তোমার আর তোমার কার্ল আইভনিচের কথা থাক! ওষুধ মেশানো গ্লাসটা নিয়ে সে আবার খাটিয়ার কাছে গেল।
আন্দ্রু, ও কাজ করো না! প্রিন্সেস মারি বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু রেগে বোনের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে গ্লাসটা হাতে নিয়ে ছেলের উপর ঝুঁকে দাঁড়াল।
বলল, কিন্তু এটা আমার ইচ্ছা। তোমাকে মিনতি করছি–ওষুধটা খাইয়ে দাও।
কাঁধ ঝাঁকুনি দিলেও প্রিন্সেস মারি দাদার কথামতো গ্লাসটা নিল এবং নার্সকে ডেকে ওষুধটা খাওয়াতে লাগল। বাচ্চাটি কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল। প্রিন্স আন্দ্রু একটু পিছিয়ে গেল, মাথাটা চেপে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, এবং পাশের ঘরে একটা সোফায় বসে পড়ল।
সবগুলো চিঠি তখনো তার হাতে। যন্ত্রচালিতের মতো সেগুলো খুলে সে পড়তে শুরু করল। বুড়ো প্রিন্স মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত শব্দ ব্যবহার করে নীল কাগজে বড় বড় লম্বা লম্বা অক্ষরে লিখেছে : বিশেষ দূতের মারফত এইমাত্র একটা খুবই আনন্দের সংবাদ পেয়েছি–এখন সেটা মিথ্যা না হলেই হয়। আইলোতে বেনিংসেন বোনাপার্তের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ জয়লাভ করেছে। পিটার্সবুর্গে সকলেই আনন্দ করছে আর সেনাবাহিনীকে অসংখ্য পুরস্কার পাঠানো হচ্ছে। যদিও সে জার্মান-তবু তাকে আমিস অভিনন্দন জানাচ্ছি। কর্চেভোর অধিনায়ককে এক খান্দ্রিকভ-যে কী করছে কিছুই বুঝতে পারছে না, এখনো পর্যন্ত বাড়তি সৈন্য এবং খাদ্যদ্রব্য এসে পৌঁছয়নি। এই মুহূর্তে ঘোড়া ছুটিয়ে গিয়ে তাকে বলে দাও, এক সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু এখানে না এলে আমি তার মুণ্ডুটাই কেটে ফেলব। প্রাশি-আইলো যুদ্ধ সম্পর্কে আর একটা চিঠি পেয়েছি পেতেংকার কাছ থেকে–সে ওই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল–আর এ-সবই সত্যি। দুষ্কৃতকারীরা হস্তক্ষেপ না করলে একজন জার্মান পর্যন্ত বোনাপার্তকে পরাস্ত করতে পারে। সে নাকি লেজে গোবরে হয়ে পালাচ্ছে। মনে থাকে যেন, অবিলম্বে ঘোড়া ছুটিয়ে কর্চেভো চলে যাও এবং আমার নির্দেশ পালন করো!
প্রিন্স আন্দ্রু দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর একখানা খামের সিল ভাঙল। দুই পাতা ভর্তি ঠাসা লেখা বিলিবিনের চিঠি। না পড়েই সে চিঠিটা ভাঁজ করে রাখল এবং বাবার চিঠিটাই আর একবার পড়ল, একেবারে শেষে লেখা শেষ হয়েছে : অবিলম্বে ঘোড়া ছুটিয়ে কর্চেভো চলে যাও, এবং আমার নির্দেশ পালন করো!
