রাতের খাবার, রাতের খাবারের সময় হয়েছে। আর এই যে জিপসিরাও এসে পড়েছে। জিপসি ভাষায় কি যেন বলতে বলতে কতকগুলি কালো কালো পুরুষ ও নারী ঘরে ঢুকল। নিকলাস বুঝল, সব শেষ হয়ে গেল, নির্বিকার গলায় বলল, আর খেলবে না? আমার হাতে যে একটা চমৎকার তাস এসেছিল।
সে ভাবল, সব শেষ! আমার সর্বনাশ হয়েছে। এখন শুধু মস্তিষ্কের ভিতর দিয়ে একটা বুলেট চলে যাবে–এছাড়া আমার জন্য আর কিছুই বাকি নেই!
অথচ সঙ্গে সঙ্গেই সে খুশির সুরে বলে উঠল, আরে এসো, শুধু এই ছোট তাসটা!
যোগটা শেষ করে দলখভ বলল, ঠিক আছে! একুশ রুবল! যোগফলের অঙ্কটা তেতাল্লিশ হাজার থেকে একুশ রুবল বেশি হয়েছে। সে তাসের প্যাকেটটা হাতে নিল। যদিও রশুভের ইচ্ছা ছিল ছয় হাজার লিখবে, তবু দলখভের কথামতো তাসটার একটা কোণ বাঁকিয়ে স্পষ্ট করে লিখল একুশ রুবল।
বলল, আমার কাছে সবই সমান। আমি শুধু দেখতে চাই তুমি আমাকে এই দশকরাটা জিততে দাও কি না।
দলখভ গম্ভীরভাবে তাস বাটতে শুরু করল ।… দশকরাটা তার ভাগ্যেই পড়ল।
তুমি আমার কাছে তেতাল্লিশ হাজার ধার কাউন্ট, বলে দলখভ শরীরটা টান টান করে টেবিল থেকে উঠল। এতক্ষণ বসে থাকলে বড়ই ক্লান্ত লাগে।
হ্যাঁ, আমিও খুব ক্লান্ত, বস্তভ বলল।
দলখভ তাকে থামিয়ে দিল, যেন তাকে স্মরণ করিয়ে দিল যে তার পক্ষে এটা ঠাট্টা করার সময় নয়।
টাকাটা কখন পাচ্ছি কাউন্ট?
লজ্জায় লাল হয়ে রস্তভ টানতে টানতে দলখভকে পাশের ঘরে নিয়ে গেল।
সবটা তো এক্ষুনি দিতে পারছি না। তুমি কি একটা I.Q.U. নেবে? সে বলল।
হেসে রস্তভের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে দলখভ বলল, তুমি তো প্রবাদটা জানো– ভালোবাসার ভাগ্য যার ভালো, তার তাসের ভাগ্য খারাপ। আমি জানি সোনিয়া তোমাকে ভালোবাসে।
তোমার সম্পর্কিত বোন…দলখভ কথাটা শুরু করতেই নিকলাস তাকে বাধা দিল। হিংস্র কণ্ঠে বলে উঠল, আমার সে বোনের সঙ্গে এ সবের কোনো সম্পর্ক নেই, আর তার নাম উল্লেখেরও কোনো প্রয়োজন দেখি না?
তাহলে টাকাটা কখন পাচ্ছি?
