রেটর কিন্তু তার জবাবে সন্তুষ্ট হয়ে তাড়াতাড়ি বলে উটল, ভালো! তুমি কি ধর্মের মধ্যে তোমার অভিষ্ট লাভের পথ কখনো খুঁজেছ?
না, সে পথকে ভুল মনে করেই সে পথে যাইনি, পিয়ের বলল, এত আস্তে সে কথাগুলি বলল যে রেটর শুনতেই পেল না। তার প্রশ্নের উত্তরে পিয়ের বলল, আমি নাস্তিক ছিলাম।
একমুহূর্ত থেমে রেটর বলল, জীবনের সত্যের বিধানকে মেনে চলতে চাও বলেই তুমি সত্যের সন্ধান করছ, আর তাই প্রজ্ঞা ও সগুণের সন্ধান করছ। তাই নয় কি?
হ্যাঁ, হ্যাঁ পিয়ের সম্মতি জানাল।
গলাটা পরিষ্কার করে দস্তানাপরা হাত দুটি বুকের উপর আড়াআড়িভাবে রেখে রেটর কথা বলতে শুরু করল।
আমাদের সংঘের প্রধান আদর্শের কথা এবার তোমাকে বলব, যদি সে আদর্শ তোমার আদর্শের সঙ্গে মেলে তবেই আমাদের ভ্রাতৃসংঘে প্রবেশ করে তুমি লাভবান হবে। আমাদের সংঘের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য-যে ভিত্তির উপর এই সংঘ প্রতিষ্ঠিত এবং কোনো মানুষের শক্তি যাকে কোনোদিন ধ্বংস করতে পারবে না–হল একটি নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ রহস্যকে রক্ষা করা ও অনাগত প্রজন্মের হাতে তাকে তুলে দেওয়া… সে রহস্য আমাদের কাছে এসেছে বহুদূর অতীত যুগ হতে হয় তো গোটা মানবজাতির ভাগ্যই নির্ভর করছে সেই রহস্যের উপর। কিন্তু যেহেতু সেই রহস্যের স্বরূপটিই এমন যে পরিশ্রমসাধ্য দীর্ঘ আত্মশুদ্ধির পথে নিজেকে প্রস্তুত করে তুলতে না পারলে কোনো মানুষের পক্ষেই তাকে জানা বা ব্যবহার করা সম্ভব নয়, তাই সকলেই তাকে দ্রুত আয়ত্তে আনার আশা করতে পারে না। তাই আমাদের গৌণ উদ্দেশ্য হচ্ছে যতদূর সম্ভব আমাদের সদস্যদের অন্তরে সংস্কার করা, তাদের মনকে শুদ্ধ ও আলোকিত করে তোলা এবং তাদের সেই রহস্যকে গ্রহণ করার উপযুক্ত করে গড়ে তোলা।
তৃতীয়ত, আমাদের সদস্যদের পরিশুদ্ধ করে, নবজীবনের দীক্ষা দিয়ে আমরা চেষ্টা তাদের ভিতর দিয়ে ঈশ্বর ভক্তি ও সগুণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সমগ্র মানব জাতিকে উন্নত করতে, যে অশুভ শক্তি আজ পৃথিবীকে শাসন করছে, সর্বশক্তি নিয়োগ করে তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে। এই কথাগুলি ভালো করে ভেবে দেখ, আমি আবার আসব।
যে অশুভ শক্তি আজ পৃথিবীকে শাসন করছে তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে… পিয়ের মনে মনে বলল, আর সঙ্গে সঙ্গে এই পথে তার ভবিষ্যৎ কর্মধারার একটা ছবি তার মনের পটে ভেসে উঠল। রেটর যে তিনটি লক্ষের কথা বলল তার মধ্যে শেষেরটি, মানবজাতির উন্নতি সাধনই তার মনকে বিশেষ করে নাড়া দিল।
আধ ঘণ্টা পরে ফিরে এসে রেটর তাকে সলোমনের মন্দিরের সাতটি সিঁড়ির অনুরূপ সাতটি সৎগুণের কথা শুনিয়ে বলল, ভ্রাতৃসংঘের প্রতিটি মানুষকেই নিজের অন্তরে এই সপ্ত সৎগুণের অনুশীলন করতে হবে। সপ্ত সগুণ হল : ১। বিচক্ষণতা, সংঘের মন্ত্রগুপ্তি। ২। সংঘের ঊর্ধ্বতন সদস্যদের প্রতি আনুগত্য। ৩। নৈতিকতা ৪। মানবপ্রেম। ৫। সাহস। ৬। উদারতা। ৭। মৃত্যুপ্রীতি।
