চাকরটি তার গ্লাসটা উপুড় করে একটুকরো চিনি সহ সেটা ফিরিয়ে দিয়ে (রুশ ভূমিদাস ও চাষীদের মধ্যে এটাই প্রচলিত প্রথা) জানতে চাইল, আর কিছু চাই কি না।
আগন্তুক বলল, না। বইটা দাও।
চাকর একটা বই এগিয়ে দিল। যাত্রীটিও তার মধ্যে ডুবে গেল। পিয়েরের মনে হল বইখানা ভক্তিমূলক। সে লোকটির দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে আগন্তুক একটা পৃষ্ঠা-নির্দেশিকা রেখে বইটা বন্ধ করল, এবং সোফার উপর দুই হাত রেখে তার উপর মাথাটা হেলিয়ে আগের মতোই চোখ বন্ধ করে বসে রইল। পিয়ের তার দিকেই তাকিয়ে রইল। বুড়ো লোকটি চোখ মেলল, স্থির, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পিয়েরের মুখের দিকে তাকাল।
পিয়ের বিচলিত বোধ করল, সে-দৃষ্টিতে এড়িয়ে যেতে চাইল, কিন্তু সে দুটি উজ্জ্বল প্রবীণ চোখের দৃষ্টির আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য।
.
অধ্যায়-২
আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তো আমি নিশ্চয় কাউন্ট বেজুখভের সঙ্গেই কথা বলছি, আগন্তুক ইচ্ছা করেই উঁচু গলায় বলল।
পিয়ের নিঃশব্দে চশমার উপর দিয়ে তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
আগন্তুক আবার বলল, আপনার কথা, আপনার দুর্ভাগ্যের কথা আমি শুনেছি স্যার। লোকটি শেষের কথাটার উপরেই জোর দিল।
পিয়েরের মুখ লাল হয়ে উঠল, তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে পা নামিয়ে জোর করে ঈষৎ হেসে বুড়োটির দিকে ঝুঁকে বসল।
নেহাৎ কৌতূহলবশেই আমি এ-কথা বলছি না স্যার, বলার গুরুতর কারণ আছে।
লোকটি থামল, তার দৃষ্টি তখনো পিয়েরের উপর নিবদ্ধ, যেন তাকে নিজের পাশে বসবার ইঙ্গিত দিতেই লোকটি সোফার এক পাশে সরে বসল। বুড়ো মানুষটির সঙ্গে আলাপ জমাবার ইচ্ছা পিয়েরের ছিল না, তবু অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার ইচ্ছামতোই উঠে গিয়ে তার পাশে বসল।
আগন্তুক বলতে লাগল, আপনি বড়ই দুঃখী স্যার। আপনি যুবক আর আমি বৃদ্ধ। সাধ্যমতো আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই।
জোর করে হেসে পিয়ের বলল, তা বেশ তো! আপনার কাছে আমি খুবই কৃতজ্ঞ। কোথা থেকে আসছেন?
আগন্তুকের মুখটা সদয় নয়, বরং নিস্পৃহ ও কঠোর, কিন্তু তা সত্ত্বেও নবপরিচিত লোকটির মুখ ও কথা পিয়েরকে দুর্বার শক্তিতে আকর্ষণ করল।
বুড়ো বলল, কিন্তু যে কোন কারণেই হোক আমার সঙ্গে আলাপ করতে যদি আপনার আপত্তি থাকে তো বলুন। সহসা তার মুখে একটা অপ্রত্যাশিত পিতৃসুলভ হাসি ফুটে উঠল।
না, না, মোটেই তা নয়! বরং আপনার সঙ্গে পরিচয় ঘটায় আমি খুব খুশি হয়েছি। পিয়ের আর একবার লোকটির আঙুলের মাথার খুলি খোদাই করা আংটিটার দিকে তাকাল-খোদাইটা ভ্রাতৃসংঘের প্রতীক।
সে বলল, মাফ করবেন, আপনি কি একজন সংঘ-সদস্য?