কাল, বলেই রস্তভ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
*
অধ্যায়-১৫
আত্মর্যাদার অনুকূল সুরে কাল বলাটা শক্ত নয়, কিন্তু একাকি বাড়ি ফিরে যাওয়া, বোন, ভাই, মা ও বাবার সঙ্গে দেখা করা, সব কথা স্বীকার করা, এবং কথা দেবার পরেও টাকা চাওয়া-সে বড় ভয়ংকর।
বাড়িতে তখনো কেউ শুতে যায়নি। ছোটরা থিয়েটার থেকে ফিরে রাতের খাওয়া সেরে ক্ল্যাভিকর্ডকে ঘিরে জমে গেছে। এবার শীতকালে রস্তভ-পরিবারে ভালোবাসার যে কাব্যিক আবহাওয়া ছড়িয়ে আছে, ঘরে ঢোকামাত্রই সেই আবহাওয়া রস্তভকে ঘিরে ধরল, কিন্তু এখন দলখভের বিয়ের প্রস্তাব ও ইয়োগেলের নাচের আসরের পরে সেই আবহাওয়া ঝড়ের আগেকার বাতাসের মতো সোনিয়া ও নাতাশাকে ঘিরে ঘন হয়ে নেমেছে। তারা দুজন ক্ল্যাভিকর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে খুশিতে হাসছে। বসবার ঘরে ভেরা শিনশিনের সঙ্গে দাবা খেলছে। স্বামী ও পুত্রের ফিরে আসার প্রতীক্ষায় বুড়ি কাউন্টের আর একটি বুড়ির সঙ্গে পেশেন্স খেলছে। ঝিলমিল চোখ ও এলোমেলো চুল নিয়ে দেনিসভ ক্ল্যাভিকর্ডে বসে তারে আঙুল নাড়ছে আর যাদুকরী শীর্ষক নিজের রচিত কবিতায় সুর দিয়ে গাইতে চেষ্টা করছে।
বল যাদুকরী, আমার পরিত্যক্ত বীণায়
কোন যাদু শক্তি আজও আমাকে ডাকে?
কোন শিখা আগুন জ্বেলেছে আমার অন্তরে,
আর কোন সে আনন্দে শিউরে উঠছে আমার অঙ্গুলি?
ভীত ও আনন্দিত নাতাশার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আবেগের সঙ্গে সে গেয়ে চলেছে।
নাতাশা বলে উঠল, অপূর্ব! চমৎকার! আর একটা কবিতা হোক। নিকলাসের উপস্থিতি তার নজরে পড়েনি।
নিকলাস ভাবল, এরা সকলেই আগের মতোই আছে।
আরে, নিকলাস এসেছে! বলতে বলতে নাতাশা তার কাছে ছুটে গেল।
বাপি বাড়ি ফিরেছে? সে জিজ্ঞেস করল।
তার কথার জবাব না দিয়ে নাতাশা বলল, তুমি আসায় খুব খুশি হয়েছি। আমরা কত মজা করছি! ভাসিলি দিমিত্রি আমার জন্যই একদিন বেশি থাকছে! তুমি জানতে?
না, বাপি এখনো ফেরেনি, সোনিয়া বলল।
বসবার ঘর থেকে বুড়ি কাউন্টেস ডেকে বলল, নিকলাস এসেছ? এখানে এস সোনা!
নিকলাস মার কাছে গেল, তার হাতে চুমো খেল, পাশে বসে নীরবে হাতের তাসগুলো দেখতে লাগল। নাচ-ঘর থেকে ভেসে এল হাসির হররা, সকলে নাতাশাকে গাইতে বলছে।
দেনিসভ চেঁচিয়ে বলছে, ঠিক আছে। ঠিক আছে! অজুহাত দেখালে চলবে না। এবার তোমার গাইবার পালা-আমি মিনতি করছি!
কাউন্টেস ছেলের দিকে তাকাল।
ব্যাপার কি? সে জিজ্ঞেস করল ।
অনবরত একই প্রশ্ন শুনে ক্লান্ত হয়ে নিকলাস বলল, ও কিছু না। বাপি কি শিগগিরই ফিরবে?
আশা তো করছি।
এরা সেইরকমই আছে। এ ব্যাপারে কিছুই জানে না! আমি কোথায় যাই? ভাবতে ভাবতে নিকলাস আবার নাচের ঘরেই ফিরে গেল।
সোনিয়া ক্ল্যাভিকর্ডে বসে দেনিসভের একটা প্রিয় সুর বাজাচ্ছে। নাতাশা গানের জন্য তৈরি হচ্ছে। মুগ্ধ চোখে দেনিসভ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
নিকলাস পায়চারি করতে লাগল।
ওরা কেন ওকে গাইতে বলছে? ও কেমন করে গাইবে? খুশি হবার তো কোনো কারণ নেই, নিকলাস ভাবতে লাগল।
সোনিয়ার হাতে প্রথম সুর বেজে উঠল।
হে ঈশ্বর, আমি তো সর্বস্বান্ত, সম্মানহীন একটা মানুষ! আমার জন্য তো আছে শুধু মাথাটাকে বুলেটে বিদ্ধ করা-গান নয়! তার চিন্তার গতি দ্রুততর হল। চলে যাও! কিন্তু কোথায় যাব? সব সমান–ওদের গাইতে দাও!
