না, সে মূর্খ নয়! নাতাশা ক্ষোভের সঙ্গে জবাব দিল।
বেশ তো, তুমি কী চাও? আজকাল দেখছি তোমরা সকলেই প্রেম করছ। বেশ তো, তুমি যদি তাকে ভালোবেসে থাক তো বিয়ে করে ফেল! বিরক্তিকর হাসি হেসে কাউন্টেস বলল। তোমার ভাগ্য প্রসন্ন হোক!
না মামণি, আমি তার প্রেমে পড়িনি, আমার মনে হয় আমি তার প্রেমে পড়িনি।
বেশ তো, সেই কথা তাকে বলে দাও।
মামণি, তুমি রাগ করেছ? রাগ করো না! এটা কি আমার দোষ?
না, কিন্তু ব্যাপারটা কি সোনা? তুমি কি চাও যে আমি গিয়ে তাকে বলি? কাউন্টেস হেসে বলল।
না, যা করার আমিই করব, তুমি শুধু বলে দাও কি বলব। নাতাশাও হেসে বলল, তুমি কত ভালো মামণি। সে যে কীভাবে কথাটা বলেছে সেটা তুমি দেখলে ভালো হত। আমি জানি এ-কথা সে বলতে চায়নি, হঠাৎই তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে।
সে যাই হোক, তুমি তাকে ফিরিয়ে দাও।
না, তা পারব না। তার জন্য আমার দুঃখ হয়। সে কত ভালো! বেশ তো, তার প্রস্তাব গ্রহণ কর। তোমার তো বিয়ের বয়সই হয়েছে, কঠিন ড্রিপের সুরে কাউন্টেস বলল।
মামণি, তার জন্য আমি দুঃখিত। কি করে তাকে কথাটা বলব আমি জানি না।
তোমার বলার কিছু নেই। আমি নিজেই তাকে বলব। ছোট্ট নাতাশার সঙ্গে ওরা প্রাপ্তবয়স্কার মতো ব্যবহার করেছে দেখে কাউন্টেস ক্ষুব্ধ হয়েছে।
না। কোনো মতেই না! আমি নিজেই তাকে বলব, আর তুমি দরজা থেকে শুনবে।
নাতাশা একদৌড়ে বসবার ঘর পেরিয়ে নাচ-ঘরে ঢুকল। দেনিসভ তখনো দুই হাতের উপর মাথা রেখে ক্লাভিকর্ডের পাশে চেয়ারে বসে আছে।
হাল্কা পায়ের শব্দ শুনে সে লাফিয়ে উঠল।
দ্রুত পায়ে নাতাশার দিকে এগিয়ে বলল, নাতালী, আমার ভাগ্য স্থির কর। সবই তোমার হাতে।
ভাসিলি দিমিত্রিচ। তোমার জন্য আমি দুঃখিত!…না, তুমি এত ভালো…কিন্তু এ হয় না…না…কিন্তু বন্ধু হিসেবে আমি চিরদিন তোমাকে ভালোবাসব।
দেনিসভ তার হাতের উপর ঝুঁকে দাঁড়াল, নাতাশার কানে এমন সব বিচিত্র শব্দ এল যায় অর্থ সে বুঝল । দেনিসভের কোঁকড়া কালো চুলে ভর্তি মাথায় সে চুমো খেল। সেই মুহূর্তে তারা কাউন্টেসের পোশাকের খসখস শব্দ শুনতে পেল। কাউন্টেস দুজনের দিকে এগিয়ে গেল।
ভাসিলি দিমিত্রিচ, এই সম্মান দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাই, বিব্রত গলায় কাউন্টেস বলল, যদিও দেনিসভের কানে তা কঠোর শোনাল, কিন্তু আমার মেয়ের বয়স এত অল্প, আর আমি মনে করি আমার ছেলের বন্ধু হিসেবে প্রস্তাবটা আগে আমার কাছে পেশ করাই তোমার উচিত ছিল। তাহলে আর তোমাকে এভাবে প্রত্যাখ্যান জানাবার সুযোগ আমাকে দিতে হত না।
অপরাধীর মতো মুখ করে চোখ নামিয়ে দেনিসভ বলল, কাউন্টেস…। সে আরো কিছু বলতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।
তার এই অবস্থা দেখে নাতাশা শান্ত থাকতে পারল না, ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
