আর কি আশ্চর্য, নিকলাসও একটা তাস তুলে নিয়ে অল্প কিছু বাজি রেখে খেলতে শুরু করল।
বলল, আমার সঙ্গে টাকা নেই।
তোমাকে আমি বিশ্বাস করি।
রস্তভ একটা তাসের উপর পাঁচ রুবল বাজি ধরে হেরে গেল, আবার বাজি ধরল, আবার হেরে গেল। রস্তভের দশখানা তাস দলখভ মেরে দিল।
খেলা চলতে লাগল, ওয়েটারও শ্যাম্পেন পরিবেশন করে চলল।
রস্তভের সব তাস মার খেল, তার হিসেবে লেখা পড়ল আটশো রুবল। একটা তাসের উপর সেও লিখল ৮০০ রুবল, কিন্তু ওয়েটার তার গ্লাসটা ভর্তি করে দিতেই সে মত পাল্টে বিশ রুবল বাজির কথাটাই লিখল।
রস্তভের দিকে না তাকিয়েই দলখভ, ওটা ছেড়ে দাও, অচিরেই তুমি সবটাই জিততে পারবে। আমি অন্যের কাছে হারি, কিন্তু তোমার কাছে জিতে যাই। না কি তুমি আমাকে ভয় কর? প্রশ্নটা সে আর একবার করল।
রস্তভ তার কথা শুনল। আটশো বাজি ধরাই স্থির করল। কোণ ছেঁড়া একটা হরতনের সাতকরা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে সে টেবিলের উপর রাখল। এই সাতকরাটার কথা তার অনেককাল পর্যন্ত মনে ছিল। একটুকরো ভাঙা চক দিয়ে সেই সাতকরার উপরে সে পরিষ্কার অক্ষরে লিখল ৮০০ রুবল। হাতের শ্যাম্পেনের গ্লাসটা খালি করে দলখভের কথায় একটু হাসল, তারপর একখানা সাতকরা দেখার আশায় দলখভের হাতের প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে ভগ্নহৃদয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। এই হরতনের সাতকরার হার জিতের উপর রস্তভের অনেক কিছু নির্ভর করছে। আগের রবিবারে বুড়ো কাউন্ট ছেলেকে দু হাজার রুবল দিয়ে বলেছে, মে মাসের আগে আর কোনো টাকা সে দিতে পারবে না, কাজেই রস্তভ যেন হিসেব করে চলে। নিকলাস তখন বলে দিয়েছে, এই টাকাই এখন যথেষ্ট, বসন্তকালের আগে সে আর টাকা চাইবে না। সে টাকার মাত্র বারোশো রুবল অবশিষ্ট আছে : কাজেই তার কাছে এই হরতনের সাতকরার অর্থ এখন শুধু ষোলোশো রুবল হার নয়, নিজের কথারও খেলাপ।
দলখভ আর একবার বলল, তাহলে আমার সঙ্গে খেলতে তোমার ভয় নেই। তারপর যেন একটা ভালো কথা শোনাতে যাচ্ছে এমনিভাবে তাসটা নামিয়ে রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে ইচ্ছা করেই একটু হেসে বলতে শুরু করল, দেখুন ভদ্রজনরা, আমি শুনেছি মস্কোতে জোর গুজব যে আমি একজন তাসের জুয়াড়ি, কাজেই আপনাদের আমি সতর্ক করে দিচ্ছি।
এবার তাসটা বাট! রস্তভ হুংকার দিল।
ওঃ, যতসব মস্কোই গুজব! বলে দলখভ হেসে তাস তুলে নিল।
আ-আ! দুই হাত মাথায় তুলে রস্তভ প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। যে সাতকরাটা তার দরকার সেটা রয়েছে সকলের উপরে-প্যাকেটের প্রথম তাস। যতটা দেবার ক্ষমতা আছে তার বেশি সে হেরেছে।
