লোকটাকে যে মেরে ফেলিনি সেজন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই, পিয়ের বলল।
তা কেন? প্রিন্স আন্দ্রু শুধাল। একটা পাপাশয় কুকুরকে মারা তো সত্যিকারের ভালো কাজ।
না, একটা মানুষকে মারা খারাপ-অন্যায়।
প্রিন্স আন্দ্রু তবু বলল, অন্যায় হবে কেন? কি ন্যায় আর কি অন্যায় সেটা জানা মানুষের কর্ম নয়। মানুষ চিরকাল ভুল করে এসেছে, চিরকাল ভুল করবে–বিশেষ করে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারের বেলায়।
পিয়ের বলল, যা অন্যের ক্ষতি করে তাই খারাপ।
অন্যের পক্ষে কি খারাপ সেটা তোমাকে কে বলে দিয়েছে?
পিয়ের সোচ্চারে বলে উঠল, খারাপ! খারাপ! কি যে খারাপ তা আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি।
হ্যাঁ, তা বুঝতে পারি, কিন্তু যে ক্ষতি সম্পর্কে আমি নিজে সচেতন সেটাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে পারি না, পিয়েরের কাছে নিজের নতুন দৃষ্টিভঙ্গিটাকে প্রকাশ করবার ইচ্ছায় আরো বেশি উৎসাহের সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রু বলল। বলল ফরাসিতে। জীবনে সত্যিকারের দুটি পাপের কথা আমি জানিঃ অনুতাপ ও অসুস্থতা। এই দুইয়ের অনুপস্থিতিই একমাত্র কল্যাণ। এই দুই পাপকে পরিহার করে নিজের জন্য বাঁচাই এখন আমার জীবনদর্শন।
পিয়ের বলে উঠল, আর প্রতিবেশীকে ভালোবাসা, আত্মত্যাগ? না, তোমার সঙ্গে আমি একমত হতে পারছি না। পাপ করব না, অনুতাপ করব না–শুধু তেমন করে বাঁচাটাই যথেষ্ট নয়। আমি সেইভাবেই বেঁচে ছিলাম, নিজের জন্য বেঁচেছিলাম, আর তাতেই জীবনটাকে নষ্ট করেছি। আর এখন জীবনটাকে চালাচ্ছি, অন্তত চালাবার চেষ্টা করছি অপরের জন্য, আর তাই এখন পেয়েছি জীবনের সব সুখের আস্বাদ। না, তোমার সঙ্গে আমি একমত হব না, আর তুমিও মুখে যা বলছ আসলে তা বিশ্বাস কর না।
ব্যঙ্গের হাসি হেসে প্রিন্স আন্দ্রু নীরবে পিয়েরের দিকে তাকাল।
বলল, আমার বোন প্রিন্সেস মারির সঙ্গে দেখা হলে বুঝবে তার সঙ্গে তোমার মিলবে ভালো। হয়তো তোমার দিক থেকে তুমি ঠিকই বলেছ, কিন্তু প্রত্যেকেই তো নিজের মতো করে বাঁচতে চায়। তুমি নিজের জন্য বাঁচতে চেয়েছ, আর বলছ যে জীবনটাকে প্রায় নষ্ট করে ফেলেছি, এবং অন্যের জন্য বাঁচতে শুরু করে তবেই সুখের স্বাদ পেয়েছ। আমার অভিজ্ঞতা ঠিক উল্টো। আমি বেঁচেছি গৌরবের জন্য। আর শেষপর্যন্ত গৌরব কাকে বলে? সেই একই-অন্যকে ভালোবাসা, তাদের জন্য কিছু করার বাসনা, তাদের সমর্থন লাভের বাসনা। সুতরাং আমিও পরের জন্যই বেঁচেছি, আর সম্পূর্ণ না হলেও জীবনটাকে প্রায় নষ্ট করে ফেলেছি। আর যখন থেকে কেবলমাত্র নিজের জন্যই বাঁচতে শুরু করেছি তখনই পেয়েছি কিছুটা শান্তি।
উত্তেজিত হয়ে পিয়ের শুধাল, কিন্তু নিজের জন্য বাঁচা বলতে তুমি কি বোঝাতে চাও? তোমার ছেলে, তোমার বোন, তোমার বাবা–তাদের কি হবে?