অস্থির গলায় দেনিসভ বলতে লাগল, কাউন্টেস, আমি অন্যায় করেছি, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনার মেয়েকে ও আপনাদের পরিবারের সকলকে আমি শ্রদ্ধা করি যে দরকার হলে দুবার জীবন দিতেও… সে কাউন্টেসের দিকে তাকাল, কিন্তু তার কঠোর মুখ দেখে বলল, আচ্ছা, তাহলে বিদায় কাউন্টেস, কাউন্টেসের হাতে চুমো খেয়ে দেনিসভ স্থির দ্রুত পদক্ষেপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, নাতাশার দিকে ফিরেও তাকাল না।
পরদিন রস্তভ দেনিসভকে বিদায় দিল। আর একটা দিনও দেনিসভ মস্কোতে থাকতে চাইল না। তার সব মস্কোর বন্ধুরা তাকে একটা বিদায় সম্বর্ধনা জানাল জিপসিদের আস্তানায়, আর তার ফলে কীভাবে তাকে স্লেজে তুলে দেওয়া হল অথবা যাত্রাপথের প্রথম তিনটে ঘাঁটি কীভাবে পার হল-সে সবকিছুই সে পরবর্তীকালে মনে করতে পারত না।
দেনিসভ চলে যাবার পরে রস্তভ আরো এক পক্ষকাল মস্কোতে কাটাল, কখনো বাড়ি থেকে বের হল না, বাবা টাকাটা সঙ্গে সঙ্গে যোগাড় করতে না পারায় টাকাটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল, এবং বেশির ভাগ সময় কাটাতে লাগল মেয়েদের ঘরে।
তার প্রতি সোনিয়ার আদর ও অনুরাগ আগের চাইতেও বেড়েছে। সে যেন রস্তভকে বোঝাতে চার তার অনেক ক্ষতি হয়েছে বলেই সোনিয়া তাকে আরো বেশি ভালোবাসছে, কিন্তু নিকলাস ভাবছে এখন সে সোনিয়ার সম্পূর্ণ অযোগ্য।
কবিতায় ও গানে সে মেয়েদের অ্যালবামগুলি ভরে দিল, এবং শেষপর্যন্ত পুরো তেতাল্লিশ হাজার রুবল দলখভকে পাঠিয়ে দিয়ে একটা রসিদ নিয়ে নভেম্বর মাসের শেষের দিকে পরিচিত কারো কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে সে তার রেজিমেন্টটাকে ধরার জন্য যাত্রা করল। রেজিমেন্ট ইতিমধ্যেই পোল্যান্ডে পৌঁছে গেছে।
০৫.১ স্ত্রীর সঙ্গে দেখা
পঞ্চম পর্ব – অধ্যায়-১
স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পরেই পিয়ের পিটার্সবুর্গ যাত্রা করল। তর্ঝক ডাক-ঘাঁটিতে হয় ঘোড়া ছিল না, আর হয় তো ঘাঁটিদার তাকে ঘোড়া দিতে রাজি হল না। বাধ্য হয়ে পিয়েরকে অপেক্ষা করতে হল। পোশাক ছেড়েই সে গোল টেবিলটার সামনে একটা চামড়ার সোফায় শুয়ে পড়ল : ওভার-বুট পরা পা দুটো টেবিলের উপর তুলে দিয়ে ভাবতে লাগল।
খানসামা এসে বলল, আপনার পোর্টম্যান্টোটা ভিতরে এনে দেব কি? আর বিছানাটা ঠিক করে চা এনে দেব কি?
পিয়ের জবাব দিল না, কারো কোনো কথাই তার কানে ঢোকেনি, বা কিছুই সে চোখেও দেখেনি। শেষ ঘাঁটি থেকেই সে ভাবতে শুরু করেছে এবং সেই একই কথা এখনো ভাবছে–কথাটা এতই গুরুতর যে চারদিকের কোনো কিছুই তার খেয়াল নেই। পিটার্সবুর্গে পৌঁছতে দেরি হবে কি না, এ-ঘাঁটিতে থাকার ব্যবস্থা জুটবে কি না, সে ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ উদাসীন তো বটেই, এমন কি তার মনের মধ্যে এখন যেসব চিন্তা চলেছে তার তুলনায় তাকে এখানে আরো কয়েক ঘন্টাই থাকতে হোক আর বাকি জীবনটাই কাটাতে হোক তাতে তার সামান্যই যায়-আসে।
