খুশি মনে দক্ষিণ রাশিয়া হয়ে জমিদারি পরিদর্শন শেষ করে বাড়ি ফিরেই পিয়ের স্থির করল বন্ধু বলকনস্কির সঙ্গে দেখা করতে যাবে। দু-বছর তার সঙ্গে দেখা হয়নি।
একটা সমতল একঘেয়ে গ্রামাঞ্চলে বোচারোভো অবস্থিত। চারদিকে মাঠ এবং ফার ও বার্চ গাছের জঙ্গল, তার কিছু অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। নতুন-কাটা জল-ভর্তি একটা পুকুরের পিছনে বাড়িটা অবস্থিত। পুকুরপাড়ে এখনো ঘাস গজায়নি। বড় রাস্তা বরাবর এগিয়ে গেলে গ্রামের একেবারে শেষপ্রান্তে কয়েকটা ছোট ফার গাছের ঝোঁপের মধ্যে বাড়িটা চোখে পড়ে।
বাস্তুভিটেতে আছে একটা ঝাড়াই-উঠোন, বহির্বাটি, আস্তাবল, মান-ঘর, আর একটা বড় পাকা বাড়ি–তার অর্ধবৃত্তাকার সম্মুখভাগটা এখনো তৈরি হচ্ছে। বাড়ির চারদিকে একটা নতুন বানানো বাগান। বেড়া ও গেট নতুন ও মজবুত। চালাঘরে রয়েছে সবুজ রং করা দুটো আগুন-পাম্প ও একটা জলের গাড়ি। রাস্তাগুলো সোজা, আর সেগুলো শক্ত ও রেলিং-বসানো। সবকিছুতেই একটা ছিমছাম সুব্যবস্থার আভাস। আন্তন নামে একটি লোক ছেলেবেলায় প্রিন্স আন্দ্রুর দেখাশুনা করত, সেই পিয়েরকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করল এবং একটা পরিচ্ছন্ন ছোট ঘরে নিয়ে বসাল।
পিটার্সবুর্গে যে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে বন্ধুর সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়েছিল তারপরে এই পরিচ্ছন্ন অথচ ছোটখাট বাড়ি দেখে পিয়ের অবাক হলে গেল।
সে দ্রুতপদে অভ্যর্থনা-ঘরে ঢুকে গেল। ঘরটার কাঠের দেয়ালে এখনো পলস্তরা পড়েনি। আন্তন তাড়াতাড়ি দৌড়ে গিয়ে দরজায় টোকা দিল।
আরে, কি হল? একটা তীক্ষ্ণ, অসন্তুষ্ট গলা শোনা গেল।
একজন দর্শনার্থী, আন্তন জবাব দিল।
তাকে অপেক্ষা করতে বল, একটা চেয়ার পিছনে ঠেলে দেবার শব্দ হল।
পিয়ের দ্রুতপায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে গেল, তার চোখে ভ্রুকুটি, বেশ বয়স্ক দেখাচ্ছে। পিয়ের তাকে জড়িয়ে ধরল, চশমা তুলে বন্ধুর গালে চুমো খেয়ে ভালোভাবে তাকে দেখতে লাগল।
আচ্ছা, আমি তো তোমাকে আশাই করিনি, খুব খুশি হয়েছি, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
পিয়ের কিছুই বলল না, অবাক হয়ে একদৃষ্টিতে বন্ধুকে দেখতে লাগল। তার পরিবর্তনটাই তার চোখে পড়ছে। তার কথাগুলি সহৃদয়, ঠোঁটে ও মুখে হাসিটি লেগে আছে, কিন্তু চোখ দুটি একঘেয়ে ও প্রাণহীন। প্রিন্স আন্দ্রুলু অনেকটা শুকিয়ে গেছে, মলিন হয়ে গেছে, আরো বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছে, কিন্তু পিয়ের সবচাইতে অবাক হল তার নিষ্ক্রিয়তা ও ভুরুর উপরকার ভাঁজটা দেখে, দেখলেই মনে হয় একটা চিন্তার মধ্যে সে যেন বড় বেশি ডুবে আছে।
দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরে দেখা হলে যেমনটি হয়ে থাকে, আলোচনা একটা সঠিক রূপ নিতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। এ-কথা সে-কথার পরে পিয়েরের মনে একটা দুর্নিবার ইচ্ছা জাগল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে বন্ধুকে জানিয়ে দিতে চায় যে পিটার্সবুর্গে সে যা ছিল এখন সে তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পিয়ের হয়ে উঠেছে।
তখন থেকে আমি যে কত পথ পেরিয়ে এসেছি তা তোমাকে বলতে পারব না। এখন নিজেই নিজেকে চিনতে পারি না।
ঠিক কথা, আমরা অনেক বদলে গেছি, অনেক বেশি বদলে গেছি, প্রিন্স আন্দ্রু বল।
আচ্ছা, তুমিও? তোমার পরিকল্পনাটা কি?
