বুড়ো প্রিন্স নৈশ ভোজে যোগ দিতে এল, আর সেটা স্পষ্টতই পিয়েরের জন্য। মাত্র দুই দিন হল সে এখানে এসেছে, এরই মধ্যে সে বুড়ো প্রিন্সের প্রিয় হয়ে উঠেছে, সে তাকে আবার আসবার আমন্ত্রণও জানিয়েছে।
পিয়ের চলে যাবার পরে বাড়ির লোকরা যখনই একত্র হয় তখনই পিয়ের সম্পর্কে যার যার মতামত প্রকাশ করে। কোনো নতুন লোক বাড়িতে এসে চলে গেলে এটা হামেশাই ঘটে থাকে, কিন্তু এক্ষেত্রে এটাই ব্যতিক্রম যে কেউই তার সম্পর্কে ভালো ছাড়া মন্দ কিছু বলে না।
.
অধ্যায়-১৫
ছুটি থেকে ফিরে আসার সময় রস্তভ এই প্রথম অনুভব করল, দেনিসভ ও গোটা রেজিমেন্টের সঙ্গে তার বন্ধন কত ঘনিষ্ঠ।
মস্কোতে বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছবার সময় তার যে মনোভাব হত, রেজিমেন্টের কাছাকাছি পৌঁছে সেই একই ভাব জাগল তার মনে। তার রেজিমেন্টের বোতামখোলা ইউনিফর্ম পরা প্রথম হুজারটিকে যখন সে দেখতে পেল, যখন চিনতে পারল লাল-চুল দেমেন্তিয়েভকে, যখন লাভ্রুশকা সানন্দে তার মনিবকে ডেকে বলল, কাউন্ট এসে গেছেন! আর দিনসভ হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে উঠে অগোছালো অবস্থায় মাটির ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল এবং অফিসাররা সকলেই তাকে অভ্যর্থনা করতে এসে জড় হল, তখন রস্তভের বুকের মধ্যে সেই অনুভূতিই জাগল যা জেগেছিল তখন যখন তার মা, বাবা ও বোন তাকে আলিঙ্গন করেছিল, আনন্দের অশ্রুতে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল, একটা কথাও বলতে পারল না। রেজিমেন্টও তো একটা বাড়ি, তার বাপ-মায়ের বাড়ির মতোই প্রিয় ও দামি।
আর একবার সৈনিক জীবনের সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে প্রবেশ করে স্তব বিশ্রামরত ক্লান্ত মানুষের মতোই আনন্দ ও স্বস্তি অনুভব করতে লাগল। এবারকার অভিযানকালে সৈনিক-জীবন তার কাছে অধিকতর প্রীতিপদ মনে হল এই কারণে যে দলখভের কাছে হারবার পরে সে মনস্থির করেছে, আগেকার মতো না চলে সে তার দোষের প্রায়শ্চিত্ত করবে, একজন সত্যিকারের প্রথম শ্রেণীর কমরেড ও অফিসারের মতো আচরণ করবে-এ কথায় সে হয়ে উঠবে একটি পরিপূর্ণ চমৎকার মানুষ, যা হওয়া বাইরের জগতে খুবই শক্ত মনে হলেও রেজিমেন্টে খুবই সম্ভব।
অনেক টাকা হারবার পরে সে প্রতিজ্ঞা করেছে, পাঁচ বছরের মধ্যে বাবার সব দেনা শোধ করে দেবে। বছরে সে দশ হাজার রুবল পায়, কিন্তু স্থির করেছে এখন থেকে শুধু দুই হাজার নেবে আর বাকিটা রেখে দেবে বাবার ঋণ শোধ করার জন্য।
উপযুপরি পশ্চাদপসরণ ও অগ্রগমন এবং পুলতস্ত ও প্রশিক্ষ-আইলোর যুদ্ধের পরে আমাদের বাহিনী বার্তেনস্তিনের কাছে একত্র হয়েছে। সম্রাটের আগমন ও নতুন অভিযান শুরুর জন্য সকলেই অপেক্ষা করে আছে।
