বিষণ্ণ চোখে দেনিসভ ও মেয়েদের দিকে তাকিয়ে সে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল।
সোনিয়ার চোখ তার উপর নিবদ্ধ, সে যেন জানতে চাইছে : নিকোলেংকা, ব্যাপার কি? আর সঙ্গে সঙ্গে সোনিয়া বুঝতে পারল তার একটা কিছু ঘটেছে।
নিকলাস তার কাছ থেকে সরে গেল। নাতাশাও নিজের থেকেই বুঝতে পারল তার দাদার অবস্থা। কিন্তু ব্যাপারটা খেয়াল করলেও তার নিজের মন-মেজাজ তখন খুশির এতই উচ্চগ্রামে বাধা যে অন্যের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় তার নেই। সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেকে বোঝাল : না, আমারই ভুল, সেও নিশ্চয় আমার মতোই খুশি।
নাতাশা গাইতে শুরু করল, তার গলাটা ফুলে উঠল, বুক দুলে উঠল, চোখের দৃষ্টিতে গাম্ভীর্য দেখা দিল। সেই শীতকালেই নাতাশা প্রথম আন্তরিকতার সঙ্গে গাইতে শুরু করল, কারণ তার গান দেনিসভের বড় ভালো লাগে। এখন আর সে শিশুর মতো গায় না, তার গানে আগেকার মতো ছেলেমানুষী হাস্যকর প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় না, কিন্তু তাই বলে সে যে এখন ভালো গায় তাও নয়, সঙ্গীতজ্ঞ যে মানুষই তার গান শোনে সেই বলে : গলায় কাজ নেই কিন্তু স্বরটা বড় ভালো, তালিম নেওয়া দরকার।
চোখ মেলে তার গান শুনতে শুনতে নিকলাস ভাবল, এটা কি ব্যাপার? ওর হয়েছে কি? আজ কী সুন্দর গাইছে! আর সহসা সারা জগৎ যেন তার সঙ্গে এক হয়ে পরবর্তী সুরলহরীর জন্য প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে উঠল, সারা জগৎ যেন তিনটে তালে ভাগ হয়ে গেল : এক, দুই, তিন…এক, দুই, তিন! নিকলাসের মনে হল, আঃ, আমাদের জীবন কত অর্থহীন! এই দুঃখকষ্ট, এই টাকাপয়সা, আর দলখভ, ক্রোধ, সম্মান–সবই অর্থহীন!…কিন্তু এই তো সত্য…এই নাতাশা…আদরের নাতাশা!
তারের কি রণণ-ঝনন, আর রস্তভের অন্তরের মধ্যে যা কিছু সূক্ষ্ম তার কী আলোড়ন! আর এই যা কিছুই তো পৃথিবীর অন্য সবকিছু থেকে আলাদা, সবকিছুর উপরে। হার-জিত, দলখভ, প্রতিশ্রুতি-সে সবের কী মূল্য?…সব অর্থহীন! খুন করে, ডাকাতি করেও মানুষ সুখী হতে পারে…
*
অধ্যায়-১৬
সেদিন রস্তভ সঙ্গীত থেকে যে সুখ পেল অনেকদিন তা পায়নি। কিন্তু নাতাশার মুখে নৌকোর গান শেষ হতে না হতেই আবার মাথা তুলল কঠিন বাস্তব। কোনো কথা না বলে সে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে নেমে গেল। পনেরো মিনিট পরে বুড়ো কাউন্ট ক্লাব থেকে বাড়ি ফিরল খুশি মন নিয়ে। তার গাড়ির শব্দ শুনে নিকলাস তার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
আনন্দে ও গর্বে হাসতে হাসতে বুড়ো কাউন্ট বলল, এইবেশ ভালো কাটল তো?
