১৩ই জুন ফরাসি ও রুশ সম্রাটদ্বয় তিলজিতে এল। বরিস বেস্কয় তার উপরওয়ালাকে বলল, তিলজিতে যারা থাকবে তাদের তালিকায় যেন তার নামটাও রাখা হয়।
এই মহাপুরুষটিকে দেখার খুব ইচ্ছে আমার, নেপোলিয়নের প্রসঙ্গে সে কথাটা বলল, যদিও অন্য সকলের মতোই এতকাল সেও তাকে বোনাপার্ত বলেই ডাকত।
সেনাপতি হেসে শুধাল, তুমি কি বোনাপার্তের কথা বলছ?
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সেনাপতির দিতে তাকিয়েই বরিস বুঝতে পারল যে তাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সে জবাব দিল, আমি সম্রাট নেপোলিয়ানের কথা বলছি প্রিন্স। সেনাপতি ঈষৎ হেসে তার কাঁধ চাপড়ে দিল।
তুমি অনেকদূর যাবে, সেনাপতি বলল, তাকে সঙ্গে নিয়েই তিলজিত গেল।
দুই সম্রাটের মধ্যে যেদিন সাক্ষাৎ হল সেদিন নিয়েমেনে যে কজন উপস্থিত ছিল বরিসও তাদের একজন।
নামফলকে সজ্জিত ভেলাটা সে দেখল, নদীর অপর পারে ফরাসি রক্ষীবাহিনীর সামনে দিয়ে নেপোলিয়নকে যেতে দেখল, নিয়েমেন নদীর তীরে একটা হোটেলে নেপোলিয়নের আগমনের জন্য প্রতীক্ষারত সম্রাট আলেক্সান্দারের নীরব বিপ্ন মুখখানি দেখল, দুই সম্রাটকে নৌকায় উঠতে দেখল, আরো দেখল দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে আলেক্সান্দারের সঙ্গে দেখা করল, তার দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল, এবং দুজনই তাঁবুর ভিতর চলে গেল।
ইতিমধ্যেই বরিস উঁচু মহলে চলাফেরা করতে শুরু করেছে, সবকিছু মনোযোগ দিয়ে দেখার ও লিখে রাখা অভ্যাসও গড়ে তুলেছে। তিলজিতের সেই সাক্ষাৎকারের সময় নেপোলিয়নের সঙ্গে যারা এসেছিল তাদের নাম, তাদের ইউনিফর্মের বিবরণ সবকিছু সে জেনে নিল, এবং বড় বড় লোকেরা যা-কিছু বলতে লাগল সব মন দিয়ে শুনল। সম্রাটরা যেই তাঁবুতে ঢুকল অমনি সে ঘড়ি দেখল, আর অ্যালেক্সান্দার ফিরে এলেও সে ঘড়ি দেখতে ভুলল না। সাক্ষাৎকারটা চলেছে এক ঘণ্টা তিপ্পান্ন মিনিট। এই সময়টার একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে মনে করে অন্য সব ঘটনার সঙ্গে এটাকেও সে টুকে রেখে দিল।
অপর এক অ্যাডজুটান্ট পোলিশ কাউন্ট ঝিলিনস্কির সঙ্গে বরিস এক ঘরেই থাকে। ঝিলিনস্কি জাতিতে পোল, ধনী, ফরাসিদের খুব ভক্ত। তিলজিতে থাকার সময় প্রায় প্রতিদিনই রক্ষীবাহিনী ও ফরাসি প্রধান ঘাঁটির অফিসাররা তার সঙ্গে ও বরিসের সঙ্গে দিনে ও রাতে সর্বদাই খানা-পিনা করত।
২৪ জুন সন্ধ্যায় কাউন্ট ঝিলিনস্কি ফরাসি বন্ধুদের একটি নৈশভোজ সভায় আমন্ত্রণ করল। সেখানে সম্মানিত অতিথি হল নেপোলিয়নের একজন এড-ডি-কং, আর ছিল রক্ষীবাহিনীর কয়েকজন ফরাসি অফিসার ও নেপোলিয়নের একটি বালক-ভৃত্য, প্রাচীন অভিজাত এক ফরাসি পরিবারের ছেলে। রাতের অন্ধকারে অসামরিক পোশাকে কেউ তাকে চিনতে পারবে না এই ভরসায় সেইদিনই রস্তভ তিলজিত পৌঁছে বরিস ও ঝিলিনস্কির বাসস্থানে এসে হাজির হল।
