অসামরিক পোশাকে আপনি এখানে কী করছেন স্যার?
লোকটি অশ্বারোহী বাহিনীর একজন সেনাপতি, এই অভিযানের সম্রাটের বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করেছে, আগে রস্তভের সঙ্গে একই সেনাদলে ছিল।
তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে রস্তভ সব কথা খুলে বলল, দেনিসভের ব্যাপারে তার সাহায্য চাইল। সব কথা শুনে সেনাপতিটি গম্ভীরভাবে মাথা নাড়তে লাগল।
ভালো মানুষটির জন্য আমি দুঃখিত, খুবই দুঃখিত। চিঠিটা দিন।
রস্তভ সবে চিঠিটা তার হাতে দিয়ে দেনিসভের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছে এমন সময় সিঁড়িতে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল, সেনাপতিটি তাকে রেখে বারান্দায় এগিয়ে গেল। ম্রাটের পর্ষদরা সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে এসে যার যার ঘোড়র কাছে চলে গেল। সম্রাটের ঘোড়ার পরিচিত পদশব্দ রস্তভের কানে এল। ধরা পড়ে যাওয়ার বিপদকে ভুলে গিয়ে কয়েকজন কৌতূহলী নাগরিকের সঙ্গে রস্তভও বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল, দুই বছর পরে আর একবার দেখতে পেল তার সেই প্রিয় মূর্তি, সেই একই মুখ, একই দৃষ্টি, একই পদক্ষেপ, মহিমা ও নম্রতার সেই একই সহাবস্থান… সম্রাটের প্রতি আকর্ষণ ও অনুরাগের সেই পুরনো অনুভূতি নতুন করে জাগল রস্তভের অন্তরে। প্রিয়োব্রাজেনস্ক রেজিমেন্টের ইউনিফর্ম-সাদা শ্যাময় চামড়ার ব্রিচেস ও উঁচু বুট পরে বুকে একটা স্টার লাগিয়ে সম্রাট বারান্দায় নেমে এল, হাতে দস্তানা পরা, বগলের নিচে টুপি। থেমে একবার চারদিকে তাকাল, তার দৃষ্টিপাতে সবকিছু যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কয়েকজন সেনাপতির সঙ্গে কিছু কথা বলে রস্তভের সেনাদলের প্রাক্তন কম্যান্ডারকে চিনতে পেরে সম্রাট হেসে ইশারায় তাকে কাছে ডাকল।
দলের অন্য সকলে সরে গেল, রস্তভ দেখল, সেনাপতিটি কিছু সময় সম্রাটের সঙ্গে কথাবার্তা বলল।
তার সঙ্গে কথা শেষ করে সম্রাট ঘোড়ার দিকে এক পা এগিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার পার্ষদবর্গ ও পথের। দর্শনার্থীরা ম্রাটের দিকে এগিয়ে গেল। ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে জিনটা ধরে সম্রাট অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতির দিকে মুখ ফেরাল, যাতে সকলে শুনতে পায় সেভাবে উচ্চকণ্ঠে বলল, এ-কাজ আমি করতে পারি না সেনাপতি। আমি পারি না, তাছাড়া আইন আমার চাইতেও বেশি শক্তিমান। সম্রাট পাদানিতে পা দিল।
সেনাপতি সম্মানে মাথা নোয়াল, সম্রাট ঘোড়ার পিঠে চেপে জোরকদমে রাজপথে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। উৎসাহে আত্মহারা হয়ে জনতার সঙ্গে সঙ্গে রস্তভও তার পিছন পিছন ছুটতে লাগল।
.
