চিঠিটা এই পর্যন্ত পড়ে প্রিন্স আন্দ্রু সেটাকে দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। চিঠির কথাগুলিতে সে বিরক্ত হয়নি, তার বিরক্তির কারণ–যে জীবনের সঙ্গে তার এখন আর কোনো সম্পর্কই নেই, তার কথা জেনে সে বিচলিত বোধ করছে। যেন চিঠির বক্তব্য থেকে মনটাকে সরাবার জন্যই সে চোখ বুজল, কপালটা ঘষতে লাগল। হঠাৎ তার মনে হল দরজা দিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল। পাছে ছেলের কিছু হয়ে থাকে এই আশঙ্কায় সে ভীত হয়ে পড়ল। পা টিপে টিপে নার্সারির দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল।
ভিতরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ল, ভয়ার্ত চোখে দাই যেন তার কাছ থেকে কিছু লুকিয়ে ফেলল। প্রিন্সেস মারিও তখন খাটিয়ার পাশে ছিল না।
দাদা, তার পিছন থেকে বোন অস্ফুটস্বরে ডাকল।
দীর্ঘ অনিদ্রা ও উদ্বেগের পরে প্রায়ই যেমন হয়ে থাকে, প্রিন্স আন্দ্রুর মনে একটা অকারণ আতঙ্ক দেখা দিল-তার মনে হল শিশুটি মারা গেছে। সে যা কিছু দেখল ও শুনল তাতে এই আতঙ্কই বুঝি প্রমাণিত হয়েছে।
সব শেষ, সে ভাবল, তার কপালে ঠাণ্ডা ঘাম দেখা দিল। বিচলিতভাবে সে খাটিয়ার দিকে এগিয়ে গেল, তার নিশ্চিত দারণা খাটিয়াটাকে শূন্য দেখতে পাবে, দাই মৃত শিশুটিকেই লুকিয়ে ফেলেছে। পর্দাটা সরিয়ে দিল, কিছুক্ষণের জন্য তার ভয়ার্ত অস্থির চোখ দুটি শিশুটিকে দেখতে পেল না। অবশেষে তাকে দেখতে পেল : গোলাপি শিশুটি বালিশের নিচে মাথা রেখে শুয়ে আছে, ঘুমের মধ্যে ঠোঁট চাটছে আর সমতালে শ্বাস টানছে।
ছেলেকে সেই অবস্থায় দেখে প্রিন্স আন্দ্রু এতই খুশি হয়ে উঠল যেন সে তাকে সত্যি সত্যি হারিয়েছিল। বোনের শিক্ষামতো ছেলের উপর ঝুঁকে ঠোঁট দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল জ্বর আছে কি না। নরম কপালটা ভিজে উঠেছে। প্রিন্স আন্দ্রু মাথায় হাতটা বুলাল, এত বেশি ঘেমেছে যে শিশুর চুল অবধি ভিজে গেছে। ছেলে মারা যায়নি, কিন্তু স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে সঙ্কট কেটে গেছে, এখন সে ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। প্রিন্স আন্দ্রু পিছনে একটা খসখস শব্দ শুনতে পেল, খাটিয়ার পর্দার নিচে একটা ছায়া দেখা দিল। সে ছায়া প্রিন্সেস মারির, নিঃশব্দ পায়ে সে খাটিয়ার কাছে এসেছে। পর্দাটা একবার তুলেই আবার ফেলে দিল। না তাকিয়েই তাকে চিনতে পেরে প্রিন্স আন্দ্রু হাতটা বাড়িয়ে দিল। প্রিন্সেস মারি হাতটা চেপে ধরল।
ও ঘামছে, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
সে-কথা বলতেই আমি আসছিলাম।
শিশুটি ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ে উঠল, হাসল, বালিশে কপালটা ঘষল। প্রিন্স আন্দ্রু বোনের দিকে তাকাল। পর্দার আবছা ছায়া পড়ে বোনের আনন্দাশ্রুসিক্ত উজ্জ্বল চোখ দুটি আরো জ্বলজ্বল করছে। খাটিয়ার পর্দাটায় হাত রেখে সে ঝুঁকে পড়ে দাদাকে চুমো খেল। কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই নির্জনতার মধ্যে তিনজনই যেন আটকা পড়ে থাকতে চাইল। পর্দার মসলিনে মাথা ঘষতে ঘষতে প্রিন্স আন্দ্রুই প্রথম সেখান থেকে সরে গেল।
দীর্ঘনিশ্বাস পেলে বলল, হ্যাঁ, এখন তো আমার এই একটিই অবলম্বন।
.
