সে কাজই বা করছ কেন?
কেন, কারণটা তো বললাম। আমার বাবা সেকালের একজন বিখ্যাত লোক। কিন্তু তাঁর বয়স বাড়ছে, আর ঠিক নিষ্ঠুর না হলেও তিনি খুবই উদ্যমশীল। অসংযত ক্ষমতায় তিনি এতই অভ্যস্ত যে অনেক সময় তিনি ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। এখন তো সম্রাট তাঁকে দিয়েছেন সৈন্য-সংগ্রহের প্রধান সেনাপতির ক্ষমতা। পক্ষকাল আগে আমি যদি পৌঁছতে দুই ঘণ্টা দেরি করতাম তাহলে ইয়ুখনভাতে একজন করণিককে তিনি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতেন। প্রিন্স আন্দ্রু হাসল। তাই আমি তার সঙ্গে কাজ করছি, কারণ একমাত্র আমার কথাই তিনি শোনেন, তাই মাঝে মাঝে এমন সব কাজ করা থেকে তাঁকে বিরত করতে পারি যার জন্য পরে তাকে কষ্ট পেতে হত।
তবেই বুঝতে পারছ।
বুঝতে ঠিকই পারছি, তবে তুমি যা ভাবছ তা নয়। ওই পাজি করণিকটা নতুন সৈন্যদের বুট চুরি করেছিল, তার জন্য আমার মোটেই মাথা ব্যথা ছিল না, এখনো নেই। সে ফাঁসিতে ঝুললেই আমি খুশি হতাম, কিন্তু আমার দুঃখ আমার বাবার জন্য-আর সেটা তো আমার নিজের জন্যই হল।
প্রিন্স আন্দ্রু ক্রমেই উজ্জীবিত হতে লাগল। তার কাজকর্মের মধ্যে প্রতিবেশীর ভালো করার বাসনা যে তার ছিল না এটা প্রমাণ করতে গিয়ে তার চোখ দুটি যেন তীব্র আবেগে জ্বলতে লাগল।
সে বলতে লাগল, এই যে তুমি তোমার ভূমিদাসদের মুক্তি দিতে চাইছ, এটা খুব ভালো কাজ, কিন্তু তোমার পক্ষে নয়–তুমি যে কখনো কাউকে চাবুক মেরেছ বা সাইবেরিয়ায় পাঠিয়েছ তা আমি মনে করি না–তোমার ভূমিদাসদের পক্ষে তো মোটেই নয়। তাদের যদি মারা হয়ে থাকে, কশাঘাত করা হয়ে থাকে, সাইবেরিয়ায় পাঠানো হয়ে থাকে, তাতে তাদের অবস্থা কিছু বেশি খারাপ হয়েছে বলে আমি মনে করি না। সাইবেরিয়াতে গিয়ে তারা সেই একই পশুর জীবন যাপন করে, শরীরের আঘাতের দাগ শুকিয়ে যায়, তারা আগের মতোই সুখে দিন কাটায়। কিন্তু মালিকদের পক্ষে এটা ভালো কাজ, কারণ ন্যায়ভাবেই হোক অন্যায়ভাবেই হোক, অন্যকে শাস্তি দিতে পারার জন্য তাদের উপর নেমে আসে নৈতিক বিনষ্টি, তারা অনুতাপে দগ্ধ হয়, আর সে অনুতাপকে চেপে রেখে ক্রমে নির্বিকার হয়ে ওঠে। সেই মানুষগুলোর জন্যই আমার করুণা হয়, আর তাদের ভালোর জন্যই আমি ভূমিদাসদের মুক্তি দিতে চাই। তুমি হয়তো দেখনি, কিন্তু আমি দেখেছি, কেমন করে সীমাহীন ক্ষমতার ঐতিহ্যে লালিত-পালিত এইসব ভালো মানুষরা ক্রমেই আরো বেশি খিটখিটে হয়ে ওঠে, নির্মম ও কঠোর হয়ে ওঠে, সে সম্পর্কে সচেতন হয়েও নিজেদের সংযত করতে না পেরে ক্রমে আরো বেশি শোচনীয় অবস্থায় পড়ে।
প্রিন্স আন্দ্রু এমন আন্তরিকভাবে কথাগুলি বলল যে পিয়ের কিছুতেই না ভেবে পারল না যে তার বাবাকে দেখেই কথাগুলি তার মনে এসেছে।
সে কোনো জবাব দিল না।
অতএব আমার দুঃখের কারণ-মানবিক মর্যাদা, মনের শান্তি, পবিত্রতা, ভূমিদাসদের পিঠ ও কপাল নয়, যতই মার, যতই কামিয়ে দাও, সে-পিঠ, সে-কপাল সেই একই থাকে।
না, না! হাজারবার না! তোমার সঙ্গে আমি কোনোদিন একমত হব না, পিয়ের বলল।
.
