একপক্ষকাল ধরে ঘোড়াগুলো চালের খড় খেয়ে বেঁচে আছে, ভয়ঙ্করভাবে শুকিয়ে গেছে।
এই অভাবের মধ্যেও সৈনিক ও অফিসাররা স্বাভাবিক কাজকর্ম করে চলেছে। ফোলা মুখ আর ছোঁড়া ইউনিফর্ম নিয়ে হুজাররা নাম ডাকার সময় সারি দিয়ে দাঁড়াচ্ছে, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে, ঘোড়াগুলোর তদারক করছে, অস্ত্রশস্ত্র মেজে-ঘষে পরিষ্কার রাখছে, চাল থেকে কড় এনে ঘোড়াকে খাওয়াচ্ছে, এবং ফুটন্ত কড়াইয়ের পাশে গোল হয়ে খেতে বসে ক্ষিধে নিয়ে উঠে পড়ছে আর বাজে খাবার ও ক্ষিধে নিয়ে নানারকম ঠাট্টা-তামাশা করছে। যথারীতি অবসর সময়ে তারা আগুন জ্বালাচ্ছে, জামা খুলে শরীর গরম করছে, ধূমপান করছে, পচা আলু খুঁড়ে বের করে পুড়িয়ে খাচ্ছে, এবং পোটেমকিন, সুভরভ-এর অভিযান, চতুর আলেশার কাহিনী অথবা পুরোহিতের মজুর মিকলকার গল্প বলছে ও শুনছে।
অফিসাররা যথারীতি আধ-ভাঙা ছাদহীন ঘরে দুজন তিনজন করে বাস করছে। প্রধানরা খড় ও আলু এবং সৈনিকদের জন্য খাবারের যোগাড় করছে। তরুণরা আগের মতোই তাস খেলছে (খাদ্য না থাক, টাকার তো অভাব নেই), কেউ-বা অন্য ধরনের নির্দোষ খেলা খেলছে। অভিযানের কথা কেউ বড় একটা বলে না, কারণ স্পষ্ট করে কিছু জানাও যাচ্ছে না, আর সকলেরই ধারণা যে গতিক বড় ভালো নয়।
রস্তভ আগের মতোই দেনিসভের সঙ্গে বাস করছে, ছুটি কাটিয়ে আসার পর থেকে তাদের বন্ধুত্ব আরো প্রগাঢ় হয়েছে। দেনিসভ কখনো রস্ত পরিবারের কথা বলে না, কিন্তু অধিনায়কটি তার প্রতি যেরকম বন্ধুত্ব দেখাচ্ছে তাতেই রস্তভ বুঝতে পেরেছে যে নাতাশার প্রতি ব্যর্থ প্রবীণ হুজারের ব্যর্থ প্রেমই তাদের বন্ধুত্বের বন্ধনকে দৃঢ়তর করেছে। দেনিসভ সবসময়ই চেষ্টা করে স্তবকে যতদূর সম্ভব বিপদ থেকে দূরে রাখতে, একটা যুদ্ধের পরে সে নিরাপদে ফিরে এলে দেনিসভ তাকে সানন্দে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। আর একবার একটি অসহায় পোলিশ মেয়ে সম্পর্কে অশোভন উক্তি করায় রস্তভ বন্ধুদের উপর ভীষণ ক্ষেপে গিয়েছিল। দেনিসভ মাঝখানে পড়ে কোনোরকমে জগড়া থামায়। পরে এই নিয়ে রস্তভকে তিরস্কার করলে রস্তভ জবাব দিল : আপনার যা খুশি বলতে পারেন…সে আমার বোনের মতো, তাই আমি খুব অসন্তুষ্ট হয়েছি…কারণ…দেখুন, সেই জন্যই…।
দেনিসভ তার পিঠটা চাপড়ে দিয়ে রস্তভের দিকে তাকিয়ে অতি দ্রুত ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। গভীর আবেগের মুহূর্তে এইরকম করাই তার স্বভাব।
সে তো-তো করে বলল, আঃ, তোমরা রস্তভরা একেবারে পাগল! রস্তভ লক্ষ্য করল, তার চোখের নিচে জল চিকচিক করছে।
.
