কিয়েভে কিছু পরিচিত লোকের সঙ্গে পিয়েরের দেখা হল, অপরিচিত লোকরাও প্রদেশের সবচাইতে বড় জমিদার এই সম্পদশালী নবাগত লোকটির সঙ্গে পরিচয় করতে সাগ্রহে এগিয়ে এল এবং তাকে সানন্দে অভ্যর্থনা জানাল। পিয়েরের সবচাইতে বড় দুর্বলতার প্রলোভন সেখানে এত বেশি যে সেগুলিকে সে প্রতিরোধ করতে পারল না। তার জীবনের দিন, সপ্তাহ ও মাসগুলি হৈ-হৈ করে কেটে যেতে লাগল, সান্ধ্য আসর, ডিনার, লাঞ্চ ও বলনাচ নিয়ে সে এতই মেতে উঠল যে ভাবনা-চিন্তার কোনো ফুরসুতই সে পায় না। যে নতুন জীবন যাপনের আশা নিয়ে সে এসেছিল তার পরিবর্তে নতুন পরিবেশে সেই একই পুরনো জীবনই সে যাপন করতে লাগল।
১৮০৭-এর বসন্তকালে সে স্থির করল পিটার্সবুর্গে ফিরে যাবে। পথে তার ইচ্ছা হল সবগুলি জমিদারি পরিদর্শন করে নিজের চোখে দেখে যাবে তার আদেশ কতদূর কার্যকরী হয়েছে, যে ভূমিদাসদের ঈশ্বর তার হাতে তুলে দিয়েছেন এবং যাদের কল্যাণ সে করতে চায় তারা কী অবস্থায় আছে।
বড় নায়েব মনে করে যুবক মনিবের এই সব প্রচেষ্টা পাগলামিরই নামান্তর, কি তার নিজের, কি কাউন্ট ও ভূমিদাসদের, কারোই এতে কোনো লাভ হবে না, তবু মনিবের নির্দেশ মতো কিছু-কিছু কাজ সে করতে লাগল। ভূমিদাসদের মুক্তির ব্যাপারটাকে অবাস্তব মনে করলেও মনিবের আসার আগেই সে সব জমিদারিতে স্কুল, হাসপাতাল ও আশ্রয়-শিবিরের জন্য অনেক বড় বড় বাড়ি তৈরি করে ফেলল। সর্বত্র তার ভালোরকম অভ্যর্থনার আয়োজন করল।
দক্ষিণাঞ্চলের বসন্তের আবহাওয়া, ভিয়েনা-গাড়িতে আরামদায়ক দ্রুত ভ্রমণ, পথের নির্জনতা–সবকিছু মিলিয়ে পিয়েরের মনকে খুশিতে ভরে তুলেছে। একটার পর একটা নতুন জমিদারি দেখছে আর ক্রমেই সেগুলো আরো বেশি করে ভালো লাগছে, মনে হল ভূমিদাসদের অবস্থার উন্নতি ঘটছে, জমিদারের দেওয়া সুখ-সুবিধার জন্য তারা খুবই কৃতজ্ঞ। সর্বত্রই অভ্যর্থনার আয়োজন, তাতে বিব্রত বোধ করলেও মনে মনে পিয়ের বেশ খুশি হয়ে উঠল। এক জায়গায় চাষীরা তাকে উপহার দিল রুটি ও নুন এবং সেন্ট পিতর ও সেন্ট পলের মূর্তি। মনিবের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সন্তগুরু পিতর ও পলের সম্মানে নিজেদের ব্যয়ে গির্জার প্রাঙ্গণে একটা নতুন ভজনালয় নির্মাণের অনুমতিও তারা চেয়ে নিল। বাচ্চা কোলে নিয়ে স্ত্রীলোকরা এল তাকে ধন্যবাদ । জানাতে। তৃতীয় এক জমিদারিতে একজন পুরোহিত কুশ হাতে নিয়ে একদল ছেলেমেয়ে পরিবৃত হয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এল, কাউন্টের উদারতার ফলেই সে ছেলেমেয়েদের লিখতে-পড়তে শেখাচ্ছে, তাদের ধর্মশিক্ষা দিচ্ছে। পিয়ের নিজের চোখেই দেখল সব জমিদারিতে হাসপাতাল, স্কুল ও শিক্ষাকেন্দ্রের জন্য পাকা বাড়ি তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে।
