প্রিন্স আন্দ্রু সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে নীরবে পিয়েরের কথা শুনতে লাগল। যখনই গাড়ির চাকার শব্দে পিয়েরের কথাগুলি শোনা যাচ্ছে না তখনই সে কথাগুলি আর একবার বলতে বলছে, আর তার চোখের দীপ্তি ও নীরবতা দেখে পিয়ের বুঝতে পারছে যে তার কথাগুলি বৃথা যায়নি, প্রিন্স আন্দ্রু আর তার কথায় বাধা দেবে না বা শুনে হাসবে না।
দুই কূল ভাসানো একটা নদীর তীরে পৌঁছে তারা ফেরিতে নদীটা পার হল। গাড়ি ও ঘোড়াকে ফেরিতে তোলা হলে তারাও উঠে পড়ল।
প্রিন্স আন্দ্রু ফেরির রেলিংয়ে ভর দিয়ে পড়ন্ত সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করা জলরাশির দিকে নীরবে তাকিয়ে রইল।
পিয়ের শুধাল, আচ্ছা, এ বিষয়ে কি ভাবছ তুমি? এত চুপচাপ আছ কেন?
আমি কি ভাবছি? আমি তো তোমার কথা শুনছি। সবই ভাললা…তুমি বলছ : আমাদের ভ্রাতৃসংঘে যোগ দাও, জীবনের লক্ষ্য, মানুষের ভাগ্য, যে সব বিধান পৃথিবীকে শাসন করে-সে সব আমরা তোমাকে দেখিয়ে দেব। কিন্তু এই আমরা কারা? মানুষ। তোমরাই বা সবকিছু জানলে কেমন করে? তোমরা যা দেখেছ একমাত্র আমিই বা তা দেখতে পাই না কেন? তোমরা পৃথিবীতে দেখছ সৎ ও সত্যের শাসন, কিন্তু আমি তা দেখতে পাই না।
পিয়ের তাকে বাধা দিল।
তুমি কি পরলোকে বিশ্বাস কর? সে শুধাল।
পরলোক? প্রিন্স আন্দ্রু কথাটা পুনরায় উচ্চারণ করল, কিন্তু এ পুনরাবৃত্তিকে অস্বীকৃতি বলে ধরে নিয়ে তাকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়েই পিয়ের বলে উঠল, তুমি বলছ, পৃথিবীতে সৎ ও সত্যের শাসন তুমি দেখতে পাও না। আমিও পেতাম না, আমাদের এই জীবনকেই যতক্ষণ পর্যন্ত সবকিছুর পরিণতিরূপে দেখা হবে ততক্ষণ কেউই তা দেখতে পাবে না। এই পৃথিবীতে, এখানে এই পৃথিবীতে (চারদিকের মাঠ দেখিয়ে) সত্য বলে কিছু নেই, সবই মিথ্যা ও অসৎ, কিন্তু এই বিশ্বে, সমগ্র বিশ্বে রয়েছে সত্যের রাজত্ব, আর আমরা যারা এই পৃথিবীর সন্তান, আমরাই তো অনন্তকাল ধরে এই বিশ্বেরও সন্তান। অন্তরে অন্তরে আমিও কি অনুভব করি না যে আমি সেই বিরাট একেরই একটি অংশ? আমি অনুভব করি যে আমি মুছে যাব না, কারণ পৃথিবীতে কিছুই মুছে যায় না, আমি চিরদিন আছি, চিরদিন থাকব। আমি অনুভব করি, আমাকে ছাড়িয়ে আমার উপরে আছে আত্মা, আর এই জগতে আছে সত্য।
প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল না। গাড়ি ও ঘোড়াকে অনেকক্ষণ ওপারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দিগন্তে সূর্য অর্ধেক ডুবে গেছে, একটা সান্ধ্য কুয়াশা ফেরিটাকে ঘিরে আছে। কিন্তু পিয়ের ও আন্দ্রু তখনো ফেরিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছে দেখে পরিচারক, কোচয়ান ওঁ ফেরিচালক সকলেই অবাক হয়ে গেছে।
