আমার ঈশ্বর। আমার ঈশ্বর! বলতে বলতে এক হাতে পোশাকটা তুলে ধরে স্বামীর কাছে এগিয়ে গিয়ে সে তার কপালে চুমো খেল।
শুভ রাত্রি লিজে, বলে সে এমন ভদ্রভাবে স্ত্রীর হাতে চুমো খেল যেন কোনো অপরিচিতাকে চুমো খাচ্ছে।
*
অধ্যায় ৮
দুই বন্ধু চুপচাপ। কেউ আগে কথা বলতে চাইছে না। পিয়ের বার বার প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকাচ্ছে; প্রিন্স আন্দ্রু ছোট হাতখানি দিয়ে কপাল ঘষছে।
দরজার দিকে যেতে যেতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল, চলো, রাতের খাবারটা খেয়ে নিই।
নতুন করে সাজানো, রুচিসম্মত, বিলাসবহুল খাবার ঘরে তারা ঢুকল। টেবিল ভোয়ালে থেকে শুরু করে রুপোর, চিনেমাটির ও কাঁচের বাসনপত্র পর্যন্ত সবকিছুতেই নববিবাহিত দম্পতির গৃহস্থালির নতুনত্বের ছাপ। খাবার মাঝপথে প্রিন্স আন্দ্রু টেবিলের উপর কনুই রেখে তার উপর ঝুঁকে এমন একটা স্নায়বিক উত্তেজনাভরা দৃষ্টিতে তাকাল, যেটা পিয়ের আগে কখনো দেখেনি; তারপর সে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করল যেন কোনো একটা কথাকে অনেক দিন ধরে মনের মধ্যে পুষে রেখে হঠাৎ বলবে বলে স্থির করে ফেলেছে।
কখনো বিয়ে করো না হে ভাই! এই আমার পরামর্শ : যতদিন পর্যন্ত না নিজেকে বলতে পারবে যে তোমার যা কিছু করবার সাধ্য আছে তা শেষ করেছ, যতদিন পর্যন্ত না তোমার মনের মতো নারীর প্রতি তোমার ভালোবাসার অবসান ঘটেছে এবং তাকে তার স্বরূপে দেখতে পেয়েছ, ততদিন পর্যন্ত কদাপি বিয়ে। করো না; করলে এমন ভুল করবে যা যেমন নির্মম তেমনই অসংশোধনীয়। যখন বুড়ো হবে, অকর্মণ্য হয়ে যাবে, তখন বিয়ে করো–অন্যথায় তোমার মধ্যে যা কিছু ভালো, যা কিছু মহৎ আছে সব নষ্ট হয়ে যাবে। অতি তুচ্ছ জিনিসের জন্য সবকিছু বৃথা হয়ে যাবে। হ্যাঁ, হা, হ্যাঁ। অমন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিও না। নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো প্রত্যাশা নিয়ে যদি বিয়ে কর তাহলে প্রতি পদক্ষেপে বুঝতে পারবে যে তোমার সব শেষ হয়ে গেছে, একমাত্র নির্বোধ চাটুকারপরিবেষ্টিত বসার ঘরে ছাড়া আর সব দরজা তোমার সামনে বন্ধ।…কিন্তু তাতে কী লাভ?… এই বলে সে হাতটা ঘোরাতে লাগল।
পিয়ের চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলল, তাতে তার মুখটা যেন অন্যরকম দেখতে হল, ভালোমানুষি ভাবটা যেন স্পষ্টতর হল। অবাক হয়ে সে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রিন্স আন্দ্রু বলতে লাগল, আমার স্ত্রী চমৎকার মহিলা, যে বিরল মহিলাদের হাতে পুরুষের মর্যাদা নিরাপদ থাকে সে তাদেরই অন্যতমা, কিন্তু তা ঈশ্বর, অবিবাহিত থাকবার জন্য আজ আমি কী না দিতে পারি! তুমিই প্রথম ও একমাত্র লোক যার কাছে এসব কথা বললাম, কারণ তোমাকে আমি পছন্দ করি।
যে বলকনস্কি আন্না পাভলভনার আরাম কেদারায় শুয়ে আধ-বোজা চোখে দাঁতের ফাঁক দিয়ে ফরাসি বকুনি আওড়াচ্ছিল, এই কথাগুলি বলার সময় প্রিন্স আন্দ্রু যেন আর সে লোক নেই। তার মুখের প্রতিটি পেশী এখন স্নায়বিক উত্তেজনায় কাঁপছে; যে চোখ থেকে জীবনের অগ্নিশিখা নিভে গিয়েছিল বলে মনে হয়েছিল, সে চোখ এখন উজ্জ্বল আলোয় ঝলসে উঠেছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সাধারণ অবস্থায় তাকে যত নিষ্প্রাণ মনে হয়, এই এসব অসুস্থ বিরক্তির মুহূর্তে সে তত বেশি আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
