চাকর জবাব দিল, বদলি ঘোড়া এইমাত্র এসে গেছে। আপনি কি এখানে বিশ্রাম করবেন না?
না, ওদের ঘোড়া যুততে বলুন।
আমাকে সব কথা না বলে এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি না দিয়েই কি আমাকে একলা ফেলে উনি সত্যি সত্যি চলে যাবেন? দাঁড়িয়ে মাথাটা নিচু করে পিয়ের ভাবল, মাঝে মাঝে লোকটির দিকে তাকিয়ে সে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। হ্যাঁ, এ-কথা কখনো ভাবিনি, ঘৃণ্য উচ্ছখল জীবনই আমি যাপন করেছি, যদিও সে জীবন আমার পছন্দ ছিল না, সেভাবে জীবন কাটাতে আমি চাইনি। কিন্তু এই মানুষটি সত্যকে জানে আর ইচ্ছা করলে তা আমার কাছে প্রকাশ করতে পারত।
পিয়ের এই কথাটা লোকটিকে বলতে চাইল, কিন্তু সাহসে কুলোল না। অভ্যস্ত হাতে যাত্রীটি তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে কোটের বোতাম আঁটতে লাগল। সে-কাজ শেষ করে বেজুখভের দিকে ফিরে নিস্পৃহ ভদ্রতার সুরে বলল :
আপনি এখন কোথায় চলেছেন স্যার?
শিশুর মতো দ্বিধাগ্রস্ত গলায় পিয়ের জবাব দিল, আমি?…আমি পিটার্সবুর্গ যাচ্ছি। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার সব কথার সঙ্গে আমি একমত। কিন্তু আমাকে অতটা খারাপ ভাববেন না। আপনি আমাকে যা হতে বললেন, মনে-প্রাণে তাই আমি হতে চাই, কিন্তু কখনো কারো কাছ থেকে কোনো সহায়তা আমি পাইনি।…কিন্তু সবকিছুর জন্য আমিই দোষী। আমাকে সাহায্য করুন, শিখিয়ে পড়িয়ে নিন, তাহলে হয় তো আমি…
পিয়ের আর বলতে পারল না। ঢোক গিলে ঘুরে দাঁড়াল।
লোকটি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল, কী যেন ভাবতে লাগল।
তারপর বলল, সাহায্য করতে পারেন একমাত্র ঈশ্বর, তবে আমাদের সংঘ থেকে যতটা সাহায্য করা সম্ভব তা আপনি পাবেন স্যার। আপনি তো পিটার্সবুর্গ যাচ্ছেন। এটা কাউন্ট উইলার্স্কির হাতে দেবেন। (নোটবইটা বের করে চার-ভাঁজ করা একখানা লম্বা কাগজে কয়েকটা কথা সে লিখল।) যদি কিছু মনে না করেন তো একটা পরামর্শ দিই। রাজধানীতে পৌঁছে প্রথমেই নির্জনে আত্মসমীক্ষায় কিছুটা সময় কাটাবেন, আর আগেকার মতো জীবনযাত্রায় ফিরে যাবেন না। আপনার যাত্রা শুভ হোক…সফল হোক।
ঘাঁটিদারের খাতা থেকে পিয়ের জানতে পারল যে এই লোকটি হচ্ছে জোসেফ আলেক্সিভিচ বাজদিভ, ভ্রাতৃসংঘের একজন বিখ্যাত সদস্য ও সুপরিচিত মার্কিনপন্থী। সে চলে যাবার পরে অনেকক্ষণ পর্যন্ত পিয়ের শুতে গেল না বা ঘোড়ার জন্যও তাগাদা দিল না, ঘরময় পায়চারী করতে করতে অতীত জীবনের কথা ভাবতে লাগল, এবং অতি সহজলভ্য একটি আনন্দময় অনিন্দনীয় পুণ্যময় জীবনের পথে নতুন করে পা ফেলার সম্ভাবিত আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠল। তার মনে হল, ধার্মিক হওয়া যে কত ভালো সেটা ভুলে গিয়েছিল বলেই এতদিন সে পাপের পথে ঘুরে মরেছে। আগেকার সন্দেহের তিলমাত্র চিহ্ন আর তার অন্তরে রইল না। তার মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস দেখা দিল যে ধর্মের পথে পরস্পরকে সাহায্য করবার লক্ষ্যে মানব ভ্রাতৃসংঘের প্রতিষ্ঠা খুবই সম্ভব, ভ্রাতৃসংঘের এই ছবিই তার মনে আঁকা পড়েছে।
.
