আগের দৃশ্যগুলোর ও পচা মাংসের গন্ধের কথা মনে পড়ায় রস্তভ ভাবল, কেমন করে এখানে ওরা হাসতে পারে, এমনকি বেঁচে থাকতে পারে?
এখন প্রায় দুপুর, তবু দেনিসভ তার বিছানায় কম্বলে মাথা ঢেকে ঘুমিয়ে ছিল।
আরে, রস্তভ! কেমন আছ, কেমন আছ? রেজিমেন্টে থাকার সময়ের মতোই জোর গলায় দেনিসভ বলে উঠল, কিন্তু রস্তভ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করল, তার এই স্বভাবসিদ্ধ স্বাচ্ছন্দ্য ও উৎসাহের অন্তরালে রয়েছে এমন একটি নতুন, অশুভ গোপন অনুভূতি যা দেনিসভের মুখের ভঙ্গিতে ও গলার স্বরে ফুটে উঠেছে।
তার ক্ষত খুবই সামান্য, কিন্তু ছয় সপ্তাহ পরে এখনো সেটা সারেনি। হাসপাতালের অন্য রোগীদের মতোই তার মুখেও সেই একই ফোলা-ফোলা হলদে ভাব। কিন্তু তাতে রস্তভ অবাক হয়নি। দেনিসভ যে তাকে দেখে খুশি হয়নি, সে যে তার দিকে তাকিয়ে অস্বাভাবিকভাবে হাসছে-এটা দেখেই সে অবাক হয়েছে। সে নিজে থেকে তাকে কোনো কথাই জিজ্ঞাসা করল না, এমন কি রস্তভ নিজে যখন কথা বলতে লাগল তখনো তাতে ভালো করে কান দিল না।
এমন কি রস্তভ লক্ষ্য করল, রেজিমেন্টের কথা এবং হাসপাতালের মুক্ত জীবনের কথা কেউ তাকে স্মরণ করিয়ে দিক সেটাও দেনিসভ চায় না। পুরোনো জীবনকে ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র কমিসারিয়েট-অফিসারদের ব্যাপার নিয়েই সে মেতে থাকতে চায়। রস্তভ যখন সেই ব্যাপারটার কথা জানতে চাইল সঙ্গে সঙ্গে সে বালিশের তলা থেকে বের করল কমিশনের কাছ থেকে পাওয়া চিঠি এবং তার জবাবের যে খসড়া সে করেছে সেটা। সেটা পড়তে পড়তে সে উত্তেজিত হয়ে পড়ল, বিশেষ করে তার জবাবে শত্রুপক্ষের প্রতি যেসব কড়া কড়া কথা সে লিখেছে সেগুলির প্রতি সে রস্তভের মনোযোগ আকর্ষণ করল। তার যে সব হাসপাতালের সঙ্গী নবাগত রস্তবকে ঘিরে সেখানে জমায়েত হয়েছিল, এবার তারা একে একে সরে পড়তে লাগল। তাদের মুখ দেখেই রস্তভ বুঝতে পারল, এইসব ভদ্রলোকরা দেনিসভের চিঠির গল্প বারবার শুনে বিরক্ত হয়ে উঠেছে। শুধু তার পাশের বিছানার শক্তসমর্থ উহলানটি বুরু কুঁচকে পাইপ টানতে টানতে বিছানায়ই বসে রইল, আর একহাতওয়ালা তুশিন তখনো তার পড়া শুনতে শুনতে আপত্তিসূচক ঘাড় নাড়তে লাগল। পড়ার মাঝখানে দেনিসভকে বাধা দিয়ে উহলানটি কথা বলতে শুরু করল।
রস্তভের দিকে ঘুরে সে বলল, আমি বলি কি, ক্ষমা প্রার্থনা করে সম্রাটের কাছে দরখাস্ত পাঠানোই সবচাইতে ভালো।