দরোজা দিয়ে জনৈক অফিসারকে মুখ বাড়াতে দেখেই শত্রুপক্ষকে দেখে রুশ ভাষায় জিজ্ঞাসা করল দ্রবেষ্কয় সেখানে থাকে কিনা। বাইরের ঘরে অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে বরিস বেরিয়ে এল। রস্তভকে চেনামাত্রই তার মুখের উপর মুহূর্তের জন্য একটা বিরক্তির ছায়া পড়ল।
অবশ্য হাসি মুখে তার দিকে এগিয়ে বরিস বলল, আরে, তুমি? তোমাকে দেখে খুব, খুব খুশি হলাম। কিন্তু তার প্রথম প্রতিক্রিয়াটা রস্তভ লক্ষ্য করেছিল। ঠাণ্ডা গলায় বলল, মনে হচ্ছে বড় অসময়ে এসে পড়েছি। আসা উচিত ছিল না কিন্তু দরকারে পড়েই এসেছি।
তা নয়। আমি শুধু অবাক হচ্ছি, তোমার রেজিমেন্ট ছেড়ে এলে কেমন করে? এক মিনিট, এখনই আসছি। কে যেন তাকে ডাকল, তাই বরিস শেষের কথাগুলি বলল।
মনে হচ্ছে তোমাদের কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল, রস্তভ আবার বলল।
বরিসের মুখের উপর থেকে বিরক্তির ভাবটা এর মধ্যেই মিলিয়ে গেছে, নিঃশব্দে রশুভের হাত ধরে তাকে পাশের ঘরে নিয়ে গেল।
আরে এসো, তুমি আসবে তার আবার সময়-অসময় কি! বলতে বলতে বরিস তাকে যে ঘরটাকে নিয়ে গেল সেখানে নৈশভোজনের টেবিল সাজানো হয়েছে, অতিথিদের সঙ্গে রস্তভের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, সে অসামরিক লোক নয়, একজন হুজার অফিসার, তার পুরনো বন্ধু।
অতিথিদের নাম করে করে বলল, কাউন্ট ঝিলিনস্তি-লে কোঁত এন.এন.-লে কাপ্তান এসো, এসো.রস্তভ ভুরু কুঁচকে ফরাসি ভদ্রলোকদের দিকে তাকাল, অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নোয়াল, তারপর চুপচাপ বসে রইল।
স্পষ্টতই ঝিলিনস্কি এই নবাগত রুশ লোকটিকে খুশি মনে নিজেদের দলে অভ্যর্থনা করে নিল না, তার সঙ্গে কথাও বলল না। ফরাসিদের সহজাত ভদ্রতার সঙ্গে অপর একজন ফরাসি রভের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলল, সম্ভবত সে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করতেই তিলজিতে এসেছে।
রস্তভ সংক্ষেপে জবাব দিল, না, আমি একটা কাজে এসেছি।
বরিসের মুখে অসন্তোষের ভাবটা লক্ষ করা থেকেই রস্তভের মেজাজটা খিঁচড়ে গেছে। সে উঠে বরিসের কাছে নিচু গলায় বলল, যাই বল, আমি এসে তোমাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়েছি। কাজের কথাটা সেরে নিয়েই আমি চলে যাব।
বরিস বলল, না, না, তা হয় না। বরং তুমি যদি পরিশ্রান্ত হয়ে থাক তো আমার ঘরে চল, কিছুক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম নাও।
হ্যাঁ, সত্যি…
যে ছোট ঘরটাতে বরিস ঘুমোয় তারা সেখানে গেল। রস্তভ কিন্তু বসল না, তখনই দেনিসভের ব্যাপারটা খুলে জানতে চাইল, তার সেনাপতির মারফত সম্রাটের কাছে দরবার করে দেনিসভের আবেদনপত্রটা সম্রাটের হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা সে করতে পারবে কি না। বরিস পায়ের উপর পা তুলে ডান হাতের আঙুল দিয়ে বাঁ-হাতের উপর টোকা মারতে মারতে সেনাপতি যেবাবে অধস্তন কর্মচারীর প্রতিবেদন শোনে ঠিক সেইভাবে একবার এপাশে, একবার সোজা রস্তভের মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথাগুলি শুনতে লাগল। আর প্রতিবারই রস্তভ অস্বস্তি বোধ করায় মুখটা নামিয়ে নিল।
