সহকারী জবাব দিল, সেটা মাকার আলেক্সিভিচের কাছে আছে। রশুভের দিকে ফিরে বলল, কিন্তু আপনি যদি অফিসার্স ওয়ার্ডে যান তাহলে তো নিজেই দেখে আসতে পারেন।
ডাক্তার বলে উঠল, আপনার না যাওয়াই ভালো স্যার, গেলে হয় তো আপনাকেই এখানে থেকে যেতে হবে।
ডাক্তারকে অভিবাদন জানিয়ে সহকারীকে পথটা দেখিয়ে দিতে বলল।
ডাক্তার পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলল, আমাকে কিন্তু দোষ দেবেন না।
রস্তভ ও সহকারী অন্ধকার বারান্দায় গেল। সেখানে গন্ধটা এত কড়া যে রস্তভ নাক চেপে ধরে একটু থেমে শক্তি সঞ্চয় করে তবে আবার এগোতে লাগল। ডান দিকে একটা খোলা দরজা। খালি পা ও শুধু তলবাস পরা একটি উটকো লোক ক্রাচে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুড়িয়ে বেরিয়ে এল, দরজায় হেলান দিয়ে ঈর্ষাকাতর ঝকঝকে চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। দরজায় উঁকি মেরে রস্তভ দেখল, রুগ্ন ও আহত মানুষগুলো খড় ও ওভারকোটের উপর শুয়ে আছে।
আমি কি ভিতরে ঢুকে দেখতে পারি?
দেখার কি আছে? সহকারী বলল।
কিন্তু যেহেতু সহকারীটির ইচ্ছা নয় যে সে ভিতরে ঢোকে তাই রস্তভ সৈনিকদের ওয়ার্ডে ঢুকে পড়ল। বাতাসে দুর্গন্ধ এখানে আরো বেশি।
বড় বড় জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ায় লম্বা ঘরটা বেশ আলোকিত। দেয়ালের দিকে মাথা রেখে রুগ্ন ও আহতরা দুই সারিতে শুয়ে আছে, মাঝখানে যাতায়াতের পথ। তাদের মধ্যে অনেকেই অচেতন, নবাগতদের দিকে ফিরেও তাকাল না। যাদের চেতনা রয়েছে তারা উঠে বসল, না হয় শুকনো হলদে মুখ তুলে একাগ্র দৃষ্টিতে রশুভের দিকে তাকাল, সকলের মুখেই আশা, স্বস্তি, তিরস্কার ও অপরের স্বাস্থ্যের প্রতি ঈর্ষার সেই একই ভাব। ঘরের মাঝখানে গিয়ে পাশের আরো দুটি ঘরের দিকে তাকিয়েও রস্তভ সেই একই দৃশ্য দেখতে পেল। এরকম দৃশ্য যে দেখতে হবে তা সে আশা করেনি। তার ঠিক সামনে একটি রুগ্ন লোক শুয়ে আছে। চুল কাটার ধরন দেখে মনে হয় লোকটি কসাক। বড় বড় হাত-পা ছড়িয়ে লোকটি চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। মুখটা রক্তবর্ণ, চোখ দুটো এমনভাবে পাকিয়ে আছে যে কেবল সাদা অংশটাই দেখা যাচ্ছে, লাল হাতপায়ের শিরাগুলো দড়ির মতো ফুলে উঠেছে। মাথাটা মেঝের উপর ঠুকতে ঠুকতে কর্কশ গলায় সে বারবার কী যেন বলছে। ভালো করে কান পেতে রস্ত কথাগুলো ধরতে পারল। সে বলছে, পানি, পানি, একটু পানি! চারদিকে তাকিয়ে রস্তভ এমন একটি লোককে খুঁজতে লাগল যে এই মানুষটিকে জায়গামতো শুইয়ে একটু পানি এনে দেবে।
সহকারীটিকে জিজ্ঞেস করল, এখানে রোগীদের দেখাশুনা করে কে?
ঠিক সেইসময় হাসপাতালের আর্দালি জনৈক কমিসারিয়েট-সৈনিক পাশের ঘর থেকে সেখানে এল।
রশুভের দিকে তাকিয়ে তাকে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষদের একজন বলে ভুল করে বলল, শুভদিন ইয়োর অনার!
