গুরুভাই বলল, সরলতার চিহ্ন-স্বরূপ এবার তোমাকে বলছি, তোমার প্রধান রিপুকে আমার কাছে প্রকাশ কর।
আমার রিপু! সে তো অনেক আছে, পিয়ের উত্তর দিল।
গুরুভাই বলল, সেই রিপু অন্য সকলের চাইতে যে তোমাকে ধর্মের পথে অধিকতর বিভ্রান্ত করেছে।
পিয়ের চুপ করে একটা উত্তর খুঁজতে লাগল।
মদ? ঔদরিকতা? আলস্য? শ্রমবিমুখতা? কোপনস্বভাব? ক্রোধ? নারী? নিজের সবগুলো দোষ সে মনে মনে আউড়ে গেল, কিন্তু কোনটাকে প্রাধান্য দেবে তা বুঝতে পারল না।
প্রায় অশ্রুত নিচু স্বরে বলল, নারী।
গুরুভাই একটুও নড়ল না, অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোনো কথাই বলল না। অবশেষে পিয়েরের কাছে গিয়ে টেবিল থেকে রুমালটা তুলে নিয়ে আবার তার চোখ বেঁধে দিল।
শেষবারের মতো তোমাকে বলছি–সমস্ত মনোযোগ নিজের উপর নিবদ্ধ কর, ইন্দ্রিয়সমূহকে সংযত কর, সুখের সন্ধান কর নিজের অন্তরে, রিপুর তৃপ্তিতে নয়…
অনেকক্ষণ আগে থেকেই পিয়ের নিজের মধ্যে একটা আনন্দের উৎসকে খুঁজে পেয়েছিল, এবার সে আনন্দের অনুভূতি তার সারা অন্তরে ছড়িয়ে পড়ল।
.
অধ্যায়-৪
এর কিছু পরেই পিয়েরকে নিয়ে যেতে রেটরের পরিবর্তে সেই অন্ধকার ঘরে ঢুকল তার উদ্যোগকর্তা উইলার্স্কি, গলা শুনেই পিয়ের তাকে চিনতে পারল। তার সংকল্পের দৃঢ়তা সম্পর্কে নতুন করে প্রশ্ন করা হলে পিয়ের জবাব দিল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি রাজি, তারপর শিশুর মতো উজ্জ্বল হাসি হেসে খোলা বুকে, এক পায়ে বুট ও অন্য পায়ে চটি পরে অসমান পদক্ষেপে এগিয়ে চলল, আর উইলাৰ্কি একখানা তরোয়াল ঠেকিয়ে রাখল তার খোলা বুকে। সেই ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে একবার এগিয়ে একবার পিছিয়ে শেষপর্যন্ত তাকে সংঘ-কক্ষের দরজায় হাজির করা হল। উইলার্স্কি কাশল, ভিতর থেকে হাতুড়ির শব্দে জবাব এল, দরজা খুলে গেল। একটি অনুচ্চ স্বরে তাকে প্রশ্ন করা হল (তখনো পিয়েরের চোখ বাঁধা) সে কে, কবে কোথায় তার জন্ম হয়েছিল, ইত্যাদি। চোখ বাঁধা অবস্থায়ই আবার তাকে এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল, যেতে যেতেই তাকে শোনানো হল তার তীর্থযাত্রার পরিশ্রমের তাৎপর্যের কথা, পবিত্র বন্ধুত্বের কথা, বিশ্বের শাশ্বত সৃষ্টিকর্তার কথা, সাহসের সঙ্গে সব পরিশ্রম ও বিপদকে সহ্য করবার কথা। তারপর সকলে তার ডান হাতটা ধরে একটা জিনিসের উপর রাখল, অপর হাতে একজোড়া দিকনির্ণয় যন্ত্র বাঁ দিকের বুকের উপর চেপে ধরে একজনের উঁচু সুরে সুর মিলিয়ে সংঘের বিধানাবলির প্রতি আনুগত্যের শপথ উচ্চারণ করতে তাকে বলা হল। তারপর মোমবাতিগুলো নিভিয়ে দেওয়া হল, শুঁকেই পিয়ের বুঝতে পারল কোনো সুরাসার জ্বালানো হল, তাকে বলা হল, এবার সে ছোট আলোটা দেখতে পাবে। তার চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হল, আর জ্বলন্ত সুরাসারের আবছা আলোয় পিয়ের যেন স্বপ্নের ঘোরে দেখতে পেল, রেটরের মতো এপ্রন পরা কয়েকটি লোক হাতের তলোয়ার তার বুকের দিকে উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজনের শাদা শার্টে রক্তের দাগ। তা দেখে পিয়ের তলোয়ারগুলোর দিকে বুক ফুলিয়ে এগিয়ে গেল, যেন বলতে চাইল, মারো আমাকে। কিন্তু তলোয়ারগুলো তার দিক থেকে সরিয়ে নেওয়া হল, আর সঙ্গে সঙ্গে আবার তার চোখ বেঁধে দেওয়া হল।
একটি কণ্ঠস্বরে উচ্চারিত হল, এবার তুমি ছোট আলোটা দেখতে পেয়েছ। তখন মোমবাতিগুলো আবার জ্বেলে দেওয়া হল, তাকে বলা হল, এবার সে পুরো আলোটাই দেখতে পাবে, আবার তার চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হল, আর দশের অধিক কণ্ঠ একসঙ্গে বলে উঠল : Sic transit gloria mundi. (পার্থিব গৌরব এমনি করেই শেষ হয়ে যায়)।