দরজার কাছে গিয়ে নার্সারির মধ্যে দৃষ্টি ফেলে সে ভাবল, না, আমাকে ক্ষমা করো, ছেলে একটু ভালো না হওয়া পর্যন্ত আমি যাব না।
প্রিন্সেস মারি তখনো খাটিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে বাচ্চাটিকে দোল দিচ্ছে।
বাবার চিঠির কথা মনে হতে প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, হ্যাঁ, তিনি অপ্রীতিকর আর কী যেন বলেছেন? হ্যাঁ, বোনাপার্তের বিরুদ্ধে আমাদের জয় হচ্ছে, ঠিক যখন আমি সেনাদলে নেই। হ্যাঁ, হ্যাঁ, উনি তো সব সময়ই আমাকে ঠাট্টা করেন…তা বেশ! ঠাট্টাই করতে থাকুন! সে ফরাসি ভাষায় লেখা বিলিবিনের চিঠিটা পড়তে শুরু করল। তার অর্ধেকের অর্থ না বুঝেই পড়ে ফেলল, দীর্ঘ সময় ধরে অন্য সবকিছু ভুলে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে যে কথা সে ভাবছে অন্তত মুহূর্তের জন্যও তাকে ভুলে থাকার জন্যই সে চিঠিটা পড়তে লাগল।
.
অধ্যায়-৯
বিলিবিন এখন সেনাবাহিনীর প্রধান ঘাঁটিতে কূটনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত, যদিও সে লিখেছে ফরাসি ভাষায়, ব্যবহার করেছে ফরাসি রঙ্গরস ও ফরাসি বাকভঙ্গি, তবু গোটা অভিযানকে সে বর্ণনা করেছে খাঁটি রুশীর আত্মসমালোচনা ও আত্ম-বিদ্রুপের ভঙ্গিতে। বিলিবিন লিখেছে, কূটনৈতিক স্বাধীনতার বাধ্যবাধকতা তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে, তাই প্রিন্স আন্দ্রুর মতো এমন একজন নির্ভরযোগ্য পত্রালাপী পেয়ে সে খুশি যার কাছে সেনাবাহিনীর কাজকর্ম স্বচক্ষে দেখার ফলে পেটের মধ্যে যত পিত্ত জমা হয়েছে তাকে উদ্ধার করে ফেলে দেওয়া যায়। চিঠিটা পুরনো, লেখা হয়েছিল-প্রুশিক্ত-আইলো যুদ্ধের আগে।
বিলিবিন লিখেছে, তুমি তো জানেনা বন্ধু প্রিন্স, অস্তারলিজের যুদ্ধে আমাদের চমৎকার সাফল্যের পরে আমি কখনো প্রধান ঘাঁটি ছেড়ে যাইনি। যুদ্ধের প্রতি অবশ্যই আমার একটা আগ্রহ জন্মেছে, আর আমার পক্ষে সেটা ভালোই হয়েছে, গত তিন মাসে আমি যা দেখেছি তা অবিশ্বাস্য।
প্রথম থেকেই শুরু করছি। তুমি জান, মানবজাতির শত্ৰুটি প্রাশীয়দের আক্রমণ করল। প্রাশীয়রা আমাদের বিশ্বস্ত মিত্র হয়েও তিন বছরে তিনবার আমাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমরা তাদের পক্ষ সমর্থন করি, আর দেখা যায় যে মানবজাতির শত্রুটি আমাদের ভালো বক্তৃতায় কোনোরকম কান না দিয়ে তার নিজস্ব কঠোর, বর্বর পন্থায় প্রাশীয়দের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাদের আরব্ধ কুচকাওয়াজটা শেষ করার সময়টুকুও দেয় না, আর হাতের দুই মোচড়ে তাদের ভেঙে টুকরো টুকরো করে পটসডামের প্রাসাদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রাশিয়ার রাজা বোনাপার্তকে লিখলেন, আমার একান্ত বাসনা যে মাননীয় মহোদয়কে আপনার পছন্দমতভাবে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে যতদূর সম্ভব ভালোভাবে আমার প্রাসাদে স্বাগত জানাই ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করি, আর সেই উদ্দেশ্যে সবরকম ব্যবস্থাই আমি গ্রহণ করেছি। আমার প্রচেষ্টা যেন সফল হয়! প্রাশীয় সেনাপতিরা ফরাসিদের প্রতি প্রদর্শিত ভদ্রতার জন্য অবশ্যই গর্ব বোধ করতে পারেন, কারণ প্রথম হুমকিতেই তারা অস্ত্রত্যাগ করেছেন।
