তারাটা ঘরের মধ্যে এল কেমন করে? পিয়ের শুধাল।
আর পবিত্র জননী কি সেনাপতির পদটি পেয়েছিলেন? প্রিন্স আন্দ্রু হেসে বলল।
সহসা পেলাগেয়া মুখটা কালো করে নিজের হাত দুটো এক খরে চেপে ধরল।
হায় মালিক, মালিক, এ কী পাপ! অথচ আপনার ছেলে আছে! হঠাৎ মুখটা লাল করে সে বলতে শুরু করল। এ আপনি কি বললেন মালিক? ঈশ্বর আপনাকে ক্ষমা করুন! সে কুশ-চিহ্ন আঁকল। প্রভু ওকে ক্ষমা করুন! এ সবের অর্থ কি? সে প্রিন্সেস মারিকে শুধাল। প্রায় কাঁদতে কাঁদতে সে ঝোলাঝুলি গোছাতে শুরু করল। বোঝা গেল সে ভয় পেয়েছে, আবার বাড়ি ছেড়ে যেতেও কষ্ট হচ্ছে।
প্রিন্সেস মারি বলল, কেন এমন কাজ করলে? কেন তুমি আমার কাছে এলে?…
পিয়ের বলল, শোন পেলাগেয়া, আমি ঠাট্টা করছিলাম। তুমি বিশ্বাস কর প্রিন্সেস, ওকে আঘাত দিতে আমি চাইনি। কিছু মনে করে কথাটা বলিনি। একটু ঠাট্টা করেছি মাত্র। সবই আমার দোষ, আন্দুও ঠাট্টাই করেছে।
সন্দিহান চিবত্তে পেলাগেয়া থামল, কিন্তু পিয়েরের মুখে এমন আন্তরিক অনুতাপের ভাব ফুটে উঠল এবং প্রিন্স আন্দ্রু এমন ভীরু চোখে একবার তার দিকে একবার পিয়েরের দিকে তাকাতে লাগল যে পেলাগেয়া ধীরে ধীরে তাদের কথায় আশ্বস্ত হল।
.
অধ্যায়-১৪
তীর্থযাত্রিনীটি শান্ত হল, নতুন করে কথা বলার উৎসাহ পেয়ে সে এফিলোকাস বাবার একটা দীর্ঘ বিবরণ দিতে লাগল। এফিলোকাস বাবা এত পবিত্র জীবন যাপন করে যে তার হাত দিয়ে ধুনোর গন্ধ বেরোয়, কিয়েভ ভ্রমণের সময় কয়েকজন পরিচিত সন্ন্যাসী তাকে ভূগর্ভস্থ সমাধিগুলোর চাবি দিয়েছিল, আর সেও কিছু শুকনো রুটি সঙ্গে নিয়ে দুটো দিন সন্ন্যাসীদের সঙ্গে সেই সব সমাধিতে কাটিয়েছে। একস্থানে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করে অন্যস্থানে বসে ভেবেছি, তারপর আর একস্থানে গিয়েছি। একটু ঘুমিয়ে নিয়ে আবার গিয়েছি, পুরাবস্তুগুলিতে চুমো খেয়েছি। চারদিকে সে কী শান্তি, কী আনন্দ! সেখান থেকে স্বর্গের আলোতেও বেরিয়ে আসতে ইচ্ছা করে না।
পিয়ের গম্ভীর মুখে সব শুনল। প্রিন্স আন্দ্রু বেরিয়ে গেল। ঈশ্বরের লোকদের চায়ের পাট শেষ করতে দেখে প্রিন্সেস মারি পিয়েরকে নিয়ে বসবার ঘরে গেল।
বলল, তোমার খুব দয়া।
সত্যি, ওদের প্রাণে আঘাত দিতে আমি চাইনি। ওদের আমি খুব ভালো করেই জানি, আর খুবই শ্রদ্ধা করি।
নীরবে তার দিকে তাকিয়ে প্রিন্সেস মারি সানুরাগ হাসি হাসল।
তুমি তো জান অনেকদিন থেকে আমি তোমাকে চিনি, দাদার মতোই তোমাকে ভালোবাসি। আন্দ্রুকে কেমন দেখছ? ওর জন্য বড়ই চিন্তায় আছি। শীতকালে ওর স্বাস্থ্যটা ভালো ছিল, কিন্তু গত বসন্তকালে ঘাটা আবার দেখা দিয়েছে, ডাক্তার বলছে আরোগ্যের জন্য কোথাও চলে যেতে। তান মানসিক অবস্থার কথা ভেবেও আমার বড় ভয় করছে। ও তো মেয়েদের মতো নয়, কষ্ট পেলে আমরা কেঁদে সে কষ্ট ভুলতে চেষ্টা করি, কিন্তু ও তো সব মনের মধ্যে চেপে রাখে। আজ সে বেশ হাসিখুশি ও খোশ মেজাজে আছে, কিন্তু সে তো তুমি এসেছ বলে–সচরাচর সে এমন থাকে না। দেখ তো, তুমি ওকে বিদেশে যেতে রাজি করাতে পার কি না! ওর দরকার কাজে ডুবে থাকা, এই শান্ত নিয়মিত জীবন ওর পক্ষে খুব খারাপ। অন্যরা সেটা বুঝতে পারে না, কিন্তু আমি পারি।
দশটা নাগাদ বুড়ো প্রিন্সের গাড়ির আওয়াজ পেয়ে চাকরবাকররা ফটকের দিকে ছুটে গেল। প্রিন্স আন্দ্রু ও পিয়েরও বারান্দায় গেল।
গাড়ি থেকে নামতে নামতেই পিয়েরকে দেখতে পেয়ে বুড়ো প্রিন্স শুধাল, ও কে?
