লোকটি থামল, অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
পিয়ের সে নীরবতা ভাঙতে পারল না, ভাঙতে চাইল না।
পিয়েরের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে উত্তেজনাবশে কম্পিত হাতে বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে লোকটি আবার বলতে লাগল, তিনি আছেন, কিন্তু তাঁকে জানা বড় শক্ত।…আমি তো তুচ্ছ মানুষ, তাঁর সর্বশক্তিমত্তা, তার অসীমতা, অন্ধজীবের প্রতি তাঁর করুণা–এসব আমি কেমন করে দেখাব? সে আবার থামল। আপনিই বা কে? আপনি স্বপ্ন দেখছেন যে আপনি খুব জ্ঞানী, কারণ ঐ পাপ কথাগুলি আপনি উচ্চারণ করতে পারছেন। কিন্তু যে ছোট ছেলেটি সুকৌশলে তৈরি একটা ঘড়ি নিয়ে খেলা করতে করতে বলতে পারে যে যেহেতু ঘড়িটার ব্যবহার সে জানে না তাই যে ঐ ঘড়িটা তৈরি করেছে তাকে সে বিশ্বাস করে না, আপনিও তারই মতো নির্বোধ ও যুক্তিহীন। তাঁকে জানা বড় শক্ত…আদি পিতা আদম থেকে আজকের দিন পর্যন্ত যুগের পর যুগ আমরা সে জ্ঞানলাভে প্রয়াসী হয়েছি, কিন্তু আজও পড়ে আছি আমাদের লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে।…এই বুঝতে না পারার মধ্যেই তো দেখতে পাচ্ছি আমাদের দুর্বলতা আর তার বিরাটত্ব…
পিয়ের উদ্বেলিত হৃদয়ে সব শুনল, লোকটির কথায় বাধা দিল না, তাকে কোনো প্রশ্ন করল না, সমস্ত অন্তর দিয়ে তার কথাগুলিকে বিশ্বাস করল। তার কথার জ্ঞানগর্ভ যুক্তিকেই মানুষ বিশ্বাস করুক, আর শিশুর মতো বক্তার কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা ও আন্তরিকতাকেই বিশ্বাস করুক-একটা কথা ঠিক যে সমস্ত অন্তর দিয়ে পিয়ের তার কথা বিশ্বাস করতে চাইল, বিশ্বাস করল, এবং সান্ত্বনা, উজ্জীবন ও জীবনে প্রত্যাবর্তনের একটা সানন্দ অনুভূতিতে তার মন ভরে উঠল।
লোকটি আবার বলল, তাকে বুদ্ধি দিয়ে জানা যায় না, জানতে হয় জীবন দিয়ে।
মনের মধ্যে নতুন করে সন্দেহ দেখা দেওয়ায় বিষণ্ণ গলায় পিয়ের বলল, আমি বুঝতে পারছি না, যে জ্ঞানের কথা আপনি বলছেন, মানুষের মন কেন তাকে লাভ করতে পারবে না?
