ঘাঁটিদার, তার স্ত্রী, খানসামা ও তঝকের সুচের কাজ-করা পোশাক বিক্রেতা একটি চাষী স্ত্রীলোকসকলেই ঘরে ঢুকে তার কিছু কাজ করে দিতে চাইল। নিজের নিস্পৃহ মনোভাবের কোনোরকম পরিবর্তন না করে পিয়ের চশমার ভিতর দিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল, সে যেন বুঝতেই পারছে না তার নিজের এতবড় একটা সমস্যার মীমাংসা না হওয়া সত্ত্বেও তারা বেঁচে আছে কেমন করে। দ্বৈত যুদ্ধের পর সকোলনিকি থেকে ফিরে এসে প্রথম যন্ত্রণাদগ্ধ বিনিদ্র রাত কাটাবার পর থেকে এই একই চিন্তার মধ্যে সে ডুবে আছে। কিন্তু এখন যাত্রাপথের নির্জনতার সুযোগে সেই চিন্তা যেন আরো জোরে তাকে চেপে ধরেছে। যাই ভাবুক না কেন, বারে বারে সেই একই সমস্যায় সে ফিরে আসছে যার কোনো মীমাংসা করতে পারছে না, অথচ তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তাও ছাড়তে পারছে না। যেন যে মূল স্কুটা তার জীবনকে একত্রে ধরে রেখেছে তার খাজটা কেটে গেছে, আর তার ফলে স্কুটা না ভিতরে ঢুকছে, না বেরিয়ে আসছে, একই জায়গায় বৃথাই ঘুরে মরছে।
ঘাঁটিদার এসে সবিনয়ে জানাল, হিজ এক্সেলেন্সি আর মাত্র দুটি ঘণ্টা অপেক্ষা করুন, তাহলেই যেমন করে হোক সে তাকে দুটো ডাক-ঘোড়া জুটিয়ে দেবে। পরিষ্কার বোঝা গেল, লোকটা মিথ্যে কথা বলছে, সে শুধু চাইছে যাত্রীর কাছ থেকে আরো কিছু টাকা বাগাতে।
পিয়ের নিজেকেই প্রশ্ন করল, এটা কি ভালো, না মন্দ? আমার পক্ষে ভালো, আর অপর একটি যাত্রীর পক্ষে মন্দ, আর তার নিজের পক্ষে এটা অনিবার্য, কারণ খাদ্য-সংগ্রহের জন্য তার টাকার দরকার, লোকটি বলেছে, একবার কোনো যাত্রীকে খাদ্য-সংগ্রহের জন্য তার টাকার দরকার, লোকটি বলেছে, একবার কোনো যাত্রীকে ডাক-ঘোড়া দেওয়ার জন্য একজন অফিসার তাকে পিটুনি দিয়েছিল। অফিসার পিটুনি দিয়েছিল কারণ গন্তব্যস্থানে যাবার তার তাড়া ছিল। আবার আমি দলখভকে গুলি করেছিলাম কারণ আমার মনে আঘাত লেগেছিল, আর যোড়শো লুইকে মেরে ফেলা হয়েছিল কারণ সকলে তাকে অপরাধী মনে করেছিল, আবার এক বছর পরে যারা তাকে মেরেছিল তাদেরই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল–অথচ কারণটা একই। কি মন্দ? কি ভালো? কাকে ভালোবাসব, আর কাকে ঘৃণা করব? কিসের জন্য বেঁচে থাকা? আর আমিই বা কি? জীবন কি, আর মৃত্যু কি? কোন সে মহাশক্তি যা সকলকে শাসন করে?
