জনৈক ভাই সে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল। পিয়েরকে সামনে নিয়ে গিয়ে একখানা হাতে-লেখা পুঁথি থেকে কার্পেটের উপরকার মূর্তিগুলোর ব্যাখ্যা পড়ে শোনাতে লাগল : সূর্য, চন্দ্র, হাতুড়ি, ওলন, খনি, একটা অমসৃণ পাথর, একটা চৌকো পাথর, একটা স্তম্ভ, তিনটে জানালা, ইত্যাদি। তারপর পিয়েরকে একটা আসন দেওয়া হল, সংঘ-গৃহের প্রতীক-চিহ্নটা দেখানো হল, প্রবেশ-সংকেতটা বলে দেওয়া হল, এবং শেষপর্যন্ত বসবার অনুমতি দেওয়া হল। মহাপ্রভু বিধানাবলি পড়তে শুরু করল। সেই দীর্ঘ পাঠের অর্থ বুঝবার মতো মনের অবস্থা তখন পিয়েরের ছিল না। কোনোরকমে প্রতিটি বিধানের শেষ কথাগুলি সে বুঝতে চেষ্টা করল, আর সেগুলিই তার মনের মধ্যে রয়ে গেল।
মহাপ্রভু পড়তে লাগল, আমাদের মন্দিরে পাপ ও পুণ্যের পার্থক্য ছাড়া আর কোনো পার্থক্য আমরা স্বীকার করি না। সাম্যকে লঙ্ঘন করতে পারে এ রকম কোনো পার্থক্যের কথা থেকে সর্বদা সতর্ক থাকবে। যে কোনো ভাইয়ের সাহায্যেই ছুটে যাবে, কেউ ভুলপথে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনবে, কেউ পড়ে গেলে তাকে তুলে ধরবে, কখনো কোনো ভাইয়ের প্রতি ঈর্ষা বা দ্বেষ পোষণ করবে না। সকলের প্রতি সদয় ও বিনয়ী হবে। সকলের অন্তরে জ্বালাবে পুণ্যের শিখা। নিজের সুখকে প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে ভোগ করবে, ঈর্ষা যেন কদাপি সে আনন্দের পবিত্রতাকে নষ্ট করতে না পারে। শত্রুকে ক্ষমা করবে, তার উপকার করা ছাড়া অন্য কোনোভাবে তার প্রতি প্রতিশোধ নেবে না। এইভাবে সর্বোচ্চ বিধানকে মেনে চললে সেই প্রাচীন মর্যাদা তুমি ফিরিয়ে আনতে পারবে যা তোমরা হারিয়ে ফেলেছ।
কথা শেষ করে মহাপ্রভু দাঁড়িয়ে পিয়েরকে আলিঙ্গন করে চুম্বন করল, অশ্রুসিক্ত চোখে পিয়ের চারদিকে তাকাতে লাগল, চারদিক থেকে সকলে যেভাবে তাকে অভিনন্দন জানাতে লাগল তার জবাবে সে কি বলবে তা বুঝতেই পারল না। এখানে সকলেই তার ভাই, তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ শুরু করতে সে অধৈর্য হয়ে উঠল।
মহাপ্রভু হাতুড়িটা ঠুকল। সব ভাই যার যা জায়গায় বসে পড়ল, আর তাদের একজন পড়ে শোনাতে লাগল বিনয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা।
মহাপ্রভু প্রস্তাব করল, এবার শেষ কর্তব্যটি পালন করতে হবে, আর ভিক্ষা সংগ্রাহক উপাধিকারী সেই বিশিষ্ট ব্যক্তিটি সব ভাইদের কাছে ঘুরতে লাগল। পিয়েরের ইচ্ছা হল তার যা কিছু আছে সব দিয়ে দেবে, কিন্তু পাছে সেটা অহংকারের মতো দেখায় তাই অন্য সকলে যা দিল সেও তাই দিল।
সভার কাজ শেষ হল। বাড়ি ফিরে পিয়েরের মনে হল, দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় অনেক অনেক বছর কাটিয়ে সে ফিরে এসেছে, সে সম্পূর্ণ বদলে গেছে, আগেকার জীবনযাত্রা ও অভ্যাসগুলিকে অনেক অনেক পিছনে ফেলে এসেছে।
.
