প্রিন্স ভাসিলি বলল, দেখো বাবা, তুমি হা বলে দাও, আমি নিজেই তাকে চিঠি লিখে দিচ্ছি, বাস, সব গোলমাল মিটে যাক।
কিন্তু প্রিন্স ভাসিলির কথা শেষ হবার আগেই তার দিকে না তাকিয়ে পিয়ের বাবার মতোই রুক্ষ অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল, প্রিন্স, আমি আপনাকে এখানে আসতে বলিনি। দয়া করে চলে যান! লাফ দিয়ে উঠে সে দরজাটা খুলে দিল।
চলে যান! সে আবার বলল, প্রিন্স ভাসিলির মুখের বিচলিত, ভীতদৃষ্টি দেখে সে বেশ খুশি হয়ে হল।
তোমার কী হয়েছে, তুমি কি অসুস্থ?
চলে যান! কাঁপা গলায় সে আর একবার বলল। অগত্যা প্রিন্স ভাসিলিকে চলে যেতেই হল।
এক সপ্তাহ পরে নতুন বন্ধু ও সংঘ-ভাইদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এবং ভিক্ষা দেয়ার জন্য প্রচুর অর্থ তাদের হাতে দিয়ে পিয়ের নিজের জমিদারিতে চলে গেল। নতুন ভাইরা তার হাত দিয়ে কিয়েভ এবং ওডেসার ভ্রাতৃসংঘের কাছে চিঠি লিখে দিল, কথা দিল, তাকে চিঠি লিখবে, নতুন কর্মসাধনায় তাকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
.
অধ্যায়-৬
পিয়ের ও দলখভের দ্বৈত যুদ্ধের ব্যাপারটা মিটে গেছে, সে সময় দ্বৈত যুদ্ধ সম্পর্কে সম্রাটের যথেষ্ট কঠোর মনোভাব সত্ত্বেও দুই যোদ্ধা ও তাদের সমর্থক কারো কোনো শাস্তি হল না। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে পিয়েরের সম্পর্ক বিচ্ছেদের দ্বারা সমর্থিত হয়ে সেই দ্বৈত যুদ্ধের গল্প সমাজের সর্বত্রই আলোচিত হতে লাগল। পিয়ের যখন অবৈধ সন্তান ছিল তখন সকলেই তাকে করুণা করত, আবার সে যখন রাশিয়ার সেরা বল হয়ে দেখা দিল তখন সকলেই তার খোশামোদ করতে শুরু করল, আবার বিয়েটা হয়ে যাবার পরে সকলের কাছেই তার দাম কমে গেল-কারণ বিবাহযোগ্য মেয়েদের ও তাদের মায়েদের আর তার কাছে কিছুই আশা করবার রইল না। যা ঘটেছে সে-জন্য এখন সকলে তাকেই দোষ দিচ্ছে, সকলেই বলছে ঈর্ষার বশে তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, বাবার মতোই রাক্ষুসে রাগ তাকেও ভর করেছে। আর পিয়ের চলে যাবার পরে হেলেন যখন পিটার্সবুর্গে ফিরে এল তখন পরিচিতজনরা তাকে সাদরে বরণ করে নিল, এমনকি তার দুর্ভাগ্যের জন্য তাকে কিছুটা সমীহও দেখাতে লাগল। স্বামীর কথা উঠলেই হেলেন এমন ভাব দেখাতে লাগল যেন কারো উপর দোষারোপ না করেই সে স্বামীর দেয়া এই দুঃখের বোঝা নীরবে বয়ে বেড়াবে। প্রিন্স ভাসিলি অবশ্য খোলাখুলিভাবেই তার মনের কথা প্রকাশ করল। পিয়েরের কথা উঠলেই দুই কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে নিজের কপাল দেখিয়ে বলতে লাগল, একটু লেগেছে–একথা তো আগাগোড়াই বলেছি।
