যেতে যেতেই দেনিসভ বলল, ঈশ্বর ও আমাদের মহান সম্রাট পরে যেন আমার বিচার করেন। কাদার ভিতর দিয়ে ছুটন্ত কয়েকটা ঘোড়র ক্ষুরের শব্দ শুভের কানে এল। দেনিসভ কোথায় গেল তা নিয়ে সে মোটেই মাথা ঘামাল না। ঘরের গরমে সে অচিরেই ঘুমিয়ে পড়ল, ঘুম ভাঙল সন্ধ্যা নাগাদ। দেনিসভ তখনো ফেরেনি। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে, পাশের ঘরের কাছে দুজন অফিসার ও একটি শিক্ষার্থী শ্বেকা খেলতে খেলতে হাসাহাসি করছে। রস্তভ তাদের সঙ্গে যোগ দিল। খেলার মাঝখানে অফিসাররা দেখল, কয়েকটা মালগাড়ি আসছে, তার পিছনে হাড়-জিরজিরে ঘোড়ায় চেপে আসছে জনা পনেরো হুজার। হুজারদের পাহারায় গাড়িগুলো পিকেট-দড়ির কাছে পৌঁছতেই একদল হুজার তাদের ঘিরে ধরল।
রস্তভ বলল, এই তো, দেনিসভের কী দুশ্চিন্তা, এই তো খাবার এসে গেছে।
অফিসাররাও বলল, তাই তো! সৈনিকরা এবার খুশি হবে।
হুজারদের একটু পরে এল দেনিসভ, সঙ্গে দুজন পদাতিক অফিসার।
রস্তভ তাদের সঙ্গে দেখা করতে এগিয়ে গেল।
একটি বেঁটে সরু অফিসার অত্যন্ত রাগের সঙ্গে বলল, আমি আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছি ক্যাপ্টেন।
আমি কি আপনাকে বলিনি যে ওগুলো ছেড়ে দেব না? দেনিসভ জবাব দিল।
এর জন্য আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে ক্যাপ্টেন। এ তো বিদ্রোহ–নিজের সেনাবাহিনীর যানবাহন আটক করা। দুদিন আমাদের সৈন্যরা কিছু খেতে পায়নি।
আর আমার সৈন্যরা না খেয়ে আছে দুসপ্তাহ ধরে, দেনিসভ বলল।
পদাতিক অফিসারটি গলা চড়িয়ে বলল, এ তো ডাকাতি! এর জন্য আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে স্যার!
দেনিসভ হঠাৎ মেজাজ গরম করে চেঁচিয়ে বলল, কেন আমাকে বিরক্ত করছেন? জবাবদিহি করতে হয় করব, কিন্তু আপনার কাছে নয়। এখানে মেলা বকবক করবেন না, তাতে ফল ভালো হবে না। দূর হোন! চলে যান!
ক্ষুদে অফিসারটি ভয় পেল না, চলেও গেল না। চিৎকার করে বলল, খুব ভালো কথা! আপনি যখন ডাকাতি করতে কৃতসংকল্প তাহলে আমিও…
আপনি জাহান্নামে যান! নিরাপদ ও সুস্থ থাকতে থাকতে পালান! দেনিসভ তার দিকে ঘোড়ার মুখ ফেরাল।
ঠিক আছে, ঠিক আছে! ধমকের সুরে কথা বলে অফিসারটি ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ছুটে চলে গেল।
দেনিসভ হো-হো করে হাসতে হাসতে রস্তভের কাছে গিয়ে বলল, পদাতিক বাহিনীর কাছ থেকে জোর করে গাড়িগুলো ধরে নিয়ে এসেছি। যাই হোক না কেন, আমার লোকগুলোকে তো না খেয়ে মরতে দিতে পারি না।
