এ রকম ঘটনার কথা আমি আগেও শুনেছি, আমি জানি মহামান্য সম্রাট এসব ব্যাপারে খুবই কড়া। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারটা সম্রাটের কাছে না নিয়ে সেনাদলের অধিনায়কের কাছে আবেদন করাই ভালো।… তবে সাধারণভাবে আমি মনে করি…
তার মানে তুমি কিছু করতে চাও না? বেশ তো, তাই বলে দাও! বরিসের মুখের দিকে না তাকিয়েই রস্তভ চেঁচিয়ে বলে উঠল। বরিস হাসল।
তা নয়। বরং আমি যতটা পারি তা করব। শুধু আমার মনে হল…
ঠিক সেই সময় ঝিলিনস্কি বরিসকে ডাকল।
ওই তো, যাও, যাও, যাও…রস্তভ বলল। সে খাবার টেবিলেও গেল না, ছোট ঘরটাতে একাই রইল, পাশের ঘরের ফরাসি ভাষায় হালকা কথা-বার্তা শুনতে শুনতে অনেকক্ষণ ধরে সে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল।
.
অধ্যায়-২০
রস্তভ এমন একটা দিনে তিলজিত এসেছিল যেটা দেনিসভের আবেদনপত্র পেশ করার পক্ষে মোটেই উপযুক্ত ছিল না। সেনাপতির কাছে সে নিজে যেতে পারল না কারণ সে এসেছে সাদা পোশাকে আর তাও এসেছে কোনোরকম অনুমতি না নিয়ে, আবার ইচ্ছা থাকলেও বরিস পরের দিন তার সঙ্গে দেখা করতে পারত না। পরের দিন অর্থাৎ ২৭ জুলাই সন্ধির প্রাথমিক কাগজপত্রে সাক্ষর করা হল। সম্রাটদ্বয় পদক বিনিময় করল : আলেক্সান্দার গ্রহণ করল, লিজিয়ন অব অনার ক্রুশ আর নেপোলিয়ন পেল প্রথম ডিগ্রির সেন্ট আলু অর্ডার, সন্ধ্যায় একটা ভোজসভার আয়োজন করা হল, উভয় সম্রাটই তাতে যোগ দিল।
বরিসের সঙ্গ রস্তভের কাছে এতই অস্বস্তিকর মনে হল যে ভোজন সেরে সে যখন ফিরে এল রস্তভ তখন ঘুমের ভান করে পড়ে রইল এবং পরদিন সকালে বরিসের সঙ্গে দেখা না করেই চলে গেল। বেসামরিক পোশাকে গেলে টুপি মাথায় দিয়ে সে শহরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল, রাজপথে ইউনিফর্মপরা ফরাসিকে দেখল, যে-সব বাড়িতে রুশ ও ফরাসি সম্রাটরা আছে তা দেখল। একটা স্কোয়ারে দেখল ভোজসভার জন্য টেবিল পাতা হয়েছে, রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশ রুশ ও ফরাসি পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে, তাতে বড় বড় হরফে এ. ও এন. লেখা। বাড়ির দরজায়-দরজায়ও নিশান টাঙানো হয়েছে।
নিকলাস ভাবতে লাগল, বরিস আমাকে সাহায্য করতে চায় না, আমিও তাকে সাহায্যের কথা বলতে চাই না। আমাদের মধ্যে সব চুকেবুকে গেছে, কিন্তু দেনিসভের জন্য যা করা সম্ভব তা না করে, বিশেষ করে তার চিঠিটা ম্রাটের কাছে পৌঁছে না দিয়ে আমি এখান থেকে যাচ্ছি না। সম্রাট!… তিনি তো এখানেই আছেন! আলেক্সান্দারের বাসভবনের সামনে এসে পড়ায় কথাটা রশুভের মনে হল।
সুসজ্জিত ঘোড়াগুলি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন হাজির হয়েছে। সম্রাটের বের হবার সময় হয়েছে।
