দশ হাজার সৈন্য নিয়ে গ্লোগেট দুর্গের অধিপতি প্রাশিয়ার রাজার কাছে জানতে চাইলেন, তাকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হলে তিনি কি করবেন।… এ সবই সম্পূর্ণ সত্য কথা।
সংক্ষেপে, একটা যুদ্ধের মনোভাব নিয়ে, সব ব্যাপারের মীমাংসা করার আশা নিয়ে আমরা যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছি, আর সে যুদ্ধ আমাদের নিজেদের সীমান্তে এবং প্রাশিয়ার রাজার সঙ্গীরূপে ও তারই জন্য। আমাদের সবকিছু ভালো, শুধু একটা ছোট জিনিসের অভাব, অর্থাৎ একজন প্রধান সেনাপতি। যেহেতু মনে করা হল যে আমাদের প্রধান সেনাপতির বয়স অত অল্প না হলে অস্তারলিজের সাফল্য আরো চূড়ান্ত হতে পারত তাই আমাদের সব অশীতিবর্ষবয়স্কদের কথা আর একবার ভাবা হল এবং প্রজরোভস্কি ও কামেনস্কির মধ্যে শেষোক্তকে বেছে নেয়া হল। আমাদের সেনাপতি সুভরভের মতোই একটা কিবিল্কাতে (পুরনো কালের কাঠের ঢাকা গাড়ি) চেপে এলেন, আর সকলে সমবেত জয়ধ্বনির সঙ্গে তাকে অভ্যর্থনা করল।
৪ তারিখে পিটার্সবুর্গ থেকে প্রথম পত্রবাহক এল। ডাক নিয়ে যাওয়া হল ফিল্ড মার্শালের ঘরে, কারণ সব কাজ নিজে করাটাই তিনি পছন্দ করেন। আমাকে ডাকা হল চিঠিগুলো ভাগ করে আমাদের চিঠিগুলো নিয়ে নিতে। ফিল্ড মার্শাল নিজের চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার চিঠি একটা পেলাম না। ফিল্ড-মার্শাল অধৈর্য হয়ে নিজেই হাত লাগালেন এবং কাউন্ট টি. প্রিন্স ভি, ও অন্যদের কাছে লেখা সম্রাটের চিঠি পেলেন। তখন তিনি সকলের প্রতি, সবকিছুর প্রতি রাগে ফেটে পড়লেন, সব চিঠি হাতে নিয়ে খুলতে লাগলেন এবং অন্যদের কাছে লেখা ম্রাটের চিঠিগুলো পড়তে লাগলেন। আচ্ছা! তাহলে আমার প্রতি এই ব্যবহার! আমার উপর কোনো আস্থা নেই! আচ্ছা, আমার উপর নজর রাখার নির্দেশ! খুব ভালো কথা! সেইভাবেই চলতে থাকুন! আর তখনই তিনি জেনারেল বেনিংসেনকে লিখলেন সেদিকার বিখ্যাত হুকুমনামা : আমি আহত, ঘোড়ায় চড়তে পারি না, ফলে সেনাবাহিনীর পরিচালনা করতে পারছি না। আপনার বাহিনীকে সরিয়ে পুলতুস্কে নিয়ে এসেছেন : সেখানে তারা অরক্ষিত, না আছে জ্বালানি না আছে রসদ, কাজেই একটা কিছু করতেই হবে এবং গতকাল আপনি নিজেই কাউন্ট বাক্সহোদেনের কাছে যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন, তাতে মনে হয় আমাদের সীমান্তে সরে আসার কথাই আপনি ভাবছেন–সে কাজটি আজই সম্পন্ন করুন।
তিনি সম্রাটকে লিখলেন, অনবরত অশ্বারোহণের ফলে আমার জিন ক্ষত হয়েছে, আমি ঘোড়ায় চড়তেই পারছি না এবং এতবড় একটা বাহিনীর পরিচালনা ভারও নিতে পারছি না, তাই পদাধিকারবলে আমার পরবর্তী সেনাপতি কাউন্ট বাক্সহোদেনের উপর আমি সেনাধ্যক্ষের ভার অর্পণ করেছি, আমার সব কর্মচারী ও জিনিসপত্র তাকে পাঠিয়ে দিয়েছি, পরামর্শ দিয়েছি, রুটির অভাব ঘটে থাকলে তিনি যেন প্রাশিয়ার আরো ভিতরে ঢুকে যান, কারণ রুটির রেশন মাত্র একদিনের অবশিষ্ট আছে, ডিভিশন কম্যান্ডার অস্তারমান ও সেদমোরেজকির প্রতিবেদন অনুসারে কোনো কোনো রেজিমেন্টে তাও নেই, চাষীদের কাছে যা ছিল তাও খেয়ে শেষ করে ফেলেছে। ভালো না হয়ে ওঠা পর্যন্ত আমি নিজে অস্ত্রলেংকার হাসপাতালেই থাকব। আমি খবর পেয়েছি, সেনাবাহিনী যদি আরো একপক্ষকাল বর্তমান শিবিরে থেকে যায় তাহলে আগামী বসন্তকাল নাগাদ একটি মানুষও সুস্থ থাকবে না, সেই খবরের উপর ভিত্তি করেই আমার এই বিনীত প্রতিবেদন পাঠালাম।
যে মহৎ ও গৌরবময় কর্তব্য পালনের জন্য এই বৃদ্ধ মানুষটিকে বেছে নেয়া হয়েছিল তা পূর্ণ করতে না পারায় লোকচক্ষে সে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছে, তাই তাকে তার পল্লীভবনে গিয়ে অবসর যাপনের অনুমতি দিন। আপনার সানুগ্রহ অনুমতির জন্য হাসপাতালেই আমি অপেক্ষা করব, যাতে সেনাবাহিনীর কমান্ডার হয়েও সেক্রেটারির ভূমিকায় আমাকে নামতে না হয়। সেনাবাহিনী থেকে আমার অপসারণের ফলে তিলমাত্র বিক্ষোভ হবে না–চলে যাবে তো একটি অন্ধ মানুষ। আমার মতো হাজার হাজার লোক রাশিয়াতে আছে।
সম্রাটের উপর রাগ করে ফিল্ড-মার্শাল শাস্তি দিলেন আমাদের সকলকে, এটাই কি ন্যায়সঙ্গত নয়?