ধীরে ধীরে পিয়েরের সম্বিৎ ফিরে এল, ঘরের চারদিকে তাকিয়ে সে উপস্থিত লোকজনদের দেখতে লাগল। কালো কাপড়ে ঢাকা একটা লম্বা টেবিলকে ঘিরে জন বারো লোক বসে আছে, তাদের পরিধেয় আগেকার লোকগুলির মতোই। তাদের কিছু লোককে পিয়ের পিটার্সবুর্গ সমাজেও দেখেছে। সভাপতির আসনে বসে আছে একটি অপরিচিত যুবক, তার গলায় ঝুলছে একটা অদ্ভুত ধরনের ক্রুশ। তার ডাইনে বসে আছে সেই ইতালিয় মঠাধ্যক্ষ, দুই বছর আগে পিয়ের যাকে আন্না পাভলভনার বাড়িদে দেখেছিল। সেখানে আরো উপস্থিত ছিল একজন অত্যন্ত বিশিষ্ট ব্যক্তি ও জনৈক সুইস ভদ্রলোক যে একসময় কুরাগিন পরিবারে গৃহশিক্ষক ছিল। গম্ভীর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে সকলে সভাপতির কথা শুনতে লাগল, সভাপতির হাতে একটি হাতুড়ি। দেয়ালের ভিতরে একটি তারকাকৃতি আলো জ্বলছে। টেবিলের একপাশে নানারকম মূর্তিখচিত একখানি ছোট কার্পেট পাতা, এবং অন্যপাশে একটি বেদীর উপর রাখা হয়েছে টেস্টামেন্ট ও করোটি। গির্জায় যেমন হয়ে থাকে বেদীটাকে ঘিরে সাতটা বড় মোমবাতি জ্বলছে। ভাইদের ভিতর থেকে দুজন পিয়েরকে বেদীর কাছে নিয়ে গেল, তার পা দুটিকে সমকোণে রেখে তাকে শুয়ে পড়তে বলে ঘোষণা করা হল, মন্দির দ্বারে তাকে সষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করতে হবে।
প্রথমেই ওকে খনিত্র গ্রহণ করতে হবে, এক ভাই ফিসফিস করে বলল। আঃ, চুপ, চুপ! আর একজন বলল।
বিব্রত পিয়ের কারো কথা না শুনে স্বল্পদৃষ্টি চোখ মেলে চারদিকে তাকাল। সহসা তার মন সন্দেহে দুলে উঠল। আমি কোথায় এসেছি? আমি কি করছি? ওরা কি আমাকে দেখে হাসাহাসি করছে না? ভবিষ্যতে একথা স্মরণ করে আমি কি লজ্জা পাব না? কিন্তু সন্দেহ ক্ষণিকের জন্য। পিয়ের চারদিককার গম্ভীর মুখগুলোর দিকে তাকাল, এতক্ষণ যা কিছু করেছে সব তার মনে পড়ল, বুঝল যে মাঝপথে আর থামা চলে না। এই দোলাচলচিত্ততায় ভীত হয়ে আগেকার ভক্তির ভাবটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় সে মন্দিরদ্বারে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। আর সত্যি সত্যি ভক্তিভাবটা আরো বেশি জোরালো হয়ে তার মনে ফিরে এল। এবার তাকে উঠতে বলা হল, অন্য সকলের মতো একটা শাদা এপ্রন তার গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হল, একটি খনি ও তিনজোড়া দস্তানাও তাকে দেওয়া হল, আর তারপরেই মহাপ্রভু (Grand Master) তাকে উদ্দেশ করে কথা বলল। বলল, সে যেন কখনো এমন কিছু না করে যাতে শক্তি ও পবিত্রতার প্রতীক এই শ্বেত অঙ্গাবরণের গায়ে কলঙ্ক লাগতে পারে, খনিটি সম্পর্কে বলল, স্বীয় অন্তর থেকে সব পাপকে উৎপাটিত করতে এই খনি হাতে তাকে কাজ করতে হবে এবং স্বেচ্ছায় প্রতিবেশীর অন্তরকেও পাপমুক্ত করতে হবে। পুরুষের ব্যবহারের উপযোগী প্রথম দস্তানা জোড়া সম্পর্কে সে বলল, কোনো তাৎপর্য না জেনেই পিয়েরকে সে দস্তানা জোড়া রেখে দিতে হবে। পুরুষের ব্যবহার-উপযোগী দ্বিতীয় দস্তানা জোড়া পিয়েরকে পরতে হবে সভা-সমিতিতে। আর নারীর ব্যবহারের উপযোগী তৃতীয় দস্তানা জোড়া সম্পর্কে সে বলল : প্রিয় ভাই, এই নারীর দস্তানা জোড়াও তোমারই। যে নারীকে তুমি সবচাইতে বেশি সম্মান করবে তাকেই এ দুটি দেবে। ভ্রাতৃসংঘে যে নারীকে তুমি তোমার যোগ্য সহযোগিনী বলে মনে করবে এই দান হবে তার প্রতি তোমার অন্তরের পবিত্রতার প্রতিশ্রুতিস্বরূপ। একটু থেমে সে আবার বলল : কিন্তু খুব সাবধান হে প্রিয় ভাই, এইসব দস্তানা যেন কোনো অপবিত্র হাতে শোভা না পায়। মহাপ্রভুর এই শেষের কথাগুলো শুনে পিয়ের বেশ বিব্রত বোধ করতে লাগল। সে ভাব ক্রমেই বাড়তে লাগল, তার মুখটা ছোট ছেলের মতো রক্তিম হতে হতে একসময় দুই চোখ জলে ভরে উঠল, অস্বস্তির সঙ্গে সে চারদিকে তাকাতে লাগল। কেমন যেন একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল।
