তৃতীয় জন বলল, আমি বাজি ধরছি দলোখভের উপর! কুরাগিন, তুমি আমাদের হাত ছাড়িয়ে দাও। রাশিয়ার নিয়ম-বাজি ধরলে দুজন করমর্দন করে, আর অপর একজন তাদের হাত ছাড়িয়ে দেয়।
এই যে, ব্রুইনকে ছেড়ে দাও, এদিকে বাজি চলছে।
এক চুমুকে শেষ করা চাই, নইলে তার হার, চতুর্থ জন হই-চই করে বলল।
জ্যাকব, একটা বোতল নিয়ে আয়, গৃহকর্তার গলা শোনা গেল; লোকটি লম্বা, সুদর্শন, দাঁড়িয়ে আছে দলের মাঝখানে; পরনে কোট নেই, পাতলা সুতির শার্টের বুক খোলা। একটু সবুর কর বাবা সকল।…পেতয়া এসেছে। এই যে ভালোমানুষ! পিয়েরকে দেখে সে চেঁচিয়ে বলল।
জানালার কাছ থেকে কথা বলল আর একজন। তার উচ্চতা মাঝারি, পরিষ্কার দুটি নীল চোখ; এইসব মাতাল কণ্ঠস্বরের মধ্যে তার গলার স্বরেই কিছুটা সুস্থতার আমেজ; সে বলল, এখানে এস; বাজির হাত খুলে দাও! এই হল দলোখভ; সেমেনভ রেজিমেন্টের অফিসার, বিখ্যাত জুয়াড়ি ও দ্বৈতযোদ্ধা, আনাতেলের সঙ্গেই থাকে। খুশির চোখে চারদিকে তাকিয়ে পিয়ের হাসল।
আমি তো বুঝতে পারছি না। এ সব কি হচ্ছে?
একটু সবুর কর, তোমার পেটে এখনো মাল পড়েনি। এখানে একটা বোতল চাই, বলে আনাতোল টেবিল থেকে একটা বোতল নিয়ে পিয়েরের কাছে গেল।
প্রথমেই তোমাকে এটা খেতে হবে!
যে সব মাতাল অতিথিরা জানালায় ভিড় করে আছে তাদের দিকে তাকিয়ে আর তাদের গল্প-গুজব শুনতে শুনতে পিয়ের গ্লাসের পর গ্লাস টানতে লাগল। আনাতোল পিয়েরের গ্লাস ভরে দিতে দিতে তাকে বুঝিয়ে বলল যে, নৌ-বিভাগের ইংরেজ অফিসার স্টিভেন্সের সঙ্গে বাজি ধরেছে দলোখভ : তিনতলার জানালার বাইরের টাকে বসে দুই পা ঝুলিয়ে দিয়ে সে এক বোতল রাম খাবে।
শেষবারের মতো গ্লাসে মদ ঢেলে দিয়ে আনাতোল পিয়েরকে বলল, চালিয়ে যাও; এর সবটা খেতে হবে, নইলে তোমাকে ছাড়ছি না!