আমি দরখাস্ত পাঠাব সম্রাটকে! দেনিসভ চেঁচিয়ে বলল, পুরোনো শক্তি ও তেজের সঙ্গে কথাটা বলতে চাইলেও সেটা শোনালো অক্ষরের বিরক্তিসূচক উক্তির মতো। কেন? কিসের জন্য? আমি যদি ডাকাত হতাম তো করুণা চাইতাম, কিন্তু আমাকে কোর্ট-মার্শাল করা হচ্ছে ডাকাতদের ধরিয়ে দেবার জন্য। তারা আমার বিচারই করুক, আমি কাউকে ভয় করি না। সম্মানের সঙ্গে আমি আমার জারের, আমার দেশের সেবা করেছি, চুরি তো করিনি! আর আমাকেই নিচে নামিয়ে দেবে?…শোন, আমি তাদের সোজা লিখে দিচ্ছি। লিখেছি : আমি যদি রাজকোষে লুঠ করতাম…
তুশিন বলল, লেখাটা নিশ্চয়ই খুব ভালো হয়েছে, কিন্তু সেটা তো কথা নয় ভাসিলি দিমিত্রিচ।রস্তভকে বলল, মেনে চলাই উচিত, কিন্তু ভাসিলি দিমিত্রিচ তা চান না। তুমি তো জান, অডিটার বলেছে যে ব্যাপার ভালো নয়।
বেশ তো, খারাপই হোক, দেনিসভ বলল।
তুশিন বলতে লাগল, আপনার জন্য অডিটর একটা আবেদনপত্র লিখে দিয়েছে, সেটাতে স্বাক্ষর করে এই ভদ্রলোককে সেটা নিয়ে যেতে বলা আপনার উচিত। (রস্তভকে দেখিয়ে) ওর নিশ্চয়ই উপর মহলে জানাশুনা আছে। এর চাইতে ভালো সুযোগ আর পাবেন না।
আমি তো বলেছি, কারো সামনে বুকে হাঁটতে পারব না, কথাটা বলে দেনিসভ আবার তার কাগজটা পড়তে লাগল।
রস্তভ বুঝতে পারল যে তুশিন ও অন্য অফিসাররা যে উপায় বাৎলেছে সেটাই সবচাইতে নিরাপদ, আর দেনিসভের কোনো কাজে লাগতে পারলে সেও খুশি হবে, কিন্তু দেনিসভকে বোঝাবার সাহস তার হল না। তার কঠিন ইচ্ছাশক্তি ও কড়া মেজাজের কথা সে জানে।
এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দেনিসভের তীব্র জবাটা পড়া শেষ হলে রস্তভ কিছুই বলল না, বিষণ্ণ চিত্তে দেনিসভের হাসপাতালের বন্ধুদের সঙ্গেই দিনের বাকি সময়টা কাটিয়ে দিল। সারাটা সন্ধ্যা দেনিসভ চুপচাপ থাকল।
একটু রাত হলে বিদায় নেবার আগে রস্তভ দেনিসভকে জিজ্ঞাসা করল, তার কিছু করণীয় আছে কি না।
আছে, একটু অপেক্ষা কর, অফিসারদের সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেনিসভ বালিশের তলা থেকে কাগজপত্র বের করে নিয়ে জানালার কাছে চলে গেল। সেখানে একটা দোয়াত ছিল, সে বসে লিখতে শুরু করল।
জানালার কাছ থেকে এসে বড় একটা খাম রস্তভকে দিয়ে বলল, আমার মনে হয়, দেয়ালে মাথা ঠুকে কোনো লাভ নেই। সেই খামে অডিটর কর্তৃক খসড়া-করা সম্রাটকে লেখা দরখাস্তটা ছিল, তাতে কমিসারিয়েট অফিসারদের দোষের কথা উল্লেক না করে দেনিসভ সরাসরি ক্ষমা প্রার্থনা করেছে।
এটা হাতে হাতে দিও। মনে হচ্ছে..
দেনিসভ কথাটা শেষ করল না, একটা বেদনাদায়ক অস্বাভাবিক হাসি তার মুখে দেখা দিল।
.
অধ্যায়-১৯
রেজিমেন্টে ফিরে গিয়ে কমান্ডারকে দেনিসভের ব্যাপারটা জানিয়ে রস্তভ ঘোড়ায় চেপে তিলজিত চলে গেল সম্রাটকে চিঠিটা দিতে।