রস্তভ ভাবতে লাগল, যে-কোনো মুহূর্তে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। চিঠিটা সরাসরি তার হাতে দিয়ে যদি বলি… অসামরিক পোশাকের জন্য তারা কি সত্যি আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে? নিশ্চয়ই না! ন্যায়ের পাল্লা কার দিকে সেটা তিনি বুঝতে পারবেন। তার মতো ন্যায়বান, উদারচিত্ত আর কে হতে পারে? আর এখানে এসেছি বলে তারা যদি আমাকে গ্রেপ্তারই করে, তাতেই বা কী?… লোকজন তো ভিতরে যাচ্ছেই… যতসব বাজে কথা! ভিতরে গিয়ে নিজের হাতেই চিঠিটা ম্রাটের হাতে তুলে দেব। সঙ্গে সঙ্গে একটা অপ্রত্যাশিত দৃঢ়তা রস্তভকে পেয়ে বসল, পকেটের চিঠিটাকে চেপে ধরে সে সোজা বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল।
সে ভাবল, অস্তারলিজে যে সুযোগ হারিয়েছি সে সুযোগ আজ আর হারাব না। তার পায়ের উপর পড়ে মিনতি করব। তিনি আমাকে তুলে ধরবেন, আমার কথা শুনবেন, এমনকি আমাকে ধন্যবাদ দেবেন। কারো ভালো করতে পারলে আমি খুশি হই, আর অন্যায়ের প্রতিকারই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সুখ, বস্তভ কল্পনায় যেন সম্রাটের কথাগুলি শুনতে পেল। অনেক লোকজনকে কাটিয়ে সে সম্রাটের ভবনের বারান্দায় পৌঁছে গেল।
একজন জিজ্ঞেস করল, কী চাই?
কাঁপা গলায় নিকলাস বলল, একটা চিঠি, একটা আবেদনপত্র ম্রাটের হাতে দিতে চাই।
আবেদনপত্র? এইদিকে, ভারপ্রাপ্ত অফিসারের কাছে চলে যান (নিচে যাবার সিঁড়িটা দেখিয়ে দিল), তবে ওটা কেউ নেবে না।
তার নির্বিকার কণ্ঠস্বরে রস্তভ ভয় পেয়ে গেল, ভাবল সেখান থেকে চলে যাবে, কিন্তু ততক্ষণে লোকটি দরজাটা খুলে ধরেছে, আর রস্তভও ভিতরে ঢুকে গেল।
সাদা ব্রিচেস, উঁচু বুট ও সুতির শার্টপরা বছর তিরিশ বয়সের একটি হ্রস্বকায় জোয়ান লোক ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার খানসামা ব্ৰিচেসের বোম এঁটে দিচ্ছে।
এটা কী? আবেদনপত্র?
আবার আবেদনপত্র?
ওকে পরে আসতে বলে দাও। তিনি এখুনি বেরিয়ে আসবেন, আমাদের যেতে হবে।
পরে… পরে। কাল। অনেক দেরি হয়ে গেছে…
রস্তভ মুখ ফিরিয়ে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই ব্রিচেসপরা লোকটি তাকে থামাল।
আপনি কার কাছ থেকে এসেছেন? আপনি কে?
আমি এসেছি মেজর দেনিসভের কাছ থেকে, রস্তভ জবাব দিল।
আপনি কি একজন অফিসার?
লেফটেন্যান্ট কাউন্ট রস্তভ।
কী ঔদ্ধত্য! ওটা আপনার কম্যান্ডারের মারফৎ পাঠাবেন। এবার চলে যান… চলে যান, খানসামার হাত থেকে ইউনিফর্মটি নিয়ে সে পড়তে লাগল।
রস্তভ হলঘরে ফিরে গেল। প্যারেড ইউনিফর্মে সজ্জিত অনেক অফিসার ও সেনাপতি সেখানে ভিড় করেছে। চোখ নিচু করে তাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতেই একটি পরিচিত কণ্ঠ তার নাম ধরে ডাকল, একটি হাত তার পথ আটকে দিল।
