কজলভস্কি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সৈন্যদের বিচার করতে লাগল, রস্তভও সে বিচারের মধ্যে পড়ল।
আমাকে কী? রস্তভ ভাবল।
ভুরু কুঁচকে কর্নেল হাঁকল, লাজারেভ! সারির প্রথম সৈনিকটি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল।
কোথায় চললে? এখানেই দাঁড়াও! কয়েকজন ফিসফিস করে লাজারেভকে বলল। কোথায় যেতে হবে বুঝতে না পেরে লাজারেভ থেমে গেল, সভয়ে তাকাল, কর্নেলের দিকে। তার মুখটা কুঁচকে উঠছে।
নেপোলিয়ন মাথাটা একটু সরাল, যেন কোনো কিছু নেয়ার জন্য ভোলা ছোট হাতটা পিছন দিকে বাড়িয়ে দিল। সে কী চাইছে বুঝতে পেরে পার্ষদরা হাতে হাতে একটা জিনিস এগিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে পরস্পরকে কী যেন বলল, আর শেষপর্যন্ত বালকভৃত্যটি গতকাল সন্ধ্যায় রস্তভ যাকে বরিসের বাসায় দেখেছিল–দৌড়ে এগিয়ে গেল এবং বাড়ানো হাতটাকে সসম্মানে অভিবাদন জানিয়ে মুহূর্তমাত্র অপেক্ষা না করে লাল ফিতেয় বাঁধা সম্মানচিহ্নটি হাতের উপর রেখে দিল। নেপোলিয়ন না তাকিয়েই দুই আঙুলের ফাঁকে সেটাকে ধরে নিল। তারপর সে লাজারেভের দিকে এগিয়ে গেল, সম্রাট আলেক্সান্দারের দিকে একবার তাকাল এবং সম্মানচিহ্নসহ ছোট হাতখানি লাজারেভের একটি বোমকে স্পর্শ করল। নেপোলিয়ন কুশটিকে লাজারেভের বুকের উপর শুধু রেখে দিল, তারপর হাতটা নামিয়ে আলেক্সান্দারের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, যেন সে নিশ্চিত জানে যে কুশটা সেখানেই আটকে থাকবে। আর সত্যি সত্যি তাই থাকল।
রুশ ও ফরাসি কর্মচারীরা সঙ্গে সঙ্গে কুশটিকে ধরে তার ইউনিফর্মে আটকে দিল। লাজারেভ বিষণ্ণ চোখে ছোট মানুষটিকে একবার দেখে নিয়ে আলেক্সান্দারের চোখে চোখ রাখল, যেন জানতে চাইল, সে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে, না চলে যাবে, না অন্যকিছু করবে। কিন্তু কোনো হুকুম না পেয়ে সেখানেই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সম্রাটদ্বয় পুনরায় ঘোড়ায় চেপে চলে গেল। প্রিয়োব্রাঝেন সৈন্যরা দল ভেঙে ফরাসি রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে মিশে গিয়ে খাবার টেবিলে বসে পড়ল।
লাজারেভ বসল সম্মানের আসনে। রুশ ও ফরাসি অফিসাররা তাকে আলিঙ্গন করল, অভিনন্দন জানাল, তার হাত চেপে ধরল। দলে দলে অফিসার ও নাগরিকরা শুধু তাকে দেখার জন্য ভিড় করল। হাসি ও গল্পে টেবিল জমে উঠল। দুজন খুশি-খুশি অফিসার রস্তভের পাশ দিয়ে চলে গেল।
একজন বলল, জিনিস কী রকম বলে মনে হয়? সবটাই রুপোর পাতের উপর। লাজারেভকে দেখেছ?
দেখেছি।
শুনলাম প্রিয়োব্রাঝেনস্কিরা কাল তাকে ডিনার দেবে।
হ্যাঁ, কিন্তু লাজারেভের কী কপাল! আজীবন বারোশ ফ্রা পেনশন।
জনৈক প্রিয়োব্রাঝেনস্কি সৈনিক একটা ফরাসি টুপি মাথায় দিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ছেলেরা, এই একটা টুপি!
খুব ভালো জিনিস! একেবারে সেরা!
