বল্ড হিলসের গির্জার বেদীর কাছে ছোট প্রিন্সেসের সমাধির উপর একটা প্রার্থনা কক্ষ তৈরি করে ইতালি থেকে শ্বেতপাথরের একটি স্মারক এনে সেখানে বসানো হয়েছে, যেন উড়ে যাবার ভঙ্গিতে পাখা মেলে একটি দেবদূত দাঁড়িয়ে আছে। দেবদূতের উপরের ঠোঁটটি যেন আসন্ন হাসির জন্য একটু উঁচু হয়ে আছে। একদিন প্রার্থনা কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে প্রিন্স আন্দ্রু ও প্রিন্সেস মারি দুজনই পরস্পরের কাছে স্বীকার করেছে যে দেবদূতের মুখের সঙ্গে ছোট প্রিন্সেসের মুকের একটা বিস্ময়কর মিল আছে। আরো বিস্ময়ের কথা, মুখ ফুটে বোনকে না বললেও প্রিন্স আন্দ্রু যেন সেই মুখে দেখতে পেয়েছে সেই মৃদু তিরস্কার যা তার মৃত স্ত্রীর মুখে ফুটে উঠেছিল যখন সে বলেছিল, আঃ, আমার প্রতি তুমি এ ব্যবহার করলে কেন?
প্রিন্স আন্দ্রু ফিরে আসার পরেই বুড়ো প্রিন্স বন্ড হিলস থেকে প্রায় পঁচিশ মাইল দূরে অবস্থিত বগুচারোভোর মস্ত বড় জমিদারিটা তাকে হস্তান্তরিত করে দির। বল্ড হিলসের সঙ্গে একটা বিষণ্ণ স্মৃতি জড়িয়ে থাকায়, প্রিন্স আন্দ্রু সবসময় বাবার খামখেয়ালিপনাকে বরদাস্ত করে চলতে না পারায় এবং তার পক্ষে নির্জনে থাকাটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ায়, প্রিন্স আন্দ্রু বগুচাররাভোতে বাড়ি তৈরি করতে শুরু করে দিল, এবং সেখানেই বেশি সময় কাটাতে লাগল।
অস্তারলিজ অভিযানের পরে প্রিন্স আন্দ্রু স্থির করেছিল সামরিক চাকরিতে আর যোগ দেবে না, তাই পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে যখন সকলকেই তাতে যোগ দিতে হল তখন প্রত্যক্ষ যুদ্ধকে এড়াবার জন্য সে সৈন্য সগ্রহের ব্যাপারে বাবার অধীনেই একটা কাজ জুটিয়ে নিল। ১৮০৫ সালের অভিযানের পর থেকে পিতাপুত্র যেন তাদের ভূমিকাকেই পাল্টে ফেলেছে। কর্মে উদ্দীপ্ত বুড়ো মানুষটি নতুন অভিযান থেকে আশা করছে সেরা সুফল, আর প্রিন্স আন্দ্রু যুদ্ধে কোনো অংশ তো নিচ্ছেই না, বরং মনে মনে দুঃখবোধ করছে, আর এই অভিযানের শুধু খারাপ দিকটাই দেখছে।
১৮০৭-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি বুড়ো প্রিন্স কার্যোপলক্ষে বাড়ি থেকে চলে গেল। প্রিন্স আন্দ্রু বাবার অনুপস্থিতির দরুন যথারীতি বল্ড হিলসেই থেকে গেল। চারদিন যাবৎ ছোট নিকলাস অসুস্থ। বুড়ো প্রিন্সকে শহরে পৌঁছে দিয়ে কোচয়ান প্রিন্স আন্দ্রুর জন্য কিছু কাগজপত্র ও চিঠি নিয়ে ফিরে এল।
ছোট প্রিন্সকে তার পড়ার ঘরে না পেয়ে খানসামা চিঠিগুলো নিয়ে প্রিন্সেস মারির ঘরে গেল, কিন্তু সেখানেও তাকে পেল না। শুনল, প্রিন্স নার্সারিতে গেছে।