না, আর খাব না, বলে আনাতোলকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে পিয়ের জানালাটার কাছে গেল।
ইংরেজ ভদ্রলোকের হাত চেপে ধরে দলোখভ স্পষ্ট গলায় বাজির শর্তগুলো আওড়াচ্ছে; তার বিশেষ লক্ষ্য আনাতোল ও পিয়ের।
দলোখভের উচ্চতা মাঝারি, কোঁকড়া চুল, হাল্কা নীল চোখ। বয়স এককুড়ি পাঁচ। পদাতিক বাহিনীর অফিসারদের মতোই তারও গোঁফ নেই; ফলে তার সুন্দর মুখমণ্ডলের সবটাই চোখে পড়ছে। মুখের সুগঠিত রেখাগুলি স্পষ্টভাবে আঁকা; উপরের ঠোঁটটা নিচের ঠোঁটের উপর চেপে বসেছে; ঠোঁটের কোণে একটা হাসি সবসময়ই খেলে বেড়াচ্ছে; তার সঙ্গে মিলেছে বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ; ফলে তার উপর কারো নজর না পড়েই পারে না। দলোখভের আর্থিক সামর্থ্য সামান্য, বড় বড় আত্মীয়স্বজনও নেই। তবু আনাতোল হাজার হাজার রুবল খরচ করলেও দলোখভ তার সঙ্গেই থাকে, আর এমনভাবে চলে যে তার পরিচিত সকলেই তাকে শ্রদ্ধা করে; আনাতোলের চাইতেও বেশি শ্রদ্ধা করে। দলোখভ সব রকম খেলা জানে, এবং প্রায় সব সময়ই খেলায় জেতে। যতই মদ খাক, তার মাথা কখনো ঘুরে যায় না। পিটার্সবুর্গের তৎকালীন লম্পট ও দুশ্চরিত্র লোকদের মধ্যে কুরাগিন ও দলোখভ দুজনই নামকরা।
রামের বোতলটা আনা হল। জানালার ফ্রেমটার জন্য বাইরের গোবরাটে বসা যায় না বলে দুজন পরিচারক ফ্রেমটা খুলে ফেলছে। ভদ্রলোকরা হৈ চৈ করে তাদের নানা রকম নির্দেশাদি দিচ্ছে।
আনাতোল হেলতে দুলতে জানালার কাছে গেল। পরিচারক দুজনকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ফ্রেমটাকে ধরে টানতে লাগল, কিন্তু নড়াতে পারল না। কাঁচটা ভেঙে গেল।
পিয়েরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, তুমি একবার চেষ্টা করে দেখ তো হার্কিউলিস।
পিয়ের এড়োর কাঠটা ধরে টান দিল, আর ওক কাঠের ফ্রেমটা সশব্দে খুলে বেরিয়ে এল।
ওটাকে একেবারে সরিয়ে দাও, নইলে সকলে ভাববে আমি ওটা ধরে আছি, দলোখভ বলল।
ইংরেজ ভদ্রলোকের খুব দর্প… না? ঠিক আছে তো? আনাতোল বলল।
রামের বোতলটা হাতে নিয়ে দলোখভ জানালার দিকে এগিয়ে গেল। জানালা দিয়ে আকাশের আলো চোখে পড়ছে; সে আলোয় উষার সঙ্গে সূর্যাস্তের আভা মিশে গেছে।
রামের বোতলটা হাতে দিয়ে দলোখভ একলাফে জানালার গোবরাটে চলে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে ঘরের ভিতরকার লোকদের ডেকে বলল, আপনারা শুনুন! সকলে চুপচাপ শুনতে লাগল।
আমি পঞ্চাশ ইম্পিরিয়াল (১ ইম্পিরিয়াল=১০ রুবল) বাজি রাখছি-ইংরেজ ভদ্রলোক যাদে বুঝতে পারে সেজন্য সে ফরাসিতেই কথাগুলি বলল, যদিও ফরাসি সে ভালো বলতে পারে না। ইংরেজ ভদ্রলোককে সম্বোধন করে আরো বলল, আমি পঞ্চাশ ইম্পিরিয়াল বাজি রাখছি…আপনি কি চান সেটা একশ রাখা হোক?
না, পঞ্চাশ, সে জবাব দিল।
ঠিক আছে। পঞ্চাশ ইম্পিরিয়াল… জানালার বাইরে এই জায়গায় বসে মুখ থেকে না সরিয়ে পুরো এক বোতল রাম আমি খেয়ে শেষ করব (নিচু হয়ে সে জানালার বাইরের ঢালু গোবরাটটা দেখাল) আর সে-সময় কোনো কিছু ধরে থাকব না। ঠিক আছে?
ঠিক আছে, ইংরেজটি বলল।
আনাতোল ইংরেজটির দিকে ঘুরে দাঁড়াল, তার কোটের একটা বোতাম ধরে ঝুঁকে পড়ে-ইংরেজটি খর্বকায় মানুষ-ইংরেজিতে বাজির শর্তগুলি আর একবার বলতে লাগল।
একটু সবুর কর! সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করবার জন্য বোতলটা দিয়ে গোবরাটের উপর আঘাত করে দলোখভ বলল। একটু সবুর কর কুরাগিন। আপনারা শুনুন! আর কেউ যদি এ কাজটা করতে পারে তাকে আমি একশ ইম্পিরিয়াল দেব। বুঝলেন?