কসাকটিকে দেখিয়ে রস্তভ বলল, ওকে ঠিকমতো শুইয়ে দিয়ে একটু পানি এনে দাও।
ঠিক আছে ইয়োর অনার, শান্তভাবে জবাব দিয়ে সৈনিকটি চোখ দুটোকে পাকিয়ে আরো খাড়া হয়ে দাঁড়াল, কিন্তু সেখান থেকে নড়ল না।
না, এখানে কিছু করা অসম্ভব! চোখ নিচু করে এই কথা ভেবে রস্তভ বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ডান দিকে একটি লোক একাগ্র স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে সে ঘুরে দাঁড়াল। একেবারে কোণের দিকে পাকা দাড়িওয়ালা কঙ্কালসার একটি বুড়ো সৈনিক ওভারকোটের উপর বসে একদৃষ্টিতে রশুভের দিকে তাকিয়ে আছে। রস্তভের মনে হল বুড়োটি তাকে কিছু বলতে চাইছে। আরো কাছে গিয়ে সে দেখল, বুড়োর একটা পা ভাজ করা রয়েছে। আর অন্য পাটা হাঁটুর উপর থেকে কেটে বাদ দেয়া হয়েছে। তার পার্শ্ববর্তী যে লোকটি মাথাটা চিৎ করে চুপচাপ পড়ে আছে সে একটি যুবক সৈনিক। মোমের মতো বিবর্ণমুখে ফুটফুট দাগ, চোখ দুটো ওল্টানো। যুবক সৈনিকটির দিকে তাকাতেই রস্তভে শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল।
সহকারীটির দিকে ফিরে বলল, এ কি, মনে হচ্ছে এ তো…
চোয়াল কাঁপতে কাঁপতে বুড়ো সৈনিকটি বলল, আমরা কত করে মিনতি করছি ইয়োর অনার। সকাল থেকে লোকটা মরে পড়ে আছে। কিন্তু আমরা তো মানুষ, কুকুর নই।
সহকারী তাড়াতাড়ি বলে উঠল, এখনই কাউকে পাঠাচ্ছি। ওকে নিয়ে যাবে।এক্ষুনি নিয়ে যাবে। আসুন ইয়োর অনার।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলুন–রস্তভ দ্রুত কথাটা বলল, চোখ নামিয়ে অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে দুই সারি ভর্ৎসনাপূর্ণ দৃষ্টির অগোচরে সে সেখান থেকে চলে যেতে চেষ্টা করল, একসময় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
.
অধ্যায়-১৮
বারান্দা বরাবর এগিয়ে সহকারীটি রস্তভকে নিয়ে অফিসার্স ওয়ার্ডে ঢুকল। মোট তিনটি ঘর, সব দরজা খোলা। ঘরে বিছানা আছে, রুগ্ন ও আহাত অফিসাররা কেউ শুয়ে আছে, কেউ বসে আছে। হাতপাতালের ড্রেসিং গাউন পরে কেউ কেউ ঘরের মধ্যেই হেঁটে বেড়াচ্ছে। অফিসার্স ওয়ার্ডে রশুভের প্রথম দেখা হল একহাত কাটা একটি ছোটখাট শীর্ণ লোকের সঙ্গে। নৈশ-টুপি মাথায় দিয়ে হাসপাতালের ড্রেসিং-গাউন পরে দাঁতের ফাঁকে একটা পাইপ ধরে সে এক নম্বর ঘরের মধ্যেই হাঁটছে। তাকে দেখেই রস্তভ স্মরণ করতে চেষ্টা করল, কোথায় যেন আগে তাকে দেখেছে!
ছোট লোকটি বলল, আরে, দেখ কোথায় এসে আবার দেখা হয়ে গেল! তুশিন, তুশিন, তোমার মনে নেই শোন গ্রেবার্নে তোমাকে গাড়িতে তুলে নিয়েছিলাম? দেখতেই তো পাচ্ছ, আমার উপর একটু কাটা-ছেঁড়া হয়েছে, ড্রেসিং-গাউনের খালি আস্তিনটা দেখিয়ে সে হেসে বলল। তারপর রস্তভের প্রশ্নের জবাবে বলল, ভাসিলি দিমিত্রি দেনিসভকে খুঁজছ? আমার প্রতিবেশী। এদিকে, এদিকে, তুশিন তাকে পাশের ঘরে নিয়ে গেল। সেখান থেকে বেশ কয়েকজনের উচ্চহাসির শব্দ ভেসে এল।