হ্যাঁ, স্বাধীন ভ্রাতৃসংঘের আমি একজন, পিয়েরের চোখের আরো গভীরে দৃষ্টিপাত করে আগন্তুক বলল। আর তাদের হয়ে, আমার নিজের হয়ে এই ভ্রাতৃত্বের হাত আপনার দিকে বাড়িয়ে ধরলাম।
এই লোকটির ব্যক্তিত্ব তাকে অনুপ্রাণিত করেছে, আবার ভ্রাতৃসংঘের ধ্যান-ধারণাগুলিকে উপহাস করতেই সে অভ্যস্ত, এই দুই মনোভাবের মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থায় পিয়ের হেসে বলল, আমার ভয় হচ্ছে আপনাদের আমি ঠিক বুঝতে-কীভাবে যে কথাটা বলব–আমার ভয় হচ্ছে, জগতের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গির এতই বিপরীত যে আমরা পরস্পরকে বুঝতেই পারব না।
লোকটি বলল, আপনার দৃষ্টিভঙ্গির কথা আমি জানি, আর যে জীবনযাত্রার কথা আপনি বলছেন, যাকে আপনার মানসিক প্রচেষ্টার ফল বলে আপনি মনে করেন, অধিকাংশ মানুষ সেই জীবন-পথেরই পথিক, আর সেটা অহংকার, আলস্য ও অজ্ঞতারই অনিবার্য ফল। আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার, তবে এ-কথা নিজে না জানলে কখনো আপনাকে বলতাম না। জীবন সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিকোণ একটি শোচনীয় ভ্রান্তি মাত্র।
মৃদু হেসে পিয়ের বলল, ঠিক যেরকম আমি মনে করি যে আপনি ভ্রান্ত।
আমি সত্যকে জেনেছি এ-কথা বলার স্পর্ধা আমার নেই, লোকটি বলল, তার কথার দৃঢ়তা ক্রমেই পিয়েরের মনের উপর বেশি করে দাগ কাটতে শুরু করেছে। নিজের চেষ্টায় কেউই সত্যে পৌঁছতে পারে না। আদি পুরুষ আদমের কাল থেকে শুরু করে আমাদের এই কাল পর্যন্ত যুগ যুগ ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমবেত প্রচেষ্টায় একটার পর একটা পাথর বসিয়ে তবে তৈরি হয় সেই মন্দির যেখানে পাতা হবে মহান ঈশ্বরের যোগ্য পাদপীঠ, দুই চোখ বুজে লোকটি বলল।
সত্য কথাটা বলা উচিত মনে করেই যেন দুঃখের সঙ্গে পিয়ের বলল, আমি বলতে চাই যে ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস নেই…আমি…।
লোকটি পিয়েরের দিকে তাকিয়ে করুণার হাসি হাসল, বলল, ঠিক কথা, আপনি তাকে জানেন না স্যার। তাঁকে জানতে আপনি পারেন না। আর তাঁকে জানেন না বলেই আপনি দুঃখী।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি দুঃখী, পিয়ের কথাটা মেনে নিল। কিন্তু আমি কি করব?
আপনি তাকে জানেন না স্যার, আর তাই আপনি এত দুঃখী। আপনি তাকে চেনেন না, কিন্তু তিনি এখানেই আছেন, আছেন আমার মধ্যে, আছেন আমার কথায়, আছেন আপনার মধ্যে, এমন কি এইমাত্র যে পাপ কথাগুলি আপনি উচ্চারণ করলেন তার মধ্যেও তিনি আছেন! কঠিন কম্পিত কণ্ঠে লোকটি ঘোষণা করল।
লোকটি থামল, নিজেকে শান্ত করবার জন্যই একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর শান্তভাবে বলতে লাগল, দেখুন স্যার, তিনি যদি না থাকতেন তাহলে তো আপনি-আমি তার কথা বলতাম না। কি কথা, কার কথা আমরা বলছি? কাকে আপনি অস্বীকার করছেন। তিনি যদি নাই থাকবেন, তো কে তাকে আবিষ্কার করল? বুদ্ধির অতীত এরকম একটি সত্তার অস্তিত্বের কল্পনা এল কোথা থেকে? এরকম একটি বুদ্ধির অগোচর সত্তা, যিনি সর্বশক্তিমান, শাশ্বত, অসীম গুণের অধিকারী, তার অস্তিত্বের কল্পনা আপনি কেন করেছেন–কেন করেছে সারা জগৎ…