সেনাবাহিনীর যে অংশটা ১৮০৫-এর অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিল তার অন্তর্ভুক্ত পাভলোগ্রাদ রেজিমেন্ট রাশিয়াতে পুরোদমে নতুন সৈন্য সংগ্রহ করে এত দেরিতে এসে হাজির হল যে অভিযানের প্রথম দিককার যুদ্ধে তারা কোনো অংশই নিতে পারল না। তারা না ছিল পুলতঙ্কে, না ছিল প্রশিঙ্ক-আইলোতে, অভিযানের দ্বিতীয়ার্ধে এসে তারা যখন সেনাবাহিনীতে যোগ দিল তখন তাদের প্রাতভের ডিভিশনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল।
প্লাতভের ডিভিশন মূল বাহিনী থেকে আলাদ হয়ে স্বাধীনভাবে যুদ্ধ করছিল। পাভলোগ্রাদ রেজিমেন্টের একটা অংশ কয়েকবার শত্রুদের সঙ্গে গুলি বিনিময় করেছে, শত্রুসৈন্যদের বন্দি করেছে, এমন কি একবার মার্শাল ওদিমোর গাড়িগুলোকে পর্যন্ত আটক করেছে। এপ্রিল মাসে একটা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও পরিত্যক্ত জার্মান গ্রামের কাছে প্রাভলোগ্রাদদের কয়েক সপ্তাহ ধরে চুপচাপ বসিয়ে রাখা হয়েছে।
বরফ গলতে শুরু করেছে, যেমন কাদা তেমনই ঠাণ্ডা, নদীতে বরফের চাই ভাঙতে শুরু করেছে, রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য। দিনের পর দিন না আসছে সৈন্যদের খাবার, না আসছে ঘোড়ার খাবার। গাড়ি-ঘোড়া কিছুই আসতে পারছে না দেখে সৈন্যরা নির্জন পরিত্যক্ত গ্রামে গ্রামে ঢুকে আলুর খোঁজ করতে লাগল, কিন্তু তাও জোটে না।
সবকিছু খেয়ে শেষ করে ফেলেছে, গ্রামবাসীরা সকলেই পালিয়েছে–যারা এখনো আছে তারা ভিখারীরও অধম, তাদের কাছ থেকে নেবার কিছুই নেই, এমনকি যে সৈন্যরা সাধারণত নির্মমই হয়ে থাকে তারাও তাদের কাছ থেকে নেবার পরিবর্তে প্রায়ই নিজেদের শেষ রেশনটুকুও তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে।
পাভলোগ্রাদ রেজিমেন্টের মাত্র দুটি সৈন্য যুদ্ধে আহত হয়েছে, কিন্তু ক্ষুধায় ও রোগে মারা গেছে প্রায় অর্ধেক সৈন্য। হাসপাতালে মৃত্যু এতই অবধারিত হয়ে উঠল যে যে-সব সৈন্য জ্বরে বুগছে অথবা অখাদ্য খেয়ে রোগে ভুগছে তারাও কর্তব্যরত থাকাটাই বেছে নিত এবং হাসপাতালে যাওয়ার বদলে পা টেনে টেনে রণক্ষেত্রে যাওয়াটাই পছন্দ করত। বসন্তকাল এলে সৈন্যরা দেখতে পেল যে শতমূলীর মতো দেখতে কোনো গাছ–যাকে তারা যে কারণেই হোক মাশকার মিষ্টি মূল বলত, মাটির ভিতর থেকে একটুখানি মাথা তুলেছে। সে গাছের স্বাদ খুব তেতো, কিন্তু তারই খোঁজে তারা মাঠে মাঠে গুরে বেড়াত, এবং অনিষ্টকর গাছড়া হিসাবে সেগুলি খাওয়া নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তারা তলোয়ার দিয়ে মাটি থেকে তুলে সেই গাছড়া খেত। সেই বসন্তকালেই সৈন্যদের মধ্যে একটা নতুন রোগ দেখা দিল, হাত, পা, মুখ সব ফুলতে আরম্ভ করল, আর ডাক্তাররা বলল যে এ রোগ ওই গাছড়া খাওয়ারই ফল। কিন্তু এসব সত্ত্বেও দেনিসভের সেনাদল প্রধানত মাশকার মিষ্টি মূল খেয়েই দিন কাটাতে লাগল, কারণ জনপ্রতি আধ পাউন্ড করে বিস্কুট শেষবারের মতো বরাদ্দ করার পরে দ্বিতীয় সপ্তাহ কেটে গেছে এবং সর্বশেষ যে আলু এসেছিল তাতে অঙ্কুর গজিয়েছে এবং জমে গেছে।
