আন্না পাভলভনা বলল, দেখুন ভাইকোঁত, য়ুরোপ (আন্না এটাকেই ইওরোপের ফরাসি উচ্চারণ বলে মনে করে এবং ফরাসিদের সঙ্গে আলোচনাকালে এই উচ্চারণই করে থাকে) কখনো আমাদের আন্তরিক মিত্র হবে না।
বরিস মনোযোগ সহকারে সকলের বক্তব্যই শুনল, সেই ফাঁকে মাঝে মাঝে পার্শ্ববর্তিনী সুন্দরী হেলেনের দিকেও নজর দিল, হেলেনের চোখ দুটিও স্মিত হাসির সঙ্গে বারকয়েক এই সুদর্শন যুবক এড-ডি কংটির চোখের উপর পড়ল।
প্রাশিয়ার অবস্থার কথা বলতে গিয়ে আন্না পাভলভনা স্বাভাবিকভাবেই বরিসকে অনুরোধ করল, তার গ্লোগাউ অভিযান ও সেখানকার তৎকালীন প্রাশীয় বাহিনীর অবস্থার কথা কিছু বলতে। বরিসও বেশ ভেবেচিন্তে সেনাবাহিনী ও দরবারের কিছু-কিছু আকর্ষণীয় বিবরণ শুনিয়ে দিল। সকলেরই মনোযোগ তার প্রতি আকৃষ্ট হল, কিন্তু সবচাইতে বেশি আগ্রহ দেখাল হেলেন। বেশ কয়েকটি প্রশ্নও সে করল। কথা শেষ হতেই সে হেসে বরিসের দিকে মুখ ফেরাল।
বলল, আপনি অতি অবশ্যই এসে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। মঙ্গলবার আটটা থেকে নটার মধ্যে। আপনি এলে ভারি খুশি হব।
তার ইচ্ছাপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বরিস সবে তার সঙ্গে আলাপ শুরু করেছে এমন সময় আন্না পাভলভনা খালা তাকে ডেকেছে এই অজুহাতে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল।
আন্না পাভলভনা চোখ টিপে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে হেলেনকে দেখিয়ে বলল, ওর স্বামীকে তো তুমি নিশ্চয়ই চেন? আহা, বেচারির ভাগ্যটাই খারাপ! ওর সামনে স্বামীর কথা তুলো না-দয়া করে তুলো না! তাতে ও বড় ব্যথা পাবে!
.
অধ্যায়-৭
বরিস ও আন্না পাভলভনা যখন ফিরে এল তখন অন্য সকলেই প্রিন্স হিপোলিৎতের কথা শুনতে ব্যস্ত। হাতল চেয়ারে বসে সামনে ঝুঁকে সে বলল : প্রাশিয়ার রাজা! আর তারপরেই হেসে উঠল। সকলেই তার দিকে মুখ ঘোরাল।
প্রাশিয়ার রাজা? সপ্রশ্ন ভঙ্গিতে কথাটা বলেই হিপোলিৎ আর একবার হেসে উঠল, তারপর শান্ত, গম্ভীরভাবে চেয়ারে হেলান দিল। তার কথা শুনবার জন্য আন্না পাভলভনা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, কিন্তু সে যখন আর মুখ খুলল না তখন সে নিজেই বলতে শুরু করল পটসডাম-এ পাপিষ্ঠ বোনাপার্ক কর্তৃক মহান ফ্রেডেরিকের তরবারি চুরির কথা।
মহান ফ্রেডেরিকের তরবারির কথাই আমি… সে বলতে শুরু করতেই হিপোলিৎ তাকে বাধা দিয়ে বলে উঠল প্রাশিয়ার রাজা…তারপর সকলে তার দিকে মুখ ফেরাতেই সে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে মুখ বন্ধ করল।
আন্না পাভলভনার ভুরু কুঞ্চিত হল। হিপোলিৎতের বন্ধু মর্তেমার্ত কড়াগলায় বলল, এই যে, প্রাশিয়ার রাজার কথার কী হল?
হিপোলিৎ এমনভাবে হাসল যেন হাসিটাই লজ্জার ব্যাপার।
ও কিছু না। আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম… প্রাশিয়ার রাজার জন্য (ফরাসিতে কথাটাতে বোঝায় বাজে জিনিস) যুদ্ধ করাটাই আমাদের ভুল হয়েছিল।
বরিস বেশ বুদ্ধি করে ঈষৎ হাসল। অন্য সকলে হো-হো করে হেসে উঠল।
শুকনো আঙুল উঁচিয়ে আন্না পাভলভনা বলল, তোমার ঠাট্টাটা বড়ই খারাপ হল, কথাটা সরস হলেও অন্যায়।
সে আরো বলল, আমরা তো প্রাশিয়ার রাজার জন্য যুদ্ধ করিনি। করেছি ন্যায়নীতির জন্য। আঃ, প্রিন্স হিপোলিৎ কী দুষ্টু!