অধ্যায়-২১
ঘোড়ায় চেপে সম্রাট স্কোয়ারে গিয়ে হাজির হল। সেখানে দুই দল সৈন্য মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, প্রিয়োব্রাঝেনস্ক রেজিমেন্টের দলটি ডাইনে, আর টুপিপরা ফরাসি রক্ষীবাহিনীর সেনাদলটি বাঁ দিকে।
জার কাছে আসতেই সেনাদল তাকে অভিবাদন জানাল, সে-সময়ই আর একদল অশ্বারোহী এগিয়ে এল, রস্তভ চিনল তাদের সকলের আগে নেপোলিয়ন। আর কেউ হতে পারে না। সে এগিয়ে এল দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে, মাথায় ছোট টুপি, পরনে সাদা কুর্তার উপর নীল ইউনিফর্ম, কাঁধের উপর সেন্ট এন্ডরুজ ফিতেটি ঝোলানো। জরির কাজকরা লাল রঙের জিনে সাজানো একটা ভালো জাতের আরবি ঘোড়ায় চেপে সে এসেছে। আলেক্সান্দারের কাছে গিয়ে নেপোলিয়ন মাথার টুপিটা তুলল। সৈন্যরা চিৎকার করে উঠল হুররা!-ভিতা লা এম্পোরিয়র! দুইজনে কোনো কথা হল না, দুই সম্রাট গোড়া থেকে নেমে পরস্পরের হাত ধরল। নেপোলিয়নের মুখে অপ্রীতিকর কৃত্রিম হাসি, আলেক্সান্দারের মুখে শিষ্টাচারের বাণী।
রস্তভ যখন দেখল আলেক্সান্দার বোনাপার্তের সঙ্গে সমকক্ষের মতো ব্যবহার করছে, আর নেপোলিয়নও এমন সহজভাবে জারের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে যেন সম্রাটের সঙ্গে এ ধরনের মেলামেশাটা তার কাছে প্রাত্যহিক ঘটনারই মতো, তখন তার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
আলেক্সান্দার ও নেপোলিয়ন ভিড়ের একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। সমবেত জনতা তখন অপ্রত্যাশিতভাবে দুই সম্রাটের এত কাছাকাছি এসে পড়েছে যে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে রস্তভের ভয় হল যে তার পরিচয় হয়তো প্রকাশ পেয়ে যাবে।
জনাব, আপনার সৈন্যদের মধ্যে যে সবচাইতে সাহসী তাকে সম্মানপদকে ভূষিত করার অনুমতি দিন, প্রতিটি শব্দকে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে একটি তীক্ষ্ণকণ্ঠে কথাগুলি বলা হল।
আলেক্সান্দারের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে কথাগুলি বলল হ্রস্বকায় নেপোলিয়ন। কথাগুলি মনোযোগ দিয়ে শুনে আলেক্সান্দার মাথা নিচু করে মদুর হাসি হাসল।
সম্মুখে দণ্ডায়মান রুশ সেনিকদের দিকে তাকিয়ে প্রতিটি শব্দকে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে নেপোলিয়ন আরো বলল, বিগত যুদ্ধে যে সবচাইতে অধিক সাহসের পরিচয় দিয়েছে তাকে…
ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি কি কর্নেলের সঙ্গে একটা পরামর্শ করতে দেবেন? এই কথা বলে আলেক্সান্দার অতি দ্রুত পা ফেলে ভারপ্রাপ্ত কম্যান্ডার প্রিন্স জলভস্কির দিকে এগিয়ে গেল।
ইতিমধ্যে বোনাপার্ট হাতের দস্তানা খুলতে গিয়ে সেটা ছিঁড়ে ফেলে দিল। জনৈক এড-ডি-কং পিছন থেকে ছুটে এসে সেটা তুলে নিল।
সম্রাট আলেক্সান্দার নিচু গলায় কজলভস্কিকে জিজ্ঞাসা করল, ওটা কাকে দেওয়া যায়?
ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি যাকে দিকে বলবেন।
অসন্তোষের সঙ্গে দুটো ভুরুকে এক করে পিছনে তাকিয়ে সম্রাট বলল, কিন্তু ওকে তো একটা জবাব দিতে হবে।