একটি ভিন্ন এসব প্রশ্নের আর কোনো জবাব নেই, আর সেটাও কোনো যুক্তিসঙ্গত জবাব নয়, অথবা এসব প্রশ্নের কোনো জবাবই নয়। জবাবটা হল : তোমার মৃত্যু হবে, আর সেখানেই সব শেষ হয়ে যাবে। তুমি মরবে, আর সবকিছু জানবে অথবা সব প্রশ্ন থেমে যাবে। কিন্তু মৃত্যুও তো ভয়ংকর।
ফেরিওয়ালি কর্কশ গলায় তার মালপত্র বিশেষ করে ছাগলের চামড়ার একজোড়া চটি তাকে দেখাল। পিযেরের মন বলল : আমার একশো রুবল, আর তা দিয়ে কি করব তা আমি জানি না, আর এই মেয়েটি ছেঁড়া পোশাক পরে সভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর কেন সে টাকা চাইছে? একচুল সুখ বা মনের শান্তিও তো এ টাকায় সে পাবে না। জগতের কোনো কিছুই কি ওকে আমাকে পাপ ও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারে?–যে মৃত্যুতে সবকিছু শেষ হয়ে যায় এবং আজ হোক কাল হোক যে মৃত্যু আসবেই-আর যাই হোক, অনন্তকালের তুলনায় মুহূর্তের মধ্যেই আসবে। বার বার সে খাজ কেটে-যাওয়া স্কুটাকে ঘোরাতে লাগল, আর বার বার সেটা একই জায়গায় বৃথাই ঘুরতে লাগল।
মাদাম দ্য সুজার লেখা একটা উপন্যাস চাকর তাকে দিয়ে গেল। আর সেও জনৈকা এমিলি দ্য মাসফেলদের যন্ত্রণা ও সগ্রামের কাহিনীটা পড়তে শুরু করল। ভাবতে লাগল : যে প্রেমিক তাকে ভুলিয়ে এনেছিল তাকে যখন সে ভালোই বাসত তাহলে তাকে বাধা দিল কেন? ঈশ্বর নিশ্চয়ই তার অন্তরে তার ইচ্ছারবিরুদ্ধে কোনো আবেগকে ঢুকিয়ে দেননি। আমার স্ত্রী-একদিন তাই সে ছিল–কিন্তু বাধা দেয়নি, আর হয় তো সেই ঠিক কাজ করেছে।…কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি, কিছু আবিষ্কার করা যায়নি। আমরা শুধু এইটুকুই জানতে পারি যে আমরা কিছুই জানি না। মানুষের জ্ঞানের সেটাই উচ্চতম সীমা।
তার ভিতরে-বাইরে যা কিছু সবই মনে হচ্ছে গোলমেলে, অর্থহীন, পাল্টা আঘাতকারী। তবু সবকিছুর প্রতি এই ঘৃণার মধ্যেই যেন পিয়ের একধরনের আশা-নিরাশাভরা সন্তুটি খুঁজে পেল।
ঘাঁটিদার ঘরে ঢুকল, তার সঙ্গে অপর একজন যাত্রী, ঘোড়র অভাবে সেও আটকা পড়েছে। সে বলল, ইয়োর এক্সেলেন্সিকে অনুরোধ করছি, এই ভদ্রলোকের দিকে একটু মুখ তুলে তাকান।
নবাগত লোকটি ছোটখাট দেখতে, হাড়গুলো মোটা, মুখটা হলদে, বলীরেখায় ভর্তি, ঘন শাদা ভুরু উজ্জ্বল ধূসর চোখ দুটির উপর ঝুলে পড়েছে।
পিয়ের টেবিলের উপর থেকে পা নামিয়ে উঠে দাঁড়াল, তারপর বিছানায় শুয়ে নবাগত লোকটির দিকে মাঝে মাঝে তাকাতে লাগল। নবাগত যাত্রীটির হাড়-বেরকরা সরু পায়ে বুট পরা, গায়ে কাপড়ে ঢাকা ছাগলের চামড়ার জীর্ণ কোট, সোফার উপর বসে মস্তবড় মাথাটাকে পিছনে হেলান দিয়ে সে বেজুখভের দিকে তাকাল। তার কঠোর, তীক্ষ্ণ, অন্তর্ভেদী দৃষ্টি পিয়েরকে বিচলিত করে তুলল। নবাগত লোকটির সঙ্গে তার কথা বলার ইচ্ছা হল, কিন্তু রাস্তা সম্পর্কে কিছু জানতে মুখ খুলবার আগেই সে তার চোখ দুটি বুজে ফেলল। তার পাকানো হাত দুটো ভাজ করা, এক হাতের আঙুলে যমের মুণ্ডু খোদাই করা একটা ঢালাই লোহার বড় আংটি পিয়েরের নজরে পড়ল। লোকটি চুপচাপ বসে রইল, হয় বিশ্রাম নিচ্ছে, আর না হয় তো কোনো গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। তার চাকরটিও হলদে চেহারা, বলীরেখাংকিত মুখ, দাড়ি বা গোঁফ কোনোটাই নেই, মুখটা যে কামানো তা নয়, আসলে দাড়ি-গোঁফই গজায়নি। বুড়ো চাকরটি রান্না সরঞ্জাম বের করে চা তৈরি করতে ব্যস্ত। নিয়ে এল একটা ফুটন্ত সামোভার। সব তৈরি। আগন্তুক চোখ মেলে টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল, একটা গ্লাসে নিজের জন্য চা ঢালল, আর দাড়িগোঁফবিহীন বুড়ো মানুষটির দিকে এগিয়ে দিল আর একটা চা ভর্তি গ্লাস। পিয়ের কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ করতে লাগল, মনে হল এই অপরিচিত লোকটির সঙ্গে কথাবার্তা বলা শুধু দরকারিই নয়, একেবারে অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
