জীবনের সব চাইতে ঘনিষ্ঠ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সরল সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রশংসা ও গুণকীর্তন অপরিহার্য, ঠিক যেমন গাড়ির চাকা ঠিকভাবে চলবার জন্য তৈলাক্ত জিনিস দরকার।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আমার খেলা সাঙ্গ হয়েছে। আমার কথা বলে আর লাভ কী? এস, তোমার কথা বলা যাক, একটু চুপ করে থেকে সে হেসে বলল।
সঙ্গে সঙ্গে সে হাসি পিয়েরের মুখে প্রতিফলিত হল।
স্মিত হাসি হেসে পিয়ের বলল, আমার সম্পর্কেই বা বলবার কি আছে? আমি কে? এক অবৈধ সন্তান! হঠাৎ তার মুখখানা লাল হয়ে উঠল; পরিষ্কার বোঝা গেল অনেক চেষ্টা করে তবে সে এ কথাটা বলেছে। আমি তো নামহীন, উপায়হীন…আর সত্যি সত্যি… কিন্তু সত্যি সত্যি যে কি তা সে বলল । আপাতত আমি মুক্ত, আমি চেয়েছিলাম তোমার সঙ্গে পরামর্শ করতে।
প্রিন্স আন্দ্রু সদয় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল; সে দৃষ্টি বন্ধুত্বপূর্ণ, স্নেহসিক্ত, তবু তার ভিতর দিয়ে ফুটে উঠল তার শ্রেষ্ঠত্বের আভাস।
তোমাকে আমার ভালো লাগে, তার বিশেষ কারণ আমাদের সকলের মধ্যে একমাত্র তুমিই জীবন্ত মানুষ। হ্যাঁ, তুমিই সঠিক পথের মানুষ! তুমি যা ইচ্ছা বেছে নাও; সবই সমান। যে কোনো জায়গায় তুমি ঠিক খাপ খেয়ে যাবে। কিন্তু একটা কথা : এইসব কুরাগিনদের কাছে এস না, তাদের মতো জীবন যাপন করো না। এই ব্যভিচার, লাম্পট্য, এদের যা কিছু–এ সব তোমাকে মানায় না!
কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে পিয়ের বলল, তুমি কি চাও ভাই? নারী, বুঝেছ, নারী!
প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল, আমি এ সব বুঝি না। যে সব নারীরা ঠিক পথে আছে, তাদের কথা আলাদা, কিন্তু এই কুরাগিনদের মতো নারী, সাকি ও সুরা, এদের আমি বুঝি না।
প্রিন্স ভাসিলি কুরাগিনদের সঙ্গেই পিয়ের বাস করে, তার ছেলে আনাতেলের ব্যভিচারী জীবনের সেও অংশীদার; প্রিন্স আন্দ্রুর বোনের সঙ্গে সেই ছেলের বিয়ে দিয়ে তার চরিত্র শোধরাবার মতলবই করা হয়েছে।
যেন হঠাৎ একটা সুখের কথা মনে পড়েছে এমনিভাবে পিয়ের বলে উঠল, তুমি কি জান? সত্যি বলছি, অনেক দিন ধরে আমি এই কথাটাই ভাবছিলাম।…এ ধরনের জীবন যাপন করি বলে আমি কোনোকিছু স্থির করতে পারি না, বা সঠিকভাবে ভাবতেও পারি না। মাথার যন্ত্রণা হয়, সব টাকা খরচ হয়ে যায়। আজ রাতে সে আমাকে যেতে বলেছিল, কিন্তু আমি যাব না।
আমাকে কথা দিলে যে যাব না?
কথা দিলাম!