তার পরিচয় শুনে বলল, আঃ! খুব খুশি হলাম! আমাকে চুমো খাও।
বুড়ো প্রিন্সেস মেজাজ ভালো ছিল, পিয়েরের প্রতিও খুবই সদয়।
নৈশ ভোজনের আগে বাবার পড়ার ঘরে ঢুকে প্রিন্স আন্দ্রু দেখল গৃহস্বামী ও অতিথির মধ্যে তুমুল তর্ক চলেছে। পিয়ের বলছে, এমন একদিন আসবে যখন যুদ্ধ বলে কিছু থাকবে না, আর বুড়ো প্রিন্স কোনোরকম রাগ না দেখিয়েই তার তীব্র প্রতিবাদ করছে।
মানুষের শিরা থেকে সব রক্ত বের করে নিয়ে সেখানে জল ঢেলে দাও, তবে যুদ্ধ বন্ধ হবে! যতসব বুড়িদের অর্থহীন কথা! বুড়ো প্রিন্স মুখে প্রতিবাদ করলেও সস্নেহে পিয়েরের কাঁধ চাপড়ে দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রুর টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ছেলে তখন শহর থেকে আনা বাবার কাগজপত্রগুলো দেখছিল। বুড়ো প্রিন্স তার কাছে গিয়ে কাজের কথা শুরু করল।
কাউন্ট রস্তভ একজন মার্শাল হয়েও তার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যার অর্ধেক লোকও পাঠাননি। শহরে এসে তিনি আমাকে ডিনারে নেমন্তন্ন করতে চেয়েছিলেন–আমি তাকে আচ্ছা ডিনার খাইয়েছি!…যাক সে কথা। তোমার এই বন্ধুটি খুব ভালো ছেলে–আমার ভালো লেগেছে। সে আমাকে নাড়া দিতে পেরেছে। অন্যরা ভালো ভালো কথা বলে, কিন্তু কান পেতে কোনো কথা শোনে না, কিন্তু এ বাজে কথা বললেও মনকে নাড়া দিতে পারে। আচ্ছা, এখন এস। হয়তো নৈশভোজনের সময় আমিও তোমাদের সঙ্গে বসে যাব। তখন আর একগ্রস্থ তর্ক হবে। যেতে যেতে সে পিয়েরকে উদ্দেশ্য করে বলল, আমার বোকা মেয়েটার সঙ্গে বন্ধুত্ব করো হে।
প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে বন্ধুত্বের যে কত শক্তি ও আকর্ষণ পিয়ের সেটা পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে এবার বল্ড হিলসে বেড়াতে এসে। সে আকর্ষণ বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কের বেলায় যত প্রকাশ পেয়েছে তার চাইতে বেশি প্রকাশ পেয়েছে তার পরিবার ও বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। কঠোর চরিত্র বুড়ো প্রিন্স এবং মৃদু ও ভীরু প্রিন্সেস মারিকে তার মনে হচ্ছে পুরোনো বন্ধুর মতো। তারাও ইতিমধ্যেই তার প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠেছে। শুধু প্রিন্সেস মারিই নয়, এক বছরের প্রিন্স নিকলাস এবং মাইকেল আইভানভিচ ও মাদময়জেল বুরিয়েও স্মিত হাসি হেসে তার দিকে তাকায়।