অধ্যায়-১০
ভ্রাতৃসংঘে ভর্তি হবার কিছুদিন পরেই পিয়ের কিয়েত প্রদেশে চলে গেল। সেখানেই তার ভূমিদাসের সংখ্যা সবচাইতে বেশি। জমিদারিতে গিয়ে সে কী কী কাজ করবে তার একটা পূর্ণ নির্দেশনামা সে নিজেই লিখে সঙ্গে করে নিয়ে গেল।
কিয়েভ পৌঁছেই সে সব নায়েব-গোমস্তাদের ডেকে পাঠাল এবং তার অভিপ্রায় ও ইচ্ছার কথা তাদের বুঝিয়ে বলল। বলল, অবিলম্বে ভূমিদাসদের মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে,যতদিন তা না হয় ততদিন তাদের উপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপানো হবে না, যেসব স্ত্রীলোকদের কোলে শিশু আছে তাদের কাজে পাঠানো হবে না, যথাযথ সাহায্য দিতে হবে, শাস্তি হবে মুখের কথায়, দৈহিক নয়, সব জমিদারিতে হাসপাতাল, আশ্রয়শিবির ও স্কুল খুলতে হবে।
কাউন্ট বেজুখভের প্রচুর সম্পত্তি। তার হাতে এসেছে বার্ষিক পাঁচ লাখ রুবলের আয়ের অঙ্ক। তথাপি পিয়েরের মনে হল, বাবা যখন তার জন্য দশ হাজার রুবল ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল তার চাইতে আজ সে অনেক বেশি গরিব হয়ে পড়েছে। নিম্নলিখিত বাজেটের একটা খসড়া তার চোখে ভাসতে লাগল : সব জমিদারি মিলিয়ে ভূমিরাজস্ব ব্যাংকে জমা দিতে হল ৮০,০০০, মস্কোর নিকটবর্তী জমিদারি ও শহরের বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং তিন প্রিন্সেসের ভাতা বাবদ প্রায় ৩০,০০০, পেন্সন বাবদ ১৫,০০০ এবং প্রায় সমপরিমাণ আশ্রয়শিবিরের দরুন, খোরপোষ বাবদ কাউন্টেসকে পাঠানো হল ১৫০,০০০, ঋণের টাকার সুদ বাবদ গেল ৭০,০০০। নির্মীয়মান নতুন গির্জাটি শেষ করতে গত দুই বছরে খরচ হল প্রতি বছরে ১০,০০০ করে, এবং আরো প্রায় ১০০,০০০ রুবল যে কিসে খরচ হল তা সে জানে না, প্রতি বছরই তাকে বাধ্য হয়ে ধারকর্জ করতে হয়।
প্রতিদিন সে বড় নায়েবের সঙ্গে জমিদারি নিয়ে আলোচনা করল, কিন্তু তাতে অবস্থার কোনো সুরাহা হল বলে মনে হয় না। সে বুঝতে পারল, এ-সব আলোচনার সঙ্গে প্রকৃত অবস্থার কোনো যোগ নেই, এতে প্রকৃত অবস্থার কোনো হেরফেরও হবে না। বড় নায়েব বলে নতুন খরচের কথা, আর পিয়ের বলে ভূমিদাসদের মুক্তির কথা। নায়েব সেটাকে অসম্ভব কাজ বলে না, তার তা করতে হলে নদীর ভাটিতে কথ্রোমা প্রদেশের জঙ্গল এবং ক্রিমিয়ার জমিদারি বেচে দিতে হবে : অথচ সে কাজের সঙ্গে এতকিছু জটিলতা জড়িত, যেমন নিষেধাজ্ঞা, আবেদন, অনুমতি, ইত্যাদি খারিজ করা–যে পিয়ের একেবারেই খেই হারিয়ে বলে ওঠে : বেশ তো, বেশ তো, তাই করুন।