প্রিন্স আন্দ্রু বাচ্চাদের ছোট চেয়ারে বসে ভুরু কুঁচকে কাঁপা হাতে অর্ধেক পানিভর্তি একটা মদের গ্লাসে ফোঁটা ফোঁটা করে ওষুধ ঢালছিল। জনৈকা দাসী চিঠিগুলো এনে বলল, ইয়োর এক্সেলেন্সি, পেশা এই কাগজপত্রগুলো এনেছে।
এগুলো কী? সে বিরক্ত হয়ে বলল, আর তার হাতটা কেঁপে গিয়ে কয়েক ফোঁটা বেশি ওষুধ গ্লাসে পড়ে গেল। ওষুধটা মেঝেয় ফেলে দিয়ে আরো পানি আনতে বলল। দাসী পানি এনে দিল।
ঘরে আসবাবের মধ্যে আছে একটা বাচ্চাদের খাটিয়া, দুটো বাক্স, দুটো হাতল-চেয়ার, একটা টেবিল, একটা বাচ্চাদের টেবিল, আর একটা ছোট চেয়ার যেটাতে প্রিন্স আন্দ্রু বসে আছে। পর্দাগুলো নামানো, টেবিলের উপর একটা মোমবাতি জ্বলছে, আলোটা যাতে খাটিয়ার উপর না পড়ে সেজন্য একখানা বাঁধানো গানের বই দিয়ে মোমবাতিটাকে আড়াল করে রাখা হয়েছে।
খাটিয়ার পাশে দাঁড়ানো প্রিন্সেস মারি দাদাকে উদ্দেশ করে বলল, বরং একটু অপেক্ষা কর… পরে…
যেন বোনকে আঘাত দেবার জন্যই প্রিন্স আন্দ্রু বিরক্ত গলায় ফিসফিস করে বলল, আঃ, ছাড়ো তো, তুমি তো সবসময় বাজে কথা বলো আর কাজ ফেলে রাখ–আর তার তো এই ফল হয়!
প্রিন্সেস মিনতির সুরে বলল, সত্যি বলছি দাদা… ওকে না জাগানোই ভালো… ও ঘুমিয়ে পড়েছে।
প্রিন্স আন্দ্রু উঠে দাঁড়াল, মদের গ্লাসটা হাতে নিয়েই পা টিপে টিপে ছোট খাটিয়াটার দিকে এগিয়ে গেল।
ইতস্তত করে বলল, হয়তো ওকে না জাগানোই ভালো।
প্রিন্সেস মারি বলল, তোমার যেমন ইচ্ছা… সত্যি… আমার তো তাই মনে হয়… তবে তোমার যেমন ইচ্ছা। দাসীটি ফিসফিস করে প্রিন্স আন্দ্রুকে ডাকায় প্রিন্সেস মারি সেদিকে দাদার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
আজ দুই রাত দুজনের কেউই ঘুমোয়নি, ছেলেটির জ্বর খুব বেশি থাকায় তার উপর নজর রেখেছে। পরিবারের ডাক্তারের উপর ভরসা না করে শহর থেকে অন্য ডাক্তারকে ডেকে পাঠানো হয়েছে, ইতিমধ্যে এই দুটি রাত তারা একটার পর একটা ওষুধ দিয়ে যাচ্ছে। অনিদ্রা ও উদ্বেগে ক্লান্ত হয়ে তারা একে অন্যের ঘাড়ে, কষ্টের বোঝা চাপাচ্ছে আর ঝগড়া করছে।
দাসী অস্ফুট গলায় বলল, পেশা আপনার বাবার কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে এসেছে।
প্রিন্স আন্দ্রু বেরিয়ে গেল।
সব উচ্ছন্নে যাক! সে তো তো করে বলল, বাবা মুখে-মুখে যেসব নির্দেশ পাঠিয়েছে তা শুনে নিয়ে এবং বাবার চিঠি ও অন্য কাগজপত্র হাতে নিয়ে আবার নার্সারিতে ফিরে গেল।
কেমন? জিজ্ঞেস করল।
একই রকম। ঈশ্বরের দোহাই, অপেক্ষা করো। কার্ল আইনিচ সব সময়ই বলেন, ঘুমটাই সবচাইতে বড় কথা, একটা নিশ্বাস ফেলে প্রিন্সেস মারি অনুচ্চ গলায় বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু ছেলের কাছে গিয়ে কপালে হাত রাখল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।