কিন্তু পিয়ের জানতেও পারল না, যেখানে চাষীরা তাকে রুটি ও নুন উপহার দিল এবং পিতার ও পলের সম্মানে একটা ভজনালয় গড়ে তুলতে চাইল সেটা গ্রামের বাজার, সেন্ট পিতর দিবস উপলক্ষে সেখানে তখন একটা মেলা চলছে, ধনীরা ও চাষীরা মিলে অনেক আগেই সেখানে একটা ভজনালয় তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছে, আর সে গ্রামের দশ ভাগের নয়ভাগ চাষী চরম দারিদ্যের মতো দিন কাটাচ্ছে। সে আরো জানল না, সেসব মায়েরা এখন তার জমিতে কাজ করতে যায় না, বাড়িতে নিজেদের জমিতে তাদের আরো অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। সে এ কথাও জানল না, যে পুরোহিতটি কুশ হাতে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল সে চাষীদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করে, আর ছেলেমেয়েদের জোর করে পড়াতে নিয়ে যায় বলে তাদের বাবা-মা চোখের জল ফেলে, মোটা টাকা দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। সে জানল না, পাকা বাড়িগুলো তৈরি হচ্ছে ভূমিদাসদেরই কায়িক পরিশ্রমে, তাই কাগজপত্রে তাদের কাজের বোঝা কম দেখানো হলেও আসলে সেটা আরো বেড়ে গেছে। এইভাবে জমিদারি পরিদর্শন করে পিয়ের খুব খুশি হল, মানবপ্রেমে তার মন ভরে উঠল, এবং গুরুভাইকে (মহাপ্রভুকে সে এই নামেই ডাকে) উৎসাহভরা চিঠিপত্র লিখল।
মনে মনে বলল, কত সহজে, কত অল্প চেষ্টায় কত ভালো কাজ করা যায়, অথচ সেদিকে আমরা কত অল্প মনোযোগ দিই!
সকলের কাছ থেকে এত কৃতজ্ঞতা পেয়ে সে খুশি হল, আবার লজ্জাও পেল। এই কৃতজ্ঞতা তাকে স্মরণ করিয়ে দিল, এইসব সরল সদয় লোকগুলির জন্য আরো কত বেশি সে করতে পারত।
বড় নায়েবটি যেমন দুষ্টু তেমনই ধূর্ত। সরল বুদ্ধিমান কাউন্টটিকে সে ভালোই চিনে নিয়েছে, তাকে নিয়ে হাতের পুতুলের মতো খেলছে, মনিবের খোশ মেজাজ লক্ষ্য করে সে তাকে আরো বেশি করে বোঝাতে লাগল যে ভূমিদাসদের মুক্তি দেওয়া যেমন অসম্ভব তেমনই অদরকারি, কারণ বর্তমান ব্যবস্থাতেই তারা বেশ সুখে আছে।
মনে মনে পিয়েরও নায়েবের সঙ্গে একমত, এদের চাইতে অধিকতর সুখী লোকের কল্পনা করাও শক্ত, মুক্তি পেলে এদের অবস্থা যে কি দাঁড়াবে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। তবু অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে যে কাজকে সঠিক বলে মনে করে তার উপরেই জোর দিতে লাগল। নায়েবও কথা দিল, কাউন্টের ইচ্ছাপূরণের জন্য সে সাধ্যমতো চেষ্টা করবে। জমি ও জঙ্গল বিক্রির সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এবং ভূমিরাজস্ব ব্যাংক থেকে জমি খালাসের চেষ্টা করা হয়েছে কি না সেটা যে কাউন্ট কোনোদিনই বুঝতে পারবে না সে কথা নায়েব ভালো করেই জানে। সে আরো জানে, এ ব্যাপারে কাউন্ট হয়তো আর কোনো খোঁজই করবে না এবং নতুন তৈরি বাড়িগুলো যে খালি পড়ে থাকবে এবং ভূমিদাসরা অন্য সব জমিদারির ভূমিদাসদের মতোই টাকা ও শ্রম দিয়ে যেতে থাকবে–অর্থা তাদের কাছ থেকে সবকিছু নিঙড়ে নেওয়া হবে, তাও সে কোনোদিনই জানতে পারবে না।
০৫.২ জমিদারি পরিদর্শন
অধ্যায়-১১