আলোচনাটা একসময় রাজনৈতিক সংবাদের দিকে মোড় নিল। ক্রমে সম্রাট যে-সব পুরস্কার বিতরণ করেছে সেই প্রসঙ্গ উঠল।
প্রগাঢ় পণ্ডিত লোকটি বলল, আপনারা জানেন গত বছর এন-এন-পেয়েছিলেন প্রতিকৃতিখচিত একটা নস্যিদান, তাহলে এস-এস-অনুরূপ সম্মান পাবেন না কেন?
কূটনীতিক বলে উঠল, মাফ করবেন! ম্রাটের প্রতিকৃতিখচিত নস্যিদান একটা পুরস্কারমাত্র, কোনো সম্মান নয়-একটা উপহারও বলতে পারেন।
কিন্তু এরকম দৃষ্টান্ত আছে, আমি শোয়ার্জেনবের্গের কথা উল্লেখ করতে পারি।
অপর একজন বলল, এ অসম্ভব।
বাজি রাখবে? সম্মানসূচক ফিতে একটা আলাদা ব্যাপার…
সকলে উঠে পড়ল। সারা সন্ধ্যা হেলেন সামান্যই কথা বলেছে। এবার সে বরিসের দিকে ঘুরে তাকে মঙ্গলবারের আসার কথাটা স্মরণ করিয়ে দিল।
স্মিত হেসে আন্না পাভলভনার দিকে ঘুরে হেলেন বলল, আমার কাছে এটা খুব বড় কথা। আন্না পাভলভনাও যথারীতি বিষণ্ণ হাসি হেসে তাকে সমর্থন জানাল।
কিন্তু মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হেলেনদের চমকপ্রদ বসার ঘরে এসে বরিস বুঝতেই পারল না তার এখানে আসাটা কেন এত দরকারি ছিল। আরো কিছু অতিথি উপস্থিত ছিল, আর কাউন্টেসও তার সঙ্গে সামান্য কথাই বলল। কিন্তু বিদায় নেয়ার সময় সে যখন কাউন্টেসের হাতে চুমো খেল তখন সে বিচিত্র গম্ভীর মুখে একান্ত অপ্রত্যাশিতভাবে ফিসফিস করে বলল, আগামীকাল ডিনারে এস… সন্ধ্যায়। আসতেই হবে…এসো কিন্তু!
পিটার্সবুর্গে অবস্থানকালে কাউন্টেসের পরিবারের সঙ্গে বরিস বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল।
.
অধ্যায়-৮
যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে, ক্রমেই এগিয়ে আসছে রুশ সীমান্তের দিকে। সকলের মুখেই মানবজাতির শত্রু বোনাপার্তের প্রতি অভিশাপ। গ্রামে গ্রামে চলেছে সামরিক ও বেসামরিক সৈন্য সংগ্রহের অভিযান, রণস্থল থেকে আসছে নানা পরস্পরবিরোধী সংবাদ, যথারীতি সেগুলি মিথ্যা, আর তাই তাদের ব্যাখ্যাও নানারকম।
বুড়ো প্রিন্স বলকনস্কি, প্রিন্স ও প্রিন্সেস মারির জীবনযাত্রা ১৮০৫ সাল থেকে অনেক বদলে গেছে।
সারা রাশিয়া জুড়ে সৈন্য সংগ্রহের যে অভিযান চলেছে তার তত্ত্বাবধানের জন্য যে আটজন প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করা হয়েছে ১৮০৬ সালে, বুড়ো প্রিন্স তাদের অন্যতম। যে সময়ে সে ভেবেছিল যে ছেলে যুদ্ধে মারা গেছে তখন থেকেই তার দেহে বার্ধক্যের দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছে। তবু সম্রাট স্বয়ং যে কর্তব্যের ভার তাকে দিয়েছে তাকে অস্বীকার করাটাকে সে সঙ্গত মনে করেনি, বরং কাজ করার এই নতুন সুযোগ তাকে এনে দিয়েছে নতুন উৎসাহ ও শক্তি। যে তিনটি প্রদেশের ভার তার উপর পড়েছে সেখানে সে অনবরত টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে, সগর্বে নিজ কর্তব্য পালন করছে, অধীনস্থ লোকজনদের কঠোর হাতে পরিচালিত করছে, সবকিছুর উপরেই পুঙ্খানুপুঙ্খ নজর রাখছে। প্রিন্সেস মারি বাবার কাছে গণিতের পাঠ নেয়া বন্ধ করেছে, বুড়ো প্রিন্স যখন বাড়িতে থাকে তখনো দাই ও ছোট্ট প্রিন্স নিকলাসকে (ঠাকুর্দা তাকে ওই নামেই ডাকে) নিয়ে সে বাবার পড়ার ঘরে যায়। প্রিন্সেস মারি দিনের বেশির ভাগ সময় নার্সারিতেই কাটায়, যতদূর সম্ভব ছোট ভাইপোটির প্রতি মায়ের মতোই ব্যবহার করতে চেষ্টা করে। মাদময়জেল বুরিয়েও বাচ্চাটিকে খুবই ভালোবাসে, কোলে পিঠে নিয়ে আদর করে।
