একটা বড় বাড়িতে ভ্রাতৃসংঘের কার্যালয়। সে বাড়ির উঠোনে ঢুকে একটা অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উঠে তারা একটা আলোকিত ছোট ঘরে প্রবেশ করে চাকরের সাহায্য ছাড়াই নিজেদের জোব্বাগুলো ছেড়ে ফেলল। সেখান থেকে তারা আর একটা ঘরে গেল। দ্বারপথে দেখা দিল বিচিত্র পোশাকে সজ্জিত একটি লোক। উইলার্স্কি তার দিকে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে ফরাসি ভাষায় কি যেন বলল, তারপর একটা ছোট সাজঘরে গেল, সেখানে পিয়ের এমন সব পোশাক দেখতে পেল যা সে আগে কখনো দেখেনি। কাবার্ড থেকে একটা রুমাল তুলে নিয়ে উইলাকিঁ পিয়েরের চোখ দুটো বেঁধে দিয়ে এমনভাবে কিছু চুলসুদ্ধ তাতে গিট দিল যে পিয়েরের বেশ কষ্ট হল। তারপর তার মুখটাকে টেনে নামিয়ে চুমো খেয়ে তার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে চলল। চুলসুদ্ধ গিট দেয়ায় পিয়েরের বেশ কষ্ট হচ্ছে, তার মুখে ফুটে উঠেছে যন্ত্রণা ও সলাজ হাসির রেখা। অনিশ্চিত ভীরু পদক্ষেপে সে উইলার্স্কির পিছনে এগিয়ে চলল।
প্রায় দশ পা এগিয়ে লোকটি থামল।
বলল, আমাদের সংঘে যোগদান করতে আপনি যদি কৃতসংকল্প হয়ে থাকেন, তাহলে, যা কিছু ঘটুক সাহসের সঙ্গে তাকে সহ্য করবেন। (পিয়ের মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।) দরজায় একটা শব্দ শুনলেই চোখের বাঁধন খুলে ফেলবেন। আপনার সাহস ও সাফল্য কামনা করি পিয়েরের হাতে একটু চাপ দিয়ে লোকটি চলে গেল।
পিয়ের একা একা একইভাবে হাসতে লাগল। দুই একবার কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে চোখের বাঁধন খুলে ফেলার জন্য হাতও তুলল, কিন্তু আবার হাত নামিয়ে নিল। চোখ বাঁধা অবস্থায় পাঁচ মিনিট কাটাতই তার কাছে একঘণ্টা বলে মনে হল। হাত দুটো অসার হয়ে এল, পা দুটো ভেঙে পড়তে চাইছে, মনে হল সে বড়ই ক্লান্ত, অবসন্ন। নানা রকমের জটিল চিন্তা মনের মধ্যে পাক খেতে লাগল। মনে ভয়, না জানি কি হবে, তারও চেয়ে ভয় পাচ্ছে সে-ভয় ধরা পড়ে যায়। দরজায় জোর শব্দ শোনা গেল। চোখের বাঁধন খুলে পিয়ের চারদিক তাকাল। কালো আঁধারে ঘরটা ঢাকা, একটা শাদা কিছুর মধ্যে শুধু একটা ছোট বাতি জ্বলছে। কাছে গিয়ে পিয়ের দেখতে পেল, কালো টেবিলের উপর বাতিটা জ্বলছে, আর তার পাশে রয়েছে একখানা খোলা বই বইটা যিশুর উপদেশাবলি, আর যে শাদা জিনিসটার মধ্যে বাতিটা জ্বলছে সেটা একটা মানব করোটি আদিতে ছিল শব্দ, আর সে শব্দ ছিল ঈশ্বরের উপদেশাবলীর এই প্রথম কথা কটি পড়েই পিয়ের টেবিলের ওপাশে ঘুরে গিয়ে দেখল একটা বড়ো ভোলা বাক্সের মধ্যে কী যেন রয়েছে। সেটা একটা হাড়ভর্তি শবাধার। এসব দেখে সে মোটেই বিস্মিত হল