আমি তো সম্রাটের সম্পর্কে একটা কথাও বলিনি! অফিসারটি বলল। রস্তভের এই রাগের কারণ বুঝতে না পেরে সে ধরে নিল যে রস্তভ মাতলামি শুরু করেছে।
কিন্তু রস্তভ তার কথায় কান দিল না।
বলতে লাগল, আমরা তো কূটনীতিক কর্মচারী নই, আমরা সৈনিক, তার বেশি কিছু নই। আমাদের যদি মরতে হুকুম দেয়া হয় তো আমাদের মরতেই হবে। যদি শাস্তি দেয়া হয় তো বুঝতে হবে যে শাস্তি আমাদের প্রাপ্য, বিচারের ভার আমাদের হাতে নয়। সম্রাট যদি বোনাপার্তকে সম্রাট বলে মেনে নেন, তার সঙ্গে যদি সন্ধি করে থাকেন, তো বুঝতে হবে যে সেটাই সঠিক কাজ। একবার যদি আমরা সবকিছু নিয়ে বিচার করতে, তর্ক করতে শুরু করি, তাহলে পবিত্র বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না! সে-পথে গেলে আমরা বলতে শুরু করব যে ঈশ্বর নেই–কিছুই নেই, টেবিলে ঘুষি মেরে নিকলাস চিৎকার করে বলতে লাগল।
আমাদের কাজ কর্তব্য পালন করা, যুদ্ধ করা, চিন্তা-ভাবনা করা নয়! বাস, তাহলেই হল… সে বলল।
জনৈক অফিসার আপোসে বলল, আর মদ খাওয়া।
হ্যাঁ, মদ খাওয়া, নিকলাস কথাটা মেনে নিল। এই, কে আছিস! আর এক বোতল! সে হাঁক দিয়ে বলল।
.
অধ্যায়-২২
১৮০৮ সালে সম্রাট নেপোলিয়নের সঙ্গে নতুন করে সাক্ষাৎ করতে সম্রাট আলেক্সান্দার এরফুর্তে গেল। পিটার্সবুর্গের উপর মহলে এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারের অনেক জাঁকজমকের কথা শোনা গেল।
১৮০৯ সালে পৃথিবীর দুই সালিস-নেপোলিয়ন ও আলেক্সান্দারকে এইভাবেই উল্লেখ করা হত-এর মধ্যে এতই ঘনিষ্ঠতা জন্মাল যে নেপোলিয়ন যখন অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল তখন আমাদের প্রাক্তন মিত্র অস্ট্রিয়ার সম্রাটের বিরুদ্ধে আমাদের প্রাক্তন শক্ত বোনাপার্তের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য একটি রুশ সৈন্যদল সীমান্ত পার হয়ে গেল, এবং দরবারমহলে নেপোলিয়নের সঙ্গে আলেক্সান্দারের এক বোনোর বিয়ের সম্ভাবনার কথাও আলোচিত হতে লাগল। কিন্তু বৈদেশিক নীতির কথা ছাড়াও সেই সময় সরকারের বিভিন্ন বিভাগে যে সব অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন করা হচ্ছিল তার প্রতিও রুশ সমাজের সকলেরই তীক্ষ্ণ মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছিল।
ইতিমধ্যে জীবনের ধারা সত্যিকারের জীবন, তার স্বাস্থ্য ও রোগ, পরিশ্রম ও বিশ্রাম, চিন্তায়, বিজ্ঞানে, কাব্যে, সঙ্গীতে, ভালোবাসায়, বন্ধুত্বে, বিদ্বেষে ও আবেগে তার যে বৌদ্ধিক আগ্রহ–সবকিছুকে নিয়ে যে জীবনের ধারা তা স্বাভাবিক গতিতেই বয়ে চলতে লাগল, নেপোলিয়নের রাজনৈতিক বন্ধুত্ব বা শত্রুতা এবং পুনর্গঠনের সবরকম পরিকল্পনার স্পর্শ থেকে দূরে থেকে স্বাধীনভাবেই বয়ে চলল। [প্রথম খণ্ড সমাপ্ত]
০৬. প্রিন্স আন্দ্রু
দ্বিতীয় খণ্ড – ষষ্ঠ পর্ব – অধ্যায়-১