রেটর বলল, সপ্তমত, অবিরাম মৃত্যুচিন্তার দ্বারা মনকে এমনভাবে প্রস্তুত করবে, চেষ্টা করবে যাতে মৃত্যুকে ভয়ংকর শত্রুরূপে না দেখে তাকে এমন বন্ধুরূপে দেখবে যে এই দুঃখময় পৃথিবীতে ধর্মের পথ পর্যটনে ক্লান্ত আত্মাকে মুক্ত করে তাকে উপযুক্ত পুরস্কার ও শান্তির পথে পরিচালিত করবে।
কথা শেষ করে পিয়েরকে নির্জনে আত্মসমীক্ষার সুযোগ দিয়ে রেটর ঘর থেকে চলে গেলে পিয়ের ভাবল, হ্যাঁ, তাই করতে হবে। কিন্তু আমি এখনো এতই দুর্বল যে, যে-জীবনের অর্থ একটু একটু করে আমার সম্মুখে উঘাটিত হচ্ছে তাকেই আমি ভালোবাসি।
তৃতীয়বার রেটর আরো তাড়াতাড়ি ফিরল এবং জানতে চাইল পিয়ের এখনো সংকল্পে স্থির আছে কি না।
পিয়ের বলল, আমি সবকিছুর জন্য প্রস্তুত।
রেটর বলল, তোমাকে আগেই জানিয়ে রাখি, আমাদের সংঘ কেবলমাত্র কথার মাধ্যমে তার বাণীকে প্রচার করে না, এমন আরো অনেক পন্থার আশ্রয় নেয় ধর্মপিপাসুর মনের উপর যার প্রভাব আরো অনেক বেশি হয়। আরো গুহ্য দীক্ষার পরে তুমি নিজেই উজ্জীবনের সে সব পথের সঙ্গে পরিচিত হবে। যে সব প্রাচীন সমিতি মূর্তিলিপির মূর্তিলিপি এমন কিছুর প্রতীক যাকে ইন্দ্রিয় দিয়ে জানা যায় না, অথচ তা মূর্তির অনুরূপ গুণাবলীর অধিকারী।
মূর্তিলিপির অর্থ পিয়ের খুব ভালো করেই জানে, কিন্তু সেকথা বলবার সাহস তার হল না। সে নীরবে রেটরের কথাগুলি শুনল, মনে মনে বুঝল, তার অগ্নিপরীক্ষার লগ্ন সমাগত।
পিয়েরের আরো কাছে এসে রেটর বলল, তুমি যদি কৃতসংকল্প হও তত তোমার দীক্ষার কাজ শুরু করব। উদারতার চিহ্নস্বরূপ তোমাকে বলছি, তোমার যা কিছু মূল্যবান সামগ্রী সব আমাকে দাও।
পিয়ের উত্তর দিল, কিন্তু এখানে তো কিছুই নেই।
যা তোমার সঙ্গে আছে : ঘড়ি, টাকা, আংটি…
সঙ্গে সঙ্গে পিয়ের তার টাকার থলি ও ঘড়ি বের করে দিল, কিন্তু মোটা আঙুল থেকে বিয়ের আংটিটা খুলতে কিছুটা সময় লাগল। সেটা হয়ে গেলে রেটর বলল :
আনুগত্যের চিহ্নস্বরূপ বলছি, পোশাক ছেড়ে ফেল।
রেটনের নির্দেশমতো পিয়ের কোট, ওয়েস্টকোট ও বাঁ পায়ের বুট খুলে ফেলল। গুরুভাইটি তখন পিয়েরের বাদিকের বুকের উপর থেকে শার্টটা সরিয়ে ফেলল এবং উপুড় হয়ে তার বাঁ পায়ের ট্রাউজারটাকে হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে ফেলল। লোকটিকে আর কষ্ট না দিয়ে পিয়ের এবার নিজেই ডান পায়ের বুটটা খুলে ট্রাউজারের ডান পাটাকে গুটিয়ে ফেলতে চাইল, কিন্তু লোকটি জানাল যে তার কোনো প্রয়োজন নেই, বলেই সে বাঁ পায়ের জন্য একপাটি চটি এগিয়ে দিল। বিব্রত ও সন্দিহান শিশুর মতো ঈষৎ হেসে পিয়ের হাত দুটি ঝুলিয়ে পা দুটি ফাঁক করে দাঁড়িয়ে গুরুভাইয়ের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