এ তো হল প্রথম অঙ্ক। এরপরের ঘটনা আরো আকর্ষণীয়, আরো মজাদার। ফিল্ড মার্শালের বিদায় গ্রহণের পরে মনে হল আমরা শত্রুর মুখোমুখি এসে গেছি, যুদ্ধ করতেই হবে। বাক্সহোদেন এখন প্রধান .. সেনাপতি, কিন্তু জেনারেল বেনিংসেনের সেটা মনঃপুত নয়, তিনি চান এই সুযোগে নিজের হাতে (জার্মানরা এই ভাষাই ব্যবহার করে) লড়াইটা চালিয়ে কিছুটা মুনাফা লুটে নেবেন। তাই তিনি করলেন। এটাই পুলতুস্তের যুদ্ধ, সেটাকে একটা বিরাট জয় বলে মনে করা হলেও আমার মতে সেরকম কিছু নয়। যাই হোক, যুদ্ধের পরে আমরা পশ্চাদপসরণ করলাম, কিন্তু দূত মারফৎ পিটার্সবুর্গে খবর পাঠালাম যে আমাদের জয় হয়েছে। এদিকে জয়লাভের পুরস্কারস্বরূপ পিটার্সবুর্গে থেকে প্রধান সেনাপতির পদটা পাবার আশায় জেনারেল বেনিংসেন সৈন্য পরিচালনার দায়িত্ব জেনারেল বাক্সহোদেনের হাতে ফিরিয়ে দিলেন না। ফলে দুই সেনাপতির মধ্যে রেশারেশি শুরু হল। দুজনই রেগে লাল, আর তার ফলে বাক্সহোদেন এটাকে গ্রহণ করলেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে, আর বেনিংসেন সন্ন্যাস-রোগীর মতো ক্ষেপে গেলেন। আর ঠিক সেই সংকট মুহূর্তে আমাদের দূত পিটার্সবুর্গ থেকে ফিরে এল বেনিংসনের প্রধান সেনাপতিরূপে নিয়োগের খবর নিয়ে। আমাদের প্রথম শত্রু বাক্সহোদেন পরাজিত হল, এবার দ্বিতীয় শত্রু বোনাপার্তের দিকে আমরা মন দিতে পারব। কিন্তু ঘটনাচক্রে ঠিক সেইমূহুর্তে একটি তৃতীয় শত্রু আমাদের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াল-গোটা রুশ সৈন্যদল সরবে দাবি জানাল রুটি চাই, মাংস চাই, বিস্কুট চাই, ঘোড়ার দানাপানি চাই, চাই অনেক কিছু! ভাণ্ডার শূন্য পথঘাট চলাচলের অযোগ্য। গোড়ায় সৈন্যরা এমনভাবে লুঠতরাজ শুরু করে দিল যা তুমি ভাবতেও পারবে না। অর্ধেক রেজিমেন্ট ডাকাত সেজে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে গিয়ে আগুন ও তলোয়ারের মুখে সবকিছু ধ্বংস করতে লাগর। অধিবাসীরা নিঃস্ব হল, হাসপাতালে রোগী উপচে পড়তে লাগল, সর্বত্র দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। দু দুবার তারা আমাদের প্রধান ঘাঁটির উপর পর্যন্ত আক্রমণ চালাল, আর তাদের তাড়াতে প্রধান সেনাপতিকে আর এক ব্যাটেলিয়ন সৈন্য ডাকতে হল। সেই আক্রমণের সময় তারা আমার শূন্য পোর্টম্যাটো ও ড্রেসিং গাউনটাও নিয়ে গেল। সম্রাট প্রস্তাব করলেন, ডিভিশন-কম্যান্ডাররা ইচ্ছা করলেই লুঠেরাদের গুলি করতে পারবে, কিন্তু আমার তো আশঙ্কা হয় তার ফলে সৈন্যদের এক অংশই অপর অংশের প্রতি গুলি চালাতে বাধ্য হবে।