যদি ঈশ্বর থাকেন পরকাল তাকে, তাহলে সত্য ও সও আছে, আর তাকে লাভ করার সাধনাতেই আছে মানুষের সর্বোচ্চ সুখ। আমাদের বাঁচতে হবে, ভালোবাসতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে যে একটুকরো পৃথিবীতে শুধু আজকের জন্যই আমরা বেঁচে নেই, আমরা বেঁচে আছি, চিরকাল বেঁচে থাকব ওখানে ওই ভূমার মধ্যে, আকাশের দিকে আঙুল বাড়িয়ে পিয়ের বলল।
রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রিন্স আন্দ্রু মন দিয়ে পিয়েরের কথাগুলি শুনল। নীল জলরাশির উপর সূর্যের রক্তিম ঝিলমিলের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। চারদিকে পরম প্রশান্তি। পিয়েরও চুপ করল। ফেরিটা থেমে আছে, ঢেউ এসে ধীরে ধীরে তার গায়ে পড়ছে। ঢেউগুলি যেন তার কানে কানে বলছে :
এ কথাই সত্য, বিশ্বাস কর।
একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে পিয়েরের মুখের দিকে তাকাল।
বলল, ঠিক বলেছ, আহা, তাই যেন হয়! যাই হোক, এবার নামতে হবে।
ফেরি থেকে নেমে এসে প্রিন্স আন্দ্রু আকাশের দিকে তাকাল। অস্তারলিজের রণক্ষেত্রে শুয়ে যে শাশ্বত আকাশকে দেখেছিল, অনেক দিন পরে এই প্রথম আর একবার সেই আকাশকে দেখতে পেল। একটা কিছু যা এতদিন তার মধ্যে ঘুমিয়েছিল, যা তার অন্তরের সেরা সম্পদ, তাই যেন সহসা জেগে উঠল তার যৌবনদীপ্ত আনন্দময় অন্তরের মধ্যে। চিরাচরিত জীবনযাত্রায় ফিরে আসা মাত্রই সে ভাব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, কিন্তু সে একটা বুঝতে পারল যে ভাবটা তার মধ্যে আছে। পিয়েরের সঙ্গে এই দেখা তার জীবনের একটা যুগান্তকারী ঘটনা। যদিও বাইরে সে একই পুরনো জীবনের পথেই চলতে লাগল, তবু তার অন্তরে শুরু হল এক নতুন জীবন।
.
অধ্যায়-১৩
প্রিন্স আন্দ্রু ও পিয়েরর যখন বল্ড হিলসের সামনের ফটকে পোঁছল তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। বাড়ির কাছাকাছি হতে প্রিন্স আন্দ্রু মৃদু হেসে পিছনের বারান্দায় একটা গোলমালের প্রতি পিয়েরের মনোযোগ আকর্ষণ করল। বয়সের ভারে নুয়েপড়া ঝোলা পিঠে একটি স্ত্রীলোক এবং কালো পোশাকপরা একটি লম্বা চুল বেঁটে যুবক গাড়িটাকে দেখেই ফটকে ছুটে এল। তাদের পিছনে আরো দুটি স্ত্রীলোক ছুটে এল। গাড়িটার চারদিক দেখে নিয়ে চারজনই বিষণ্ণ মনে পিছনের বারান্দার সিঁড়ির দিকে দৌড়ে চলে গেল।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, এরা সব মারির ভালো মানুষ। ওরা আমাকে বাবা বলে ভুল করেছে। এই একটা ব্যাপারে মারি বাবাকে অমান্য করে চলে। বাবার হুকুম, এই তীর্থযাত্রীদের তাড়িয়ে দিতে হবে, কিন্তু মারি তাদের সাদরে ডেকে আনে।
কিন্তু ভালো মানুষ মানে কী? পিয়ের শুধাল।
প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দেয়ার সময় পেল না। চাকররা বেরিয়ে এল, আর সে তাদের কাছে জানতে চাইল, বুড়ো প্রিন্স কোথায় গেছে এবং শিগগির ফিরে আসবে কি না।