অধ্যায়-৫
পরদিন বাড়িতে বসে পিয়ের একটা বই পড়তে পড়তে চতুষ্কোণটির তাৎপর্য বুঝবার চেষ্টা করছিল, সেটার একদিকে ঈশ্বরের প্রতীক, অন্যদিকে নীতিবিষয়ক প্রতীক, তৃতীয় দিকে জাগতিক বস্তুর প্রতীক, আর চতুর্থ দিকে এই তিনের একত্র সমাবেশ। তার মন মাঝে মাঝেই বই ও চতুষ্কোণটা থেকে সরে যাচ্ছে, কল্পনায় সে জীবনের একটা নতুন পরিকল্পনা রচনা করছে। আগের দিন রাতে সে শুনেছে যে তার দ্বৈত যুদ্ধের খবর সম্রাটের কানে পৌঁছেছে এবং তার পক্ষে এখন পিটার্সবুর্গ থেকে চলে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই সে…ভাবছে, দক্ষিণাঞ্চলের জমিদারিতে চলে যাবে এবং সেখানে তার ভূমিদাসদের কল্যাণসাধনে আত্মনিয়োগ করবে। সানন্দে এই নতুন জীবনের পরিকল্পনা করছে এমন সময় হঠাৎ প্রিন্স ভাসিলি ঘরে ঢুকল।
ঢুকতে ঢুকতেই প্রিন্স ভাসিলি বলল, দেখ বাপু, মস্কোতে তুমি কি সব কাণ্ড করেছ? তুমি ভুল বুঝেছ। এ ব্যাপারে আমি সব জানি, তাই জোর দিয়েই তোমাকে বলছি যে ইহুদিদের কাছে খৃস্ট যেরকম নির্দোষ ছিলেন, তোমার কাছে হেলেনও তেমনই নির্দোষ।
পিয়ের জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু প্রিন্স ভাসিলি তাকে বাধা দিল।
বলল, তুমি বন্ধুর মতো সোজা কেন আমার কাছে এলে না? আমি এ ব্যাপারে সব জানি, সব বুঝি। যে মানুষ নিজের সম্মানকে মূল্য দেয় তার মতো কাজই তুমি করেছ, হয়তো একটু তড়িঘড়ি করে ফেলেছ, কিন্তু সেকথা থাক। একটু নিচু গলায় বলল, কিন্তু একবার ভেবে দেখ তো, সমাজের চোখে, এমন কি আদালতের চোখে তুমি তাকে ও আমাকে কোথায় এনে ফেলেছ। সে আছে মস্কোতে, আর তুমি আছ এখানে। কিন্তু মনে রেখ বাবা, এটা নেহাৎই একটা ভুল-বোঝাবুঝির ব্যাপার। আশা করি তুমি নিজেও তা বুঝতে পেরেছ। এস না, এখনই আমরা তাকে একটা চিঠি লিখি, তাহলেই সে এখানে চলে আসবে, আর সব কথাই তাকে বুঝিয়ে বলা হবে, কিন্তু বাবা, তা যদি না কর তো আমি বলছি পরে তোমাকে এ জন্য দুঃখ পেতে হবে।
প্রিন্স ভাসিলি অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে পিয়েরের দিকে তাকাল।
বিশ্বস্তসূত্রে আমি জানতে পেরেছি, বিধবা সম্রাজ্ঞী এ ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তুমি তো জানো, হেলেনের প্রতি তিনি খুবই সদয়।
পিয়ের কয়েকবার কথা বলতে চেষ্টা করল, কিন্তু একদিকে প্রিন্স ভাসিলি যেমন তাকে কথা বলতেই দিল না, অন্যদিকে তেমনই শ্বশুরের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে তার মতের বিরুদ্ধে যাবার যে সংকল্প সে করেছে সেভাবে কথা বলতে সে নিজেও কিছুটা ভয় পেল। তাছাড়া, সকলের প্রতি সদয় ও বিনয়ী হও-ভ্রাতৃসংঘের এই বিধানটিও তার মনে পড়ে গেল। সে চোখ কুঁচকাল, তার মুখটা লাল হয়ে উঠল, উঠে দাঁড়াল, আবার বসে পড়ল। একজন লোকের মুখের উপর একটা অপ্রিয় কথা বলা, তার কাছে অপ্রত্যাশিত কিছু বলা-জীবনের এই সবচাইতে কঠিন কাজটি করার জন্য সে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগল। প্রিন্স ভাসিলির কথা মেনে চলতে সে এতই অভ্যস্ত যে তার মনে হল, তার দিক থেকে এই অপ্রিয় আপত্তিটা এখন সে সহ্য করতে পারবে না, তার আরো মনে হল, সে এখন যা বলবে তার উপরেই নির্ভর করছে তার ভবিষ্যৎ-সেই পুরনো পথেই সে চলবে, নাকি সংঘ-ভাইরা যে নতুন পথের সন্ধান তাকে দিয়েছে যা তাকে নতুন জীবন দান করবে বলে সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে সেই পথেই চলবে।