*
অধ্যায়-৯
পিয়ের যখন বন্ধুর কাছ থেকে চলে গেল তখন একটা বেজে গেছে। উত্তরাঞ্চলের গ্রীষ্মকালের নির্মেঘ রাত। সোজা বাড়ি যাবার জন্য পিয়ের একটা ভোলা গাড়ি নিল। কিন্তু যত বাড়ির কাছে এগোতে লাগল ততই তার মনে হল যে এ রকম একটা রাত ঘুমিয়ে কাটানো অসম্ভব। যেটুকু আলো আছে তাতে জনহীন রাস্তার অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়; মনে হয় এ যেন রাত নয়, সকাল বা সন্ধ্যা। যেতে যেতে পিয়েরের মনে পড়ল, আজ । রাতেও আনাতোল কুরাগিন যথারীতি তাস নিয়ে অপেক্ষা করে আছে; তারপর বসবে সুরাপানের আসর; আর সব শেষে এমন জায়গায় যাওয়া হবে যেটা পিয়েরের খুব পছন্দ।
আমার তো কুরাগিনদের বাড়িই যাওয়া উচিত, সে ভাবল।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল, সেখানে যাবে না বলে প্রিন্স আন্দ্রুকে কথা দিয়েছে। তারপরই, দুর্বল চরিত্র লোকদের বেলায় যেমন ঘটে থাকে, যে ভ্রষ্টাচারী জীবনে সে অভ্যস্ত তার প্রতি আকর্ষণ এতই প্রবল হয়ে দেখা দিল যে সে সেখানে যাওয়াই স্থির করল। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল যে প্রিন্স আন্দ্রুর কাছে কথা দেওয়ার কোনো মানেই হয় না, কারণ প্রিন্স আনাতোলের জমায়েতে যাবে বলে সে আগেই তাকে কথা দিয়ে রেখেছে; তাছাড়া, এইসব কথা দেওয়া তো একটা মামুলি ব্যাপার, তার কোনো সঠিক অর্থ নেই; বিশেষ করে যখন ভাবা যায় যে কাল তো যে কোনো লোক মরেও যেতে পারে, অথবা এমন কিছু অঘটন ঘটতে পারে যাতে সম্মান-অসম্মান সবই সমান হয়ে দেখা দেবে। নিজের কোনো সিদ্ধান্ত ও অভিপ্রায়কে বাতিল করে দেবার সপক্ষে এই ধরনের যুক্তির আশ্রয় পিয়ের প্রায়ই নিয়ে থাকে। সে কুরাগিনদের বাড়ির পথে পা বাড়াল।
অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনীর ব্যারাকের নিকটবর্তী মস্ত বড় যে বাড়িটায় আনাতোল থাকে সেখানে পৌঁছে পিয়ের আলোকিত ফটক দিয়ে ঢুকে সিঁড়ি পেরিয়ে একটা খোলা দরজার সামনে দাঁড়াল। সামনের ঘরে কেউ ছিল না; খালি বোতল, জোব্বা ও ওভার-৩ চারদিকে ছড়ালো; মদের গন্দ; দূরে নানা কণ্ঠস্বর ও চেঁচামেচি।
তাসের আড্ডা ও নৈশভোজন শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু অতিথিরা তখনো বিদায় হয় নি। গায়ের জোব্বাটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পিয়ের প্রথম ঘরটায় ঢুকল; সেখানে নৈশভোেজনের উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে ছড়িয়ে আছে। কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না ভেবে জনৈক পরিচারক গ্লাসে গ্লাসে যে তলানি পড়ে ছিল তাই গলায় ঢালছিল। তৃতীয় ঘর থেকে ভেসে আসছে হাসির অট্টরোল, পরিচিত গলার চিৎকার। একটা ভালুকের গর্জন, আর সাধারণ হৈ-চৈ। আট-নয়টি যুবক একটা খোলা জানালার কাছে ভিড় জমিয়েছে। অপর তিনজন একটা বাচ্চা ভালুককে শিকল ধরে টেনে অপর সকলের দিকে লেলিয়ে দিচ্ছে।
আমি একশ বাজি ধরছি স্টিভেন্সের উপর, একজন চেঁচিয়ে বলল।
মনে রেখ, কোনোকিছু ধরা চলবে না, আর একজন চেঁচিয়ে উঠল।