সে বলতে লাগল, কেন আমি এ কথা বলছি তা তুমি বুঝতে পারছ না, কিন্তু এটাই জীবনের সমগ্র কাহিনী। তুমি বোনাপার্ত ও তার জীবনের কথা বলেছ (যদিও পিয়ের বোনাপার্তের নাম উল্লেখ করেনি), কিন্তু বোনাপার্ত কার্যক্ষেত্রে ধাপে ধাপে তার লক্ষ্যের পথে অগ্রসর হয়েছে। সে ছিল মুক্ত, স্বীয় লক্ষ্য ছাড়া আর কিছু তার ভাবার ছিল না; তাই সে লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছিল। কিন্তু নিজেকে কোনো নারীর সঙ্গে বেঁধে ফেললেই শৃঙ্খলিত কয়েদির মতো তুমি সব স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলবে! আশা করবার, বল পাবার মতো যা কিছু তোমার আছে সবই তোমাকে টেনে নামাবে, অনুতাপে দগ্ধ করবে। বৈঠকখানা, গল্পগুজব, বলনাচ, অহংকার, তুচ্ছতা-এ সবকিছুর মায়াবী চক্রের হাত থেকে আমার মুক্তি নেই। আমি এখন যুদ্ধে যাচ্ছি, এক বিরাট যুদ্ধ, অথচ আমি কিছুই জানি না, কোনো কিছুরই যোগ্য নই। আমি খুব অমায়িক লোক, আমার বুদ্ধি শানিত, আন্না পাভলভনার বাড়িতে সকলে আমার কথা শোনে। আর সেই সব বোকা মানুষের দল যাদের ছাড়া আমার স্ত্রী বাঁচতে পারে না। আর সেই সব নারী…। ওইসব উঁচু মহলের স্ত্রীলোকরা যে কী, সব নারী সমাজই যে কী তা যদি জানতে। আমার বাবাই ঠিক জানেন। স্বার্থপর, অহংকারী, নির্বোধ, সব বিষয়ে অকিঞ্চিৎকর–সত্যস্বরূপে এই হল স্ত্রীজাতির পরিচয়! সমাজে যখন তাদের দেখ তখন মনে হয় তাদের মধ্যে কিছু পদার্থ আছে, কিন্তু কিছু নেই, কিছু নেই, কিছু নেই! না, প্রিয় বন্ধু, বিয়ে করো না; বিয়ে করো না! প্রিন্স আন্দ্রু কথা শেষ করল।
পিয়ের বলল, তুমি, তুমি নিজেকে অক্ষম ভাববে, তোমার জীবনকে ব্যর্থ মনে করবে-এটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। তোমার সামনে তো সব আছে, সবকিছু। আর তুমি…।
সে কথা শেষ করল না, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শুনেই বোঝা গেল বন্ধুর সম্পর্কে তার ধারণা কত উঁচু, তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কত আশা সে পোষণ করে।
এ রকম কথা সে বলে কেমন করে? পিয়ের ভাবল। বন্ধুকে সে পূর্ণতার প্রতিমূর্তি বলে মনে করে, কারণ যে সব গুণ তার নিজের মধ্যে নেই, প্রিন্স আন্দ্রু পূর্ণমাত্রায় তার অধিকার; এই কথায় সে গুণাবলিকে বলা যায় ইচ্ছার দৃঢ়তা। সবকিছুকে শান্তভাবে বিচার করবার ক্ষমতা, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি; পড়াশুনার ব্যাপকতা (সে পড়েছে সবকিছু জেনেছে সবকিছু, ভেবেছে সবকিছু), আর সর্বোপরি কাজ করবার ও পড়ামুনা করবার ক্ষমতা–প্রিন্স আর এইসব ক্ষমতা দেখে পিয়ের সর্বদাই বিস্মিত হয়েছে। আন্দ্রু যে দার্শনিক তত্ত্বালোচনা ক্ষমতা রাখে না এটা দেখে বেশ অবাক হলেও পিয়ের সেটাকেও আন্দ্রুর ত্রুটি মনে না করে বরং তার ক্ষমতার লক্ষণ বলেই মনে করে।