পরদিন রেজিমেন্ট-কমান্ডার দেনিসভকে ডেকে পাঠাল, তার চোখের সামনে আঙুলগুলো মেলে ধরে বলল, আমি ব্যাপারটাকে এইভাবে দেখছি : এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, আর এ নিয়ে বিচার-বিতর্কও করতে চাই না, কিন্তু আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি, ওদের কাছে গিয়ে কমিসারিয়েট বিভাগ থেকে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলুন, আর সম্ভব হলে অমুক-অমুক জিনিস পেয়েছি বলে একটা রসিদ সই করে দিন। অন্যথায় যেহেতু জিনিসপত্রগুলো পদাতিক রেজিমেন্টের নামে বুক করা ছিল সেইহেতু একটা হৈচৈ হবে এবং তাতে ফল খারাপও হতে পারে।
রেজিমেন্ট-কমান্ডারের পরামর্শমতো কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা নিয়েই দেনিসভ পদাতিক বিভাগের উদ্দেশে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। সন্ধ্যাবেলায় যে অবস্থায় যে ভূগর্ভস্থ ঘরে ফিরে এল রস্তভ আগে কখনো তাকে সে অবস্থায় দেখেনি। দেনিসভ তখন কথা বলতে পারছে না, হাঁসফাস করছে। রস্তভ যখন জানতে চাইল ব্যাপার কি তখন সে শুধু দুর্বল কর্কশ গলায় কতকগুলি অসংলগ দিব্যি করল আর কাকে যেন শাপান্ত করতে লাগল।
ডাকাতির দায়ে আমার বিচার করবে…ওঃ! জল দাও…করুক বিচার, কিন্তু আমি শয়তানদের শায়েস্তা করবই…সম্রাটকে বলব…বরফ… সে তো তো কেরে বলতে লাগল।
রেজিমেন্টের ডাক্তার এসে বলল, দেনিসভের রক্তমোক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন। তার লোমশ বাহু থেকে একপাত্র ভর্তি রক্ত নেওয়া হল, আর তবেই সে সব কথা খুলে বলতে পারল।
সেখানে তো গেলাম। তারপর, তোমাদের বড়কর্তার বাসাটা কোথায়? দেখিয়ে দিল। দয়া করে অপেক্ষা করুন। আমি বিশ মাইল ঘোড়া ছুটিয়ে এসেছি, বিস্তর কাজ পড়ে আছে, অপেক্ষা করার সময় নেই। আমার কথা বল গে। খুব ভালো, বড় চোর বেরিয়ে এলেন, আর এসেই বক্তৃতা শুরু করে দিলেন : এ তো ডাকাতি!–আমি বললাম, যে মানুষ তার সৈন্যদের খাবার যোগাতে খাদ্যদ্রব্য আটক করে, ডাকাতি সে করে না, ডাকাতি করে সে যে তার নিজের পকেট ভর্তি করে। আপনি কি দয়া করে চুপ করবেন?
খুব ভাল কথা। তখন তিনি বললেন। তাহলে যান, কমিশনারের হাতে একটা রসিদ দিন, কিন্তু আপনার এই ব্যাপার প্রধান ঘটিতে পাঠানো হবে। গেলাম কমিশনারের কাছে। চুকলাম, আর দেখি টেবিলে…কি ব্যাপার বল তো? না। একটু অপেক্ষা কর!… আমাদের না খাইয়ে রেখেছে কে সেই লোক? দেনিসভ চিৎকার করে বলল, আর সদ্য রক্ত-নেওয়া হাতের মুঠি দিয়ে এত জোরে টেবিলের উপর আঘাত করল যে টেবিলটা প্রায় ভাঙবার উপক্রম হল আর তার উপরকার গ্লাসগুলো উল্টে পড়ল। তেলিয়ানন! সে কি? তাহলে তুমিই আমাদের না খাইয়ে মারতে চাও? তাই নাকি? তাহলে এই নাও, এই নাও! তার নাকে-মুখে ঘুষি চালালাম…আঃ, সে যে কি…সে যে কি…মানে, খুব মজা হল আর কি! সকলে তাকে সরিয়ে না নিয়ে গেলে হয় তো খুন করেই ফেলতাম!
রস্তভ বলল, কিন্তু আপনি চেঁচাচ্ছেন কেন? শান্ত হোন। আপনার বাহু থেকে নতুন করে রক্ত বেরুচ্ছে। দাঁড়ান, আবার বেঁধে দিই।