কিন্তু তারা তো আমারই লোক-অন্য নোক নয়, প্রিন্স আন্দ্রু বুঝিয়ে বলল। অন্য লোক, প্রতিবেশীর দল, তারাই তো যত নষ্টের গুরু। ওই যে তোমার কিয়েভ চাষীরা যাদের তুমি ভালো করতে চাও।
ঠাট্টার ভঙ্গিতে সে পিয়েরের দিকে তাকাল।
আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে পিয়ের জবাব দিল, তুমি ঠাট্টা করছ। আমি যদি কারো ভালো করতে চাই, এমন কি কিছু ভালো করেও থাকি, তাতে দোষের বা অন্যায়ের কি থাকতে পারে? আমাদের ভূমিদাসদের মতো, আমাদের নিজেদের মতো যেসব হতভাগ্য মানুষ এতকাল আচার-অনুষ্ঠান ও অর্থহীন প্রার্থনার বাইরে ঈশ্বর ও সত্য সম্পর্কে কিছু না জেনেই জন্মেছে ও আজ যদি তাদের আমরা ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতি, নৈতিক উজ্জীবনের প্রতি, সান্ত্বনার প্রতি বিশ্বাসের দীক্ষা দিয়ে থাকি তাতে দোষের কি থাকতে পারে? যেসব মানুষ বিনা সাহায্যে অসুখে মারা যাচ্ছিল অথচ যাদের অনায়াসেই কিছু বাস্তব সাহায্য দেওয়া যেত, তাদের যদি আমি আজ ডাক্তার ও পাসপাতাল দিয়ে, বৃদ্ধদের আশ্রয়-শিবির দিয়ে সাহায্য করে থাকি, তাতে দোষের বা ভুলের কি থাকতে পারে?…আর খুব খারাপভাবে ও ছোট করে হলেও সে কাজই আমি করেছি। আসল কথা হল, আমি জেনেছি, নিশ্চিতভাবেই জেনেছি যে এই সব ভালো কাজ থেকেই আসে জীবনের একমাত্র নিশ্চিত সুখ।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, হ্যাঁ, এভাবে যদি কথাটা বল তো সেটা আলাদা ব্যাপার। আমি বাড়ি তৈরি করছি, বাগান করছি, আর তুমি হাসপাতাল তৈরি করছ। এ দুটো পথেই অবসর বিনোদন করা যায়। কিন্তু কোনটা ঠিক আর কোনটা ভালো সে বিচার সেই করতে পারে যে সবকিছু জানে, আমরা নই। বেশ তো, তর্ক করতে চাও তো চলে এস।
টেবিল থেকে উঠে দুজন গিয়ে বারান্দায় বসল। তারপর দুজনের মধ্য তর্কের ঝড় উঠল, আর একসময় উঠল যুদ্ধের প্রসঙ্গ।
পিয়ের প্রশ্ন করল, তুমি যুদ্ধে যোগ দিলে না কেন?
প্রিন্স আন্দ্রু বিষণ্ণ স্বরে বলল, অস্তারলিজের পরেও! না, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। প্রতিজ্ঞা করেছি, আর কোনোদিন সক্রিয়ভাবে রুশ বাহিনীতে ঢুকব না। না কখনো না–এমন কি বোনাপার্ত যদি এই স্নোলেনস্কে এসে বন্ড হিলসকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়-তবু আমি রুশ বাহিনীতে চাকরি করব না! এখন তো সৈন্য সংগ্রহের পালা চলছে। তিন নম্বর জেলার প্রধান কর্তা আমার বাবা, আর আমার পক্ষে যুদ্ধে যাওয়া থেকে রেহাই পাবার একমাত্র পথ তার অধীনে কাজ করা।
তাহলে তাই করছ?
করছি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