অধ্যায়-১২
সন্ধ্যায় দিকে আন্দ্রু ও পিয়ের একটা ভোলা গাড়িতে চেপে বল্ড হিলসে চলে গেল। প্রিন্স আন্দ্রু মাঝে মাঝেই পিয়েরের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে কথা বলতে লাগল যাতে বোঝা গেল যে তার মেজাজ বেশ ভালো আছে।
মাঠের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সে চাষবাসের ব্যাপারে যে সব উন্নতি করেছে তা বলতে লাগল।
পিয়ের চুপচাপ বসে রইল, হু-হাঁ করে জবাব সেরে নিজের চিন্তার মধ্যেই ডুবে রইল।
সে ভাবছে, প্রিন্স আন্দ্রু খুব দুঃখী, সে ভুল পথে চলেছে, সত্যিকারের আলো দেখতে পাচ্ছে না, আর তাই পিয়েরের উচিত তাকে সাহায্য করা, আলো দেখানো এবং তুলে ধরা। কিন্তু কি বলা উচিত সে-কথা ভাবতেই তার মনে হল যে প্রিন্স আন্দ্রু তো এককথায়, একটি যুক্তিতে তার সব বক্তব্য নস্যাৎ করে দেবে, কাজেই সে কোনো কথা বলতে সাহস পেল না।
তারপরই হঠাৎ একসময় মাথাটা নিচু করে আক্রমণোদ্যত ষাঁড়ের মতো বলে উঠল, না, কিন্তু তুমি এ কথা ভাবছ কেন? এরকম ভাবা তোমার উচিত নয়।
ভাবছি? কি ভাবছিঃ প্রিন্স আন্দ্রু সবিস্ময়ে শুধাল।
জীবনের কথা, মানুষের ভাগ্যের কথা। এরকম তো হতে পারে না। নিজের সম্পর্কেও আমি এইরকম ভাবতাম, কিন্তু কে আমাকে বাঁচিয়েছে জান? ভ্রাতৃসংঘ! না, হেসো না। আমি যা ভাবতাম ভ্রাতৃসংঘ সেরকম কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয় : ভ্রাতৃসংঘ মানবতার শ্রেষ্ঠ, শাশ্বত স্বরূপের এক শ্রেষ্ঠ প্রকাশ।
সে ভ্রাতৃসংঘের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে শুরু করল। ভ্রাতৃসংঘ শেখায় রাষ্ট্র ও গির্জার বন্ধন থেকে মুক্ত খৃস্টধর্মের বাণী, শেখায় সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও প্রেম।
পিয়ের বলতে লাগল, আমাদের পবিত্র ভ্রাতৃত্বই জীবনের একমাত্র প্রকৃত তত্ত্ব, আর সবই স্বপ্ন। কি জান ভাই, এই সংঘের বাইরে যা কিছু সবই প্রতারণা ও মিথ্যায় ভরা, আমি তোমাদের সঙ্গে একমত যে, অপরের কোনো ক্ষতি না করে তোমার মতো শুধু নিজের জন্য বাঁচবার চেষ্টা করা ছাড়া একটি বুদ্ধিমান সৎ লোকের জীবনে আর কিছুই করার নেই। কিন্তু আমাদের মূল বিশ্বাসকে গ্রহণ কর, আমাদের ভ্রাতৃসংঘে যোগ দাও, আমাদের পথে চল, সঙ্গে সঙ্গে তুমি বুঝতে পারবে, যেমন আমি নিজে বুঝেছি, যে অদৃশ্য শৃঙ্খলের আদি লুকিয়ে আছে স্বর্গে তুমিও তারই একটা অংশ।
