঁকড়ে-যাওয়া মরা ফারগুলোকে দেখ, চিরদিন একই আছে, আমাকে দেখ, কখনো পিঠ থেকে কখনো পাশ থেকে যেমন খুশি গজিয়ে ওঠা আমার এই ভাঙা, বাকল-ঢাকা আঙুলগুলো বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি : এগুলো যেমন গাজিয়েছে আমিও তেমনি দাঁড়িয়ে আছি, তোমাদের আশা, তোমাদের মিথ্যাকে আমি বিশ্বাস করি না।
জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে প্রিন্স আন্দ্রু বার বার ফিরে ফিরে ওক গাছটার দিকে তাকাতে লাগল, যেন তার কাছ থেকে কিছু আশা করছে। ওক গাছটার নিচেও ফুল ও ঘাস রয়েছে, কিন্তু তাদের মাঝখানেই গাছটা দাঁড়িয়ে আছে সেই একই কঠিন, বিকৃত, রূঢ় আকৃতি নিয়ে।
প্রিন্স আন্দ্রু মনে মনে বলল, হ্যাঁ, ওকের কথাই ঠিক, হাজারবার ঠিক! অন্যরা–যুবকরা–এই ফকির কাছে নতুন করে মাথা নোয়াক, কিন্তু আমরা তো জীবনকে চিনেছি, আমাদের জীবন তো শেষ হয়ে গেছে।
এই গাছটাকে ঘিরে তার মনের মধ্যে আশাহীন কিন্তু শোচনীয়ভাবে প্রীতিপ্রদ নতুন চিন্তার স্রোত বইতে লাগল। এই যাত্রাকালে সে যেন নতুন করে জীবনকে দেখতে শিখল, আশাহীনতার মধ্যেও সেই পুরনো শান্তিময় সিদ্ধান্তে উপনীত হল, তার দিক থেকে নতুন করে শুরু করার কিছু নেই–কিন্তু তাকে বেঁচে থাকতে হবে, কারো কোনো ক্ষতি না করে, নিজেকে বিব্রত না করে, বা কোনো কিছু কামনা না করেই খুশি থাকতে হবে।
.
অধ্যায়–২
যে রিয়াজান জমিদারির সে একজন অছি তার ব্যাপারেই এ জেলার মার্শাল অব দি নবিলিস্টের সঙ্গে দেখা করতেই প্রিন্স আন্দ্রু এসেছে। কাউন্ট ইলিয়া রস্তভই সেই মার্শাল। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রিন্স আন্দ্রু তার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
বসন্তকালের গরম আবহাওয়া। গোটা জঙ্গলটা এর মধ্যেই সবুজে ঢেকে গেছে। ধুলো উড়ছে, আর এত গরম পড়েছে যে পথের পাশে পানি দেখলেই ডুব দিতে ইচ্ছা করছে।
মার্শালের সঙ্গে কী কথা বলবে সে-কথা ভাবতে ভাবতে বিষণ্ণ মনে প্রিন্স আন্দ্রু অত্রাদণুতে অবস্থিত রস্তভদের বাড়ির সামনে দিয়েই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল। ডান দিকে গাছের ওপারে কিছু মেয়েলি গলায় খুশির কথাবার্তা কানে এল, সে দেখতে পেল একদল মেয়ে তার গাড়ির সামনে দিয়ে পথটা পার হবার জন্য ছুটে আসছে। সকলের আগে আগে আসছে একটি সুন্দরী মেয়ে, কালো চুল, ছিপছিপে চেহারা, হলুদ ছিটকাপড়ের পোশাক, মাথায় জড়ানো সাদা রুমালের নিচে ঝুলে পড়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ চুল। মেয়েটির চিৎকার করে কী যেন বলছে, কিন্তু যখন বুঝল যে সে অপরিচিত লোক তখন তার দিকে না তাকিয়েই হাসতে হাসতে ছুটে গেল।
হঠাৎ কী জানি কেন সে একটা যন্ত্রণা বোধ করল। দিনটা সুন্দর, সূর্য ঝলমল করছে, চারদিকে খুশির আমেজ, কিন্তু ওই ছিপছিপে সুন্দর মেয়েটি, তার অস্তিত্বের কথাটাই জানল না, জানতে চাইল না, নিজের উজ্জ্বল ও সুখী-হয়তো-বা নির্বোধ-জীবনটা নিয়েই সে পরিতুষ্ট, খুশি। কী নিয়ে সে এত খুশি? সে কী ভাবছে? নিশ্চয়ই সামরিক আইন-কানুন অথচ রিয়াজানের ভূমিদাসদের ব্যবস্থার কথা নয়। তাহলে সে কী ভাবছে? কেন সে এত সুখী? সহজাত কৌতূহলবশেই প্রিন্স আন্দ্রু নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগল।