আন্না পাভলভনা বলল, আমি তো গোড়াতেই বলেছিলাম। অন্য কেউ বলবার আগেই বলেছি, আজকের দিনের বাজে ভাবনাচিন্তাগুলোই নির্বোধ যুবকটির মাথা খেয়েছে। সকলেই যখন ওকে নিয়ে নাচানাচি শুরু করে দিয়েছিল, ও যখন সবে বিদেশ থেকে ফিরে আমার বাড়ির এক মজলিসেই এমন ভাব দেখাল যেন সেও একজন মারাৎ, তখনই আমি এ-কথা বলেছিলাম। আর এখানেই কি শেষ হয়ে যাবে? আমি তো তখনই এ বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলাম, আর আজ যা কিছু ঘটেছে সবই আগে থেকে বলে দিয়েছিলাম।
১৮০৬ সালের শেষের দিকে। জেনা ও অয়েস্টাড়ে নেপোলিয়নের হাতে প্রাশিয়ান বাহিনীর সম্পূর্ণ পরাজয় ও প্রাশিয়ার অধিকাংশ দুর্গের আত্মসমর্পণের শোচনীয় খবরগুলি যখন পুরোপুরি এসে গেছে, আমাদের বাহিনী যখন প্রাশিয়াতে ঢুকেছে এবং নেপোলিয়নের সঙ্গে আমাদের দ্বিতীয় যুদ্ধ শুরু হতে চলেছে, তখন আন্না পাভলভনা আবার একটা মজলিসের ব্যবস্থা করল। সত্যিকারের উঁচু মহলের যারা সেরা মানুষ তাদের মধ্যে ছিল স্বামীপরিত্যক্তা মনোরমা হেলেন, মর্তেমার্ত, ভিয়েনা থেকে সদ্য প্রত্যাগত প্রিন্স হিপোলিৎ, দুজন কূটনীতিক, বুড়ি খালা ও আরো অনেকে।
সেদিন সন্ধ্যায় আন্না পাভলভনা যে নতুন রত্নটিকে অতিথিদের সামনে হাজির করল সে হল বরিস দ্রুবেৎস্কয়, প্রাশীয় বাহিনীর বিশেষ দূত হিসেবে সে সম্প্রতি এসেছে, কোনো একজন ভি-আই-পির সে এড ডি-কং।
অতিথিরা সকলেই এসে গেছে, আন্না পাভলভনার নেতৃত্বে আলোচনা চলছে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কে ও তার সঙ্গে মৈত্রীসূত্রে আবদ্ধ হবার বিষয় নিয়ে, এমন সময় বরিস ঘরে ঢুকল।
আন্না পাভলভনা চুমো খাবার জন্য তার কুঁচকে যাওয়া হাতটা বরিসের দিকে এগিয়ে দিল, অপরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিল, অস্ফুট স্বরে তাদের কিছু-কিছু বিবরণও শুনিয়ে দিল।
প্রিন্স হিপোলিৎ কুরাগিন-চমৎকার যুবক, এম, কংকা, কোপেনহাগেনের রাষ্ট্রদূত, প্রগাঢ় পণ্ডিত মানুষ, মি. শিতভ বহুগুণের অধিকারী।
নতুন পরিবেশে বরিস নিজেকে বেশ মানিয়ে নিল। সুন্দরী হেলেনের পাশে তার জন্য নির্দিষ্ট আসনটিতে বসে সে মন দিয়ে সকলের আলোচনা শুনতে লাগল।
ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত বলল, ভিয়েনার মতে প্রস্তাবিত সন্ধির মূল কথাগুলি এতই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে যে অবিরাম চেষ্টা চালিয়েও তাদের নাগাল পাওয়া যাবে না, আর তাই সে বিষয়ে ভিয়েনা যথেষ্ট সন্দেহ পোষণ করে। ভিয়েনা মন্ত্রিসভার এটাই আসল বক্তব্য।
মৰ্তেমার্ত বলল, ভিয়েনা মন্ত্রিসভা এবং অস্ট্রিয়ার সম্রাটের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। অস্টিীয়ার সম্রাট কখনো এ ধরনের কথা ভাবতে পারেন না, এটা শুধুমাত্র মন্ত্রিসভার কথা।