পরিকল্পনা? প্রিন্স আন্দ্রু ব্যঙ্গের সুরে কথাটার পুনরাবৃত্তি করল। আমার পরিকল্পনা? দেখতেই তো পাচ্ছ, বাড়ি তৈরি করছি। আগামী বছরেই এখানে পুরোপুরি বাসা বাঁধব…
পিয়ের নীরবে সন্ধানী চোখে প্রিন্স আন্দ্রুর মুখের দিকে তাকাল।
না, আমি বলতে চাইছি… পিয়ের কথা শুরু করতেই প্রিন্স আন্দ্রু তাকে বাধা দিল।
কিন্তু আমার কথা কেন?…আমাকে বল, হ্যাঁ, আমাকে বল তোমার ভ্রমণের কথা, জমিদারিতে গিয়ে কি করেছ সেইসব কথা।
পিয়ের জমিদারিতে গিয়ে যেসব কাজ করেছে তা বলতে শুরু করল, অবশ্য সেইসব উন্নতির ব্যাপারে নিজের ভূমিকার কথা যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখতেই চেষ্টা করল। প্রিন্স আন্দ্রু কোনোরকম আগ্রহ না দেখালেও তার কথা শুনতে লাগল। কীরকম যেন অস্বস্তি বোধ করায় একসময় পিয়ের চুপ করে গেল।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আমি আর কি বলব ভাই। এখানে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছি, আর সবে চারদিকে তাকাবার অবসর পেয়েছি। আজই আমার বোনের কাছে ফিরে যাব। তার সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেব। অবশ্য তুমি তো তাকে চেনই। ডিনারের পরেই আমরা যাব। আমাদের জায়গাটা ঘুরে দেখবে নাকি?
দুইজন বেরিয়ে গেল, ডিনারের সময় পর্যন্ত নানা রাজনৈতিক খবর ও পরিচিত লোকদের নিয়ে আলোচনা করল। নিজের বাড়ি তৈরির কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু বলল :
এসব কথা মোটেই ভালো লাগবার মতো নয়। চল, ডিনার শেষ করেই যাত্ৰা করি গে।
খেতে বসে পিয়েরের বিয়ের কথা উঠল।
সেকথা শুনে আমি তো খুবই অবাক হয়েছিলাম, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
পিয়েরের মুখ যথারীতি লাল হয়ে উঠল, তাড়াতাড়ি বলল :
কি করে কি হল সব তোমাকে একসময় বলব। কিন্তু তুমি তো জান সেসব চুকে গেছে, চিরদিনের মতো চুকে গেছে।
চিরদিনের মতো প্রিন্স আন্দ্রু বলল। কোনো কিছুই চিরন্তন নয়।
কিন্তু কীভাবে সব শেষ হল তা তো তুমি জান, তাই না? দ্বৈত যুদ্ধের কথা তো শুনেছ?
তাহলে সে-পথেও হেঁটেছ?