অধ্যায়-১৬
এপ্রিল মাসে সম্রাটের আগমনের সংবাদে সৈন্যরা উৎসাহিত হয়ে উঠল, কিন্তু বার্তেনস্তিনে অনুষ্ঠিত সেনা সমাবেশে উপস্থিত থাকবার সুযোগ রস্তভের হল না, কারণ সেইসময় পাভলোগ্রাদরা ছিল সেখান থেকে অনেক দূরের একটা ঘাঁটিতে।
তারা তখন খোলা জায়গায় দিন কাটাচ্ছে। দেনিসভ ও রস্তভ বাস করছে মাটির ঘরে, সৈন্যরাই সে ঘর মাটি কেটে তৈরি করে দিয়েছে, ছাদ বানিয়েছে গাছের ডাল ও মাটির চাপড়া দিয়ে। তকালে প্রচলিত ব্যবস্থামতোই ঘরটা এইভাবে তৈরি করা হয়েছে। সাড়ে তিন ফুট চওড়া, চার ফুট আট ইঞ্চি গভীর ও আট ফুট লম্বা একটা ট্রেঞ্চ কাটা হয়েছে। ট্রেঞ্চের এক প্রান্তে সিঁড়ি বানানো হয়েছে, সেটাই ঘরের প্রবেশদ্বার ও বারান্দা। ট্রেঞ্চটাই হল ঘর, স্কোয়াড্রন-কম্যান্ডারের মতো ভাগ্যবানদের জন্য সেখানে একটা পাটাতন পেতে টেবিল বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ট্রেঞ্চের দুই পাশে আড়াই ফুট চওড়া করে মাটি কেটে তাই দিয়ে খাট ও কোচের কাজ চালানো হচ্ছে। ছাদটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ট্রেঞ্চের মাঝখানে একজন মানুষ দাঁড়াতে পারে, এমন কি বিছানার উপর বসতেও পারে। স্কোয়াড্রনের সৈনিকরা দেনিসভকে ভালোবাসে, তাই সে তো রাজার হালে আছে, ছাদের কোণে ভাঙা কাঁচ জুড়ে তার জন্য একটা জানালা পর্যন্ত বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এপ্রিল মাসে রস্তভ আর্দালির কাজে নিযুক্ত ছিল। একদিন বিদ্রি রাত কাটিয়ে সকাল সাতটা থেকে আটটা নাগাদ ফিরে এসে সে কাঠ আনবার জন্য লোক পাঠাল, বৃষ্টিভেজা জামাকাপড় পাল্টে নিল, প্রার্থনা করল, চা খেয়ে শরীর গরম করে নিল, এবং টেবিলের জিনিসপত্র গুছিয়ে তার নিজের কোণটিতে গিয়ে মাথার নিচে দুই হাত রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল, পরনে শুধু একটা শার্ট, ঠাণ্ডা বাতাস লেগে মুখটা চকচক করছে। খুশি মনে অচিরেই একটা পদোন্নতির কথা ভাবতে ভাবতে সে দেনিসভের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
হঠাৎ তার কানে এল, ঘরের পিছন দিকে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে দেনিসভ কাঁপা গলায় চিৎকার করছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি ল্যাচারচুক ওগুলো মাঠ থেকে তুলে এনেছে। কিন্তু আমি তো হুকুম দিয়েছি কেউ যেন মাশকা মূল না খায়।
আমিও তো বারবার হুকুম জারি করেছি ইয়োর অনার, কিন্তু ওরা কথা শোনে না, কোয়ার্টারমাস্টার জবাব দিল।
রস্তভ আবার শুয়ে পড়ল, নিজের মনে বলল : ওরা হুল্লোড় করতে থাকুক, আমার কাজ শেষ করে শুয়ে পড়েছি–চমৎকার!
দূর থেকে দূরে দেনিসভের গলা শোনা গেল। ঘোড়ার পিঠে জিন লাগাও! দ্বিতীয় প্লাটুন!
ওরা কোথায় যাচ্ছে? রস্তভ ভাবল।
পাঁচ মিনিট পরে দেনিসভ ঘরে ঢুকল, কাদামাখা বুট পরেই বিছানায় উঠল, পাইপটা ধরাল, জিনিসপত্র এখানে-ওখানে ছুঁড়ে ফেলে দিল, সিসেভরা চাবুকটা হাতে নিল, তরবারিসহ পেটিটা কোমরে বাঁধল, তারপর বেরিয়ে গেল। সে কোথায় যাচ্ছে রস্তভের এই প্রশ্নের জবাবে বিরক্ত হয়ে জানাল, তার কাজ আছে।