পিতৃসুলভ মৃদু সস্নেহ হাসি ফুটল লোকটির মুখে।
বলল, পরমপ্রজ্ঞা ও সত্য হল বিশুদ্ধ তরল পদার্থের মতো। একটা অবিশুদ্ধ পাত্রে বিশুদ্ধ তরল ঢেলে কি তার বিশুদ্ধতা বিচার করা যায়? একমাত্র নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে পারলে তবেই আমার মধ্যে সেই তরলের বিশুদ্ধতাকে অন্তত কিছুটা রক্ষা করতে পারব।
পিয়ের সানন্দে বলে উঠল, হা, হ্যাঁ, ঠিক তাই।
পরমপ্রজ্ঞা কেবলমাত্র বুদ্ধির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, পদার্থবিদ্যা, ইতিহাস, রসায়ন প্রভৃতি সব জাগতিক বিজ্ঞানের উপরেও প্রতিষ্ঠিত নয়। পরমপ্রজ্ঞা এক। তার একটিমাত্র বিজ্ঞান-ভূমার বিজ্ঞানযে বিজ্ঞান গোটা সৃষ্টি ও সেখানে মানুষের স্থান নির্ণয় করে। সে বিজ্ঞানকে জানতে হলে আগে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে, তার উজ্জীবন ঘটাতে হবে, সে জ্ঞান অর্জন করতে হলে প্রয়োজন বিশ্বাস ও আত্মশুদ্ধি। আর সে লক্ষ্যে পোঁছতে হলে প্রয়োজন সেই আলোকশিখার যাকে বিবেক বলে, যাকে ঈশ্বর আমাদের অন্তরে বপন করেছেন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, পিয়ের স্বীকার করল।
তাহলে মনের চোখ দিয়ে নিজের অন্তরাত্মাকে দেখুন, নিজেকেই প্রশ্ন করুন, আপনি নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট কি না। কেবলমাত্র বুদ্ধির উপর ভরসা করে কি পেয়েছেন? আপনি কি? আপনি যুবক, আপনি ধনী, আপনি কুশলী, আপনি সুশিক্ষিত। এইসব সগুণ নিয়ে আপনি কি করেছেন? নিজেকে নিয়ে, নিজের জীবনকে নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট?
মুখ বেঁকিয়ে পিয়ের তো-তো করে বলল, না, জীবনকে আমি ঘৃণা করি।
আপনি জীবনকে ঘৃণা করেন। তাহলে এ জীবনকে বদলে দিন, নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তুলুন, আর পরিশুদ্ধ হলেই প্রজ্ঞা লাভ করতে পারবেন। নিজের জীবনের দিকে তাকান স্যার। কীভাবে জীবন কাটিয়েছেন? উচ্ছখল মদ্যপানে ও ব্যভিচারে, সমাজের কাছ থেকে নিয়েছেন সবকিছু, কিন্তু তাকে ফিরিয়ে দেননি কিছুই। সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তাকে কীভাবে ব্যবহার করেছেন? আপনার প্রতিবেশীর জন্য কি করেছেন? আপনার হাজার হাজার ক্রীতদাসের কথা কখনো ভেবেছেন? শারীরিক কি নৈতিক কোনোদিক থেকে তাদের সাহায্য করেছেন? না! তাদের পরিশ্রমের ফসলকে ভোগ করে যাপন করেছেন উচ্ছল জীবন। তাই তো করেছেন। এমন কোনো কাজে কি কখনো আত্মনিয়োগ করেছেন যেখান থেকে আপনার প্রতিবেশীর উপকার করতে পারেন? না! জীবন অতিবাহিত করেছেন চরম আলস্যে। তারপর আপনি বিয়ে করেছেন স্যার-একটি তরুণীকে চালিয়ে নেবার দায়িত্ব নিয়েছেন, কিন্তু কি করেছেন? সত্যের পথ খুঁজে নিতে তাকে সাহায্য করেননি, ঠেলে দিয়েছেন প্রতারণা ও দুঃখের অতলস্পর্শ গহ্বরে। কোনো লোক আপনাকে আঘাত করলেই আপনি তাকে গুলি করেছেন, আর এখন বলছেন আপনি ঈশ্বরকে জানেন না, নিজের জীবনকে ঘৃণা করেন। এর মধ্যে তো অবাক হবার কিছু নেই স্যার!
দীর্ঘ বাক্যালাপে ক্লান্ত হয়ে লোকটি পুনরায় সোফার পিছনে মাথা রেখে চোখ বুজল। পিয়ের সেই প্রবীণ, কঠোর, নিশ্চল, মৃতবৎ মুখখানির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট দুটি নাড়ল, কিন্তু কোনো শব্দ উচ্চারিত হল না। সে বলতে চেয়েছিল, হ্যাঁ, একটি নিচ, আলস্যপরায়ণ পাপের জীবন! কিন্তু সে নীরবতা ভাঙবার সাহস তার হল না।
বুড়োদের মতো গলা খাকারি দিয়ে লোকটি চাকরকে ডাকল।
পিয়েরের দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল, ঘোড়ার কি হল?