রক্ষীবাহিনীর জনৈক অফিসার আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করল, সাংকেতিক শব্দটা শুনেছ কি? গত পরশু ছিল নেপোলিয়ন, ফ্রান্স, ব্রেভুরে, গতকাল ছিল আরেক্সান্দ্র, রুশি, গ্রাদিয়র। একদিন আমাদের সম্রাট ওটা দেন, পরের দিন দেন নেপোলিয়ন। কাল আমাদের সম্রাট একটি সেন্ট জর্জ ক্রুশ পাঠাবেন ফরাসি রক্ষীবাহিনীর সবচাইতে সাহসী বীরের জন্য। তা তো করতেই হবে। দানের প্রতিদান তো দিতেই হবে।
বন্ধু ঝিলিনস্কিকে নিয়ে বরিসও এসেছিল প্রিয়োব্রাঝেনস্কিদের ভোজসভা দেখতে। ফেরার পথে দেখল, একটা বাড়ির কোণে রস্তভ দাঁড়িয়ে আছে।
রস্তভ! কেমন আছ? আর তো আমাদের দেখাই হয়নি, সে বলল। রস্তভের মুখটা এতই বিষণ্ণ ও চিন্তাগ্রস্ত ছিল যে বরিস তার কারণ জিজ্ঞাসা না করে পারল না।
কিছু না, কিছু না, রস্তভ জবাব দিল।
আবার আমাদের দেখা হবে তো?
হ্যাঁ, হবে।
সেই কোণটাতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রস্তভ দূর থেকে ভোজসভাটা দেখতে লাগল। তার মনের মধ্যে একটা ব্যথার ধারা বয়ে চলেছে। তার শেষ নেই। ভয়ঙ্কর সব সন্দেহ জেগেছে তার অন্তরে। তার মনে পড়ল দেনিসভের পরিবর্তন, তার কথা, গোটা হাসপাতাল, দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হাত-পা, আবর্জনা ও রোগ। হাসপাতালের পচা মাংসের দুর্গন্ধ এত তীব্র হয়ে তার মনে পড়ল যে সে-দুর্গন্ধ কোথা থেকে আসছে জানার জন্য সে চারদিকে তাকাতে লাগল। তারপরেই মনে এল আত্মতুষ্ট বোনাপার্তের কথা, যে আজ সম্রাট হয়েছে, আলেক্সান্দারও যাকে পছন্দ করে, শ্রদ্ধা করে। তাহলে কেন এইসব বিচ্ছিন্ন হাত-পা, আর মৃত মানুষের ভিড়?… আবার মনে এল পুরস্কৃত লাজারেভ এবং দেনিসভের কথা–যে শাস্তি পেল, ক্ষমা পেল না। এমন সব চিন্তা তার মাথায় ঢুকতে লাগল যে সে ভয় পেয়ে গেল।
প্রিয়োব্রাঝেনস্কিদের খাদ্যের গন্ধে তারও ক্ষিধে পেয়ে গেল, এখান থেকে যাবার আগে কিছু খাওয়া দরকার। একটা হোটেলে গেল। সেখানে আরো অনেক লোক খেতে এসেছে। নিকলাস নিঃশব্দে পান-ভোজন (বিশেষ করে প্রথমটা) শেষ করল। একই দুবোতল মদ সাবাড় করল। মনের মধ্যেকার সেই চিন্তাগুলো এখনো তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। না পারছে তাকে প্রকাশ করতে, না পারছে তাকে মন থেকে তাড়াতে। হঠাৎ একজন অফিসার যেই বলে উঠল যে ফরাসিদের দিকে তাকানোটাই অসম্মানকর অমনি রস্তভ এমন অপ্রত্যাশিতভাবে চেঁচিয়ে উঠল যে অন্য অফিসাররা অবাক বনে গেল।
চোখ মুখ লাল করে সে চেঁচিয়ে বলল, কী ভালো তার আপনারা কী বোঝেন? সম্রাটের কাজের সমালোচনা করবার আপনারা কে? কী অধিকার আপনাদের? সম্রাটের লক্ষ্য বা তার কাজকর্মকে বুঝবার ক্ষমতা আমাদের নেই!