নিকলাস হ্যাঁ বলতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না, প্রায় কেঁদে ফেলবার মতো অবস্থা হল তার। কাউন্ট তখন পাইপটা ধরাচ্ছিল, ছেলের অবস্থা তার চোখে পড়ল না।
প্রথম ও শেষবারের মতো নিকলাস ভাবল, না, একথা এড়ানো যাবে না! আর যেন কথা প্রসঙ্গে হঠাৎই বলে উঠল, বাপি, আমি একটা কাজে এসেছি। প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। আমার কিছু টাকার দরকার।
বাবার মেজাজ বেশ খুশ ছিল, বলল, বাপু হে, আমি তো বলেছিলাম ওতে হবে না। কত চাই?
অনেক, নিকলাস লজ্জায় লাল হয়ে বোকার মতো হেসে বলল, আমি কিছু টাকা হেরেছি, মানে বেশকিছু, অনেক টাকা তেতাল্লিশ হাজার।
কী! কার কাছে?…যতসব! কাউন্ট চেঁচিয়ে বলল, বুড়োদের যেমন হয়ে থাকে, হঠাৎ তার গলা ও ঘাড়ের নিচটা লাল হয়ে উঠল।
আমি কথা দিয়েছি কাল টাকাটা দেব, নিকলাস বলল।
দুই হাত ছড়িয়ে অসহায়ভাবে সোফার উপর বসে পড়ে বুড়ো কাউন্ট বলল, বটে!…
কোনো উপায় ছিল না! সকলেরই এরকম ঘটে, জোরালো সহজ সুরে ছেলে কথাটা বলল, যদিও মর্মে মর্মে সে বুঝতে পারছে যে সে একটা অক্ষম শয়তান, সারা জীবনেও এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত সে করতে পারবে না। তার ইচ্ছা হল বাবার হাতে চুমো খায়, নতজানু হয়ে তার মার্জনা ভিক্ষা করে, কিন্তু উদাসীন রুক্ষ গলায় বলে ফেলল, এমন তো সকলেরই ঘটে!
ছেলের কথা শুনে বুড়ো কাউন্ট চোখ নামাল, ব্যস্ত হয়ে কি যেন খুঁজতে লাগল।
তো-তো করে বলে উঠল, ঠিক, ঠিক, কিন্তু আমার আশংকা হচ্ছে এত টাকা যোগাড় করা শক্ত হবে…সকলেরই ঘটে! ঠিক, এ কাজ কে না করেছে।
ছেলের মুখের দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাউন্ট ঘর থেকে বেরিয়ে গেল…নিকলাস একটা প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত হয়েই এসেছিল, এটা সে আশা করেনি।
বাপি! বা–পি! ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ডাকতে ডাকতে সে বাবার পিছু নিল, আমাকে ক্ষমা কর! বাবার হাতটা চেপে ধরে নিজের ঠোঁটের উপর ছুঁইয়ে সে কেঁদে ফেলল।
বাবা ও ছেলের মধ্যে যখন বোঝাঁপড়া চলছে, তখন মা ও মেয়ের মধ্যেও চলছে আর একটা গুরুতর ব্যাপার।
মামণি!..মামণি!…সে আমার কাছে…
তোমার কাছে কী?
আমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করেছে মামণি! মামণি! মেয়ে বলল।
কাউন্টেস নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। দেনিসভ বিয়ের প্রস্তাব করেছে। কার কাছে? এই ছেলেমানুষ নাতাশার কাছে যে এই সেদিনও পুতুল নিয়ে খেলেছে, যে এখনো লেখাপড়া শিখছে।
মেয়ে তামাশা করছে ভেবে সে বলল, ও-কথা বলো না নাতাশা! যত সব বাজে কথা!
বাজে কথা! বটে! আমি খাঁটি কথাই বলছি, নাতাশা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল।
তোমার কাছে এলাম আমি কী করব তা জানতে, আর তুমি বলছ বাজে কথা!
কাউন্টেস কাঁধ ঝাঁকুনি দিল।
মঁসিয়ে দেনিসভ যদি তোমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করে থাকে তো তাকে বলে দিও সে একটি মূর্খ, বাস!