না। পূর্ব জীবন থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটা নতুন জীবনে প্রবেশের প্রত্যাশায় সে ধরেই নিয়েছে যে সবকিছুই অস্বাভাবিক হবে, এমনকি যা-কিছু সে দেখছে তার চাইতেও বেশি অস্বাভাবিক। একটা করোটি, একটা শবাধার, একখানি উপদেশাবলি-তার মনে হল এসব কিছুই, এমনকি এর চাইতে বেশি কিছুই সে আশা করেছিল। মনের আবেগকে প্রখরতর করে তুলতে সে চারদিকে তাকাল। ঈশ্বর, মৃত্যু, প্রেম, মানব-ভ্রাতৃসংঘ-এই কথাগুলিকে অস্পষ্ট অথচ আনন্দময় ধারণার সঙ্গে যুক্ত করে সে মনে মনে সেগুলি আওড়াতে লাগল। দরজা খুলে গেল, কে যেন ঘরে ঢুকল।
ঘরের আবছা আলোয় একটি ছোটখাট লোককে দেখতে পেল। আলো থেকে অন্ধকারে আসার দরুন লোকটি থামল, সতর্ক পদক্ষেপে টেবিলটার কাছে গেল, তারপর চামড়ার দস্তানা পরা হোট হাত দুটি টেবিলের উপর রাখল।
শাদা চামড়ার এনে লোকটির বুক ও পায়ের কিছুটা অংশ ঢাকা পড়েছে, গলায় নেকলেসের মতো একটা জিনিস থেকে শাদা আলো বিচ্ছুরিত হওয়ায় তার লম্বাটে মুখখানা আলোকিত হয়ে উঠেছে।
পিয়েরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নবাগত জিজ্ঞেস করল, কেন এখানে এসেছ? তুমি তো আলোর সত্যে বিশ্বাস কর না, তুমি তো আলো দেখনি, তাহলে এখানে এসেছ কেন? আমাদের কাছে তুমি কী চাও? প্রজ্ঞা, সগুণ, আলো?
যে মুহূর্তে দরজা খুলে অপরিচিত লোকটি ঘরে ঢুকেছে তখন থেকেই তার প্রতি একটা ভয় ও সম্ভ্রম জেগেছে পিয়েরের মনে, তার মনে হয়েছে, সামাজিক দৃষ্টিতে লোকটি তার সম্পূর্ণ অপরিচিত, কিন্তু মানবভ্রাতৃত্ব বোধের দিক থেকে সে তার কাছের মানুষ। রুদ্ধশ্বাসে দুরু দুরু বুকে রেটরের (কোনো নবাগতকে, সংঘে অভিষেককারীকে ওই নামেই ডাকা হয়) দিকে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়েই সে চিনতে পারল রেটর তার পূর্বপরিচিত-নাম স্মোলিয়ানিনভ। এতে সে দুঃখিত হল, কারণ সে তাকে চেয়েছিল শুধুই দাদা ও ধর্মগুরুরূপে, একজন পরিচিত মানুষরূপে নয়। অনেকক্ষণ সে কোনো কথাই বলতে পারল না, ফলে রেটর আবার সেই একই প্রশ্ন করল।
অনেক কষ্টে পিয়ের জবাব দিল, হ্যাঁ…আমি… আমি চাই নবজন্ম।
স্মোলিয়ানিনভ সঙ্গে সঙ্গে বলল, ঠিক আছে। আমাদের পবিত্র সংঘ কীভাবে তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারে সে-বিষয়ে তোমার কোনো ধারণা আছে কি?
পিয়ের কাঁপা গলায় বেশ কষ্ট করে বলল, আমি…চাই… পথের নির্দেশ… সাহায্য… নবজন্ম।
আমাদের ভ্রাতৃসংঘ সম্পর্কে তোমার কী ধারণা?
আমার ধারণা ভ্রাতৃসংঘ ধর্মপথযাত্রী মানুষের ভ্রাতৃত্ব ও সমানাধিকারের সংঘ। পিয়ের জবাব দিল, এই মুহূর্তে তার কতায় যে গাম্ভীর্য থাকা উচিত ছিল তার অভাবের জন্য সে লজ্জা পেল। আমার ধারণা…