প্রিন্স আন্দ্রু একটানা দুটো বছর গ্রামে কাটাল। পিয়ের তার জমিদারিতে যে-সব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল এবং অনবরত একটা ছেড়ে অন্যটায় হাত দেয়ার ফলে কোনোটাই সমাধা করতে পারেনি প্রিন্স আন্দ্রু কোনোরকম আড়ম্বর না করে কোনোরকম আপাত অসুবিধা ছাড়াই সেগুলিকে কার্যে রূপায়িত করে তুলতে লাগল।
তার মধ্যে বাস্তব কর্ম-তৎপরতা এত বেশি পরিমাণে ছিলসেটা পিয়েরের মধ্যে একেবারেই ছিল না–যে-কোনোরকম হৈ-হট্টগোল ছাড়াই কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে চলতে লাগল।
তার একটা জমিদারিতে তিনশো ভূমিদাসকে মুক্তি দেয়া হয়েছে, এখন তারা স্বাধীন ক্ষেতমজুর হয়ে কাজ করছে রাশিয়াতে এ ধরনের প্রথম দৃষ্টান্তগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। অন্য সব জমিদারিতেও কিছু অর্থের বিনিময়ে ভূমিদাসদের বাধ্যতামূলক শ্রমদান মকুব করা হয়েছে। তার নিজের খরচে বোণ্ডচারোতভারের জন্য একজন শিক্ষাপ্রাপ্ত ধাত্রীকে নিয়োগ করা হয়েছে, আর চাষী ও পারিবারিক ভূমিদাসদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য একজন পুরোহিতকে মাইনে দেয়া হচ্ছে।
প্রিন্স আন্দ্রু অর্ধেক সময় কাটায় বল্ড হিলসে তার বাবা ও ছেলের সঙ্গে। ছেলেটি এখনো ধাত্রীর হাতেই মানুষ হচ্ছে। বাকি সময়টা কাটায় বোচারোভো আশ্রমে, প্রিন্স আন্দ্রুর জমিদারিকে তার বাবা ওই নামেই ডাকে। পিয়েরের কাছে জাগতিক ব্যাপার সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীনতা প্রকাশ করলেও সে কিন্তু বেশ পরিশ্রমসহকারেই সাম্প্রতিক ঘটনাবলির উপর নজর রাখে, তার কাছে অনেক বইপত্রও আসে, আর জীবনের ঘূর্ণাবর্তরূপ পিটার্সবুর্গ থেকে তার কাছে বা তার বাবার কাছে যে-সব অতিথি আসে, দেশের এবং বিদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে তাদের জ্ঞান তার চাইতে এত কম যে তা দেখে প্রিন্স আন্দ্রুর বিস্ময়ের অবধি থাকে না, অথচ সে তো গ্রাম ছেড়ে কোথাও যায় না।
জমিদারির কাজে ব্যস্ত থাকা এবং নানা ধরনের বইপড়া ছাড়াও এই সময়ে আমাদের দুটি দুর্ভাগ্যজনক বিগত অভিযান সম্পর্কে একটি বিশ্লেষণাত্মক জরিপের কাজ নিয়েও প্রিন্স আন্দ্রু খুবই ব্যস্ত রয়েছে, সামরিক বিধি-বিধান সংস্কারের একটা খসড়াও সে তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছে।
১৮০৯-এর বসন্তকালে সে ছেলের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রিয়াজান জমিদারি দেখতে সেখানে গেল।
বসন্তের আতপ্ত রোদে বসে চোখ মেলে সে দেখছিল নতুন ঘাস, বাচগাছের ডালে ডালে নতুন পাতা, আর পরিষ্কার নীল আকাশে ভেসে-চলা বসন্তের সাদা মেঘের দল। কোনো কিছু নিয়েই সে ভাবছে না, অন্যমনস্কভাবে আনন্দিত মনে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সবকিছু দেখছে।