অধ্যায়-৩
পিটার্সবুর্গে পৌঁছে পিয়ের কাউকে তার আসার কথা জানাল না, কোথাও গেল না, কোনো অজ্ঞাত লোক কর্তৃক পাঠানো টমাস ও কেম্পিসের একখানা বই পড়ে দিনগুলো কাটাতে লাগল। বইটা পড়তে পড়তে একটি সত্য সে ক্রমেই বেশি করে উপলব্ধি করতে লাগল : পরিপূর্ণতা অর্জনের সম্ভাবনা এবং মানুষে মানুষে সক্রিয় ভ্রাতৃপ্রেমের সম্ভাবনার যে সত্য জোসেফ আলেক্সিভিচ তার কাছে প্রকাশ করেছিল তাতে বিশ্বাস করার এক অজ্ঞাতপূর্ব আনন্দের উপলব্ধি। আসার একসপ্তাহ পরে একদিন সন্ধ্যায় পিটার্সবুর্গ সমাজে পিয়েরের স্বল্পপরিচিত উইলার্স্কি নামক জনৈক তরুণ পোলিশ কাউন্ট মহাসমারোহ সহকারে তার ঘরে এল এবং দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যখন বুঝল যে ঘরে আর কেউ নেই তখন পিয়েরকে উদ্দেশ করে বলল, আমি আপনার কাছে এসেছি একটি বাণী ও একটি প্রস্তাব নিয়ে। আমাদের ভ্রাতৃসংঘের খুবই উচ্চপদস্থ কোনো লোক আপনার পক্ষ হয়ে একখানি দরখাস্ত করেছেন যাতে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আপনাকে আমাদের সংঘে ভর্তি করে নেয়া হয় এবং আমাকেই আপনার হয়ে উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তাবও করেছেন। সেই লোকটির ইচ্ছা পূরণ করাটাকে আমি আমার পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করি। আপনি কি আমার উদ্যোগে ভ্রাতৃসংঘে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক?
পিয়ের ইতিপূর্বে এই লোকটিকে সব বলনাচের আসরেই দেখেছে সুন্দরী মেয়েদের মহলে হাসিমুখে ঘুরে বেড়াতে, তাই লোকটির নিস্পৃহ গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে সে অবাক হয়ে গেল।
বলল, হ্যাঁ, আমি ইচ্ছুক।
উইলাঙ্কি মাথা নোয়াল।
বলল, আর একটি প্রশ্ন আছে কাউন্ট, আমার মিনতি, সংঘের ভাবী সদস্যরূপে নয়, একজন সৎ মানুষ হিসেবে আন্তরিকভাবেই সে প্রশ্নের জবাব দিন : আপনার আগেকার প্রত্যয়কে কি আপনি পরিত্যাগ করেছেন-আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?
পিয়ের ভাবল।
হ্যাঁ… হ্যাঁ, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, সে বলল।
সেক্ষেত্রে..উইলার্স্কি শুরু করতেই পিয়ের তাকে বাধা দিয়ে পুনরায় বলল, হ্যাঁ, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি।
উইলার্স্কি বলল, সেক্ষেত্রে আমরা যেতে পারি। আমার গাড়িটা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
উইলার্স্কি চুপচাপ গাড়িতে বসে রইল। তাকে কী করতে হবে, কী বলতে হবে–পিয়েরের এই সব প্রশ্নের জবাবে সে শুধু বলল, তার থেকেও যোগ্যতর দাদারা তাকে পরীক্ষা করবে, আর পিয়েরের একমাত্র কাজ হবে সত্য কথা বলা।