তাস বাটতে বাটতে বাঁকা চোখে রশুভের দিকে তাকিয়ে দলখভ বলল, এখনো সময় আছে, নিজের সর্বনাশ করো না।
*
অধ্যায়-১৪
ঘণ্টা দেড়েক পরে অধিকাংশ খেলুড়ের নিজেদের খেলায় কোনো আগ্রহ রইল না।
সমস্ত আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হল রস্তভের উপর। ষোলোশো রুবলের পরিবর্তে তার নামে টাকার অংকের একটা লম্বা ফিরিস্তি বসে গেল, তার দশ হাজার পর্যন্ত সে গুনেছিল, কিন্তু তার ধারণা এখন সেটা পনেরো হাজার দাঁড়িয়েছে। আসলে অংকটা ইতিমধ্যেই বিশ হাজার রুবল ছাড়িয়ে গেছে। দলখভ এখন আর কোনো গল্প শুনছেও না বলছেও না, সে শুধু লক্ষ্য রাখছে রশুভের হাতের উপর, আর মাঝে মাঝে তার নামের পাশে লেখা টাকার অংকগুলোর উপর চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। স্থির করেছে, অঙ্কটা তেতাল্লিশ হাজারে না ওঠা পর্যন্ত সে খেলা চালিয়ে যাবে। এই সংখ্যাটা বেছে নেবার কারণ, তেতাল্লিশ হচ্ছে তার ও সোনিয়ার বয়সের যোগফল। দুই হাতের উপর মাথা রেখে রস্তভ টেবিলের পাশে বসে আছে, টেবিলের উপর ছড়িয়ে আছে নানা সংখ্যা, ছিটনো রয়েছে মদ, আর ছড়িয়ে আছে তাস। একটা যন্ত্রণাদায়ক চিন্তা কিছুতেই তার মন থেকে যাচ্ছে না : যে দুটি চওড়া-হাড়ের লালচে হাত যার লোমশ কব্জি শার্টের আস্তিনের নিচ দিয়ে দেখা যাচ্ছে, যে হাত দুটিকে সে ভালোবাসে, ঘৃণা করে, তার কবল থেকে সে মুক্তি পাবে না।
রস্তভ বসে বসে ভাবতে লাগল : সে তো জানে আমার কাছে এই হারের অর্থ কি। আমার সর্বনাশ হোক সেটা নিশ্চয় সে চায় না। একসময় সে কি আমার বন্ধু ছিল না? আমি কি তাকে ভালোবাসতাম না? কিন্তু এটা তো তার দোষ নয়। ভাগ্য এত খারাপ হলে সেই বা কি করবে?…আবার আমারও তো দোষ নয়। আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। আমি কি কাউকে খুন করেছি, কারো ক্ষতি করতে চেয়েছি? তাহলে আমার এই ভয়ংকর দুর্ভাগ্য হল কেন? কখন এর শুরু? আমি তো এই কথা মনে করেই টেবিলে বসেছিলাম যে মামণির নামকরণ দিবসের উপহার হিসেবে একটা অলংকারের বাক্স কিনবার জন্য একশো রুবল জিতেই এখান থেকে বাড়ি চলে যাব। আমি কত সুখী ছিলাম, কত স্বাধীন ছিলাম, মেজাজ কত হাল্কা ছিল! কখন তা শেষ হয়ে গেল, আর কখনই বা শুরু হল এই ভয়ংকর অবস্থা? এখনো তো আমি সুস্থ ও সবল আছি, তবু তো এভাবে এখানেই বসে আছি। না, এ হতে পারে না! নিশ্চয় এ সব কিছুই বৃথা হয়ে যাবে!
ঘরটা মোটেই গরম নয়, তবু সে ঘেমে নেয়ে উঠল। তার মুখটা ভয়ংকর ও করুণ হয়ে উঠেছে।
তার নামে পাশের অঙ্কটা দুর্ভাগা তেতাল্লিশ হাজারে পৌঁছে গেল। আর অমনি তাসের প্যাকেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দলখভ তাড়াতাড়ি রস্তভের ঋণের অঙ্কটা যোগ করতে বসল, এবং মোটা মোটা অক্ষরে লিখতে গিয়ে চকটাই ভেঙে ফেলল।
