নাচ-ঘরে ঢুকেই নাতাশা যেন প্রেমে পড়ে গেল। বিশেষ করে কোনো এক জনের প্রেমে নয়, সকলের প্রেমে। যাকে দেখছে সেই মুহূর্তের জন্য তারই প্রেমে পড়ছে।
সোনিয়ার কাছে ছুটে গিয়ে বলল, আঃ, কী মজা!
পৃষ্ঠপোষকের সদয় দৃষ্টিতে নাচিয়েদের দেখতে দেখতে নিকলাস ও দেনিসভ ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিল।
দেনিসভ বলে উঠল, কী মিষ্টি দেখতে,-বড় হলে সত্যিকারের রূপসী হবে!
কে?
কাউন্টেস নাতাশা, দেনিসভ জবাব দিল। একটু থেমে বলল, আর কী নাচে! কী কমনিয়তা!
কার কথা বলছ?
তোমার বোনের, দেনিসভ রেগে জবাব দিল ।
রস্তভ হাসল।
নিকলাসের কাছে এসে ইয়োগেল বলল, কাউন্ট, তুমি ছিলে আমার সেরা ছাত্রদের একজন,-তোমাকে নাচতেই হবে। দেখ, কত সব সুন্দরী মেয়ে এসেছে- দেনিসভকেও সে ওই একই অনুরোধ জানাল, সেও তার প্রাক্তন ছাত্র।
না বাবা, আমি কাগজের ফুল, দেনিসভ বলল। আপনার কি মনে নেই আপনার শিক্ষার কি হাল আমি করেছি
আরে না, না, তুমি একটু অমনোযোগী ছিলে এই যা, কিন্তু তোমার ক্ষমতা ছিল,-আরে হ্যাঁ, তোমার মধ্যে ক্ষমতা ছিল!
সদ্য প্রচলিত মাজুকার সুরে ব্যান্ড বেজে উঠল। নিকলাস ইয়োগেলের প্রস্তাব ফেরাত পারল না। সোনিয়াকে তার সঙ্গে নাচতে বলল। দেনিসভ বয়স্কা মহিলাদের দলে ভিড়ে তলোয়ারে ভর দিয়ে পায়ে তাল দিতে দিতে নানা মজার কথা বলতে লাগল। ইয়োগেল ও তার গর্বের সেরা ছাত্রী নাতাশাই নাচের প্রথম জুটি হল। দেনিসভ তার উপর থেকে চোখ ফেরাল না, তলোয়ার ঠুকে এমনভাবে তাল দিতে লাগল যেন সে বোঝাতে চাইছে সে যে নাচছে না সেটা সে নাচতে পারে না বলে নয়, নাচতে চায়নি বলে। নাচের ফাঁকে একসময় সে রস্তভকে ডেকে বলল, এ তো মোটেই হচ্ছে না। এটা কী ধরনের পোলিশ মাজুকা? নাতাশা কিন্তু চমৎকার নাচে।
নিকলাস জানে, পোল্যান্ডেও মাজুকা নাচে দেনিসভের খুব নাম আছে, নাতাশার কাছে ছুটে গিয়ে বলল, এবার দেনিসভকে জুটি কর। সে সত্যিকারের নাচিয়ে, অপূর্ব!
জুটি নির্বাচনের সময় এলে নাতাশা পায়ে পায়ে দেনিসভের কাছে এগিয়ে গেল। নিকলাস দেখল, দেনিসভ ও নাতাশা হেসে হেসে কথা কাটাকাটি করছে, দেনিসভ আপত্তি করলেও খুশিতে হাসছে। সে তাদের কাছে ছুটে গেল। নাতাশা বলছে, ভাসিলি দিমিত্রিচ, দয়া করে আসুন।
না, না, আমাকে ছেড়ে দিন কাউন্টেস, দেনিস জবাবে বলছে।
এবার ভাস্কা, নিকলাস বলল।
দেনিসভ তামাশা করে বলল, এরা আমাকে এমনভাবে পিঠ চাপড়ায় যেন আমি একটা বিড়ালছানা ভাসকা!
নাতাশা বলল, আমি আপনাকে সারা সন্ধ্যা গান শোনাব।
আঃ, স্বর্গের পরি! আমাকে নিয়ে এ দেখছি যা খুশি তাই করতে পারে!
দেনিসভ তলোয়ার খুলে ফেলল। চেয়ারের পিছন থেকে এগিয়ে এসে শক্ত করে সঙ্গিনীর হাতটা চেপে ধরে সে নাচের তালে ফেলবার অপেক্ষায় পাটা তুলল। দেখতে ছোটখাট হলেও ঘোড়ার পিটে আর মাজুকার আসরে দেনিসভকে মোটেই ছোট মনে হয় না, তখন সে সুদর্শন যুবাপুরুষটি।
যদিও ইয়োগেল তাদের নাচকে আসল মাজুকা বলে স্বীকার করল না, তবু দেনিসভের কলাকৌশল দেখে সকলেই খুশি হল, বারবার তার কাছে নাচের জুটি হবার ডাক এল, আর বুড়োরা হেসে হেসে পোল্যান্ড ও পুরোনো সুদিনের কথা বলতে লাগল। মাজুকার শেষে পরিশ্রমে লাল হয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে দেনিসভ নাতাশার পাশে গিয়ে বসল, বাকি সময়টা একবারও তাকে ছেড়ে গেল না।
*
অধ্যায়-১৩
তারপর দুই দিন পর্যন্ত রস্তভ দলখভের দেখাই পেল না-না তা বাড়িতে, না দলখভের বাড়িতে। তৃতীয় দিনে তার কাছ থেকে একটা চিঠি পেল :
যেহেতু তোমাদের বাড়িতে এখন আর আমি যেতে চাই না-কারণটা তুমি জান-এবং যেহেতু আমি রেজিমেন্টেই ফিরে যাচ্ছি, তাই আজ রাতে বন্ধুদের জন্য একটা বিদায়-ভভাজের আয়োজন করেছি–ইংলিশ হোটেলে এসো।
পরিবারের লোকজন ও দেনিসভকে নিয়ে রস্তভ থিয়েটার দেখতে গিয়েছিল। প্রায় দশটা নাগাদ সেখান থেকে সোজা চলে গেল ইংলিশ হোটেলে। তাকে সবচাইতে ভালো ঘরটা দেখিয়ে দেওয়া হল। একটা টেবিলকে ঘিলে জনবিশেক লোক একত্র হয়েছে, দুটো মোমবাতির মাঝখানে দলখভ বসে আছে। টেবিলের উপর একগাদা স্বর্ণমুদ্রা ও নোট, সবটাই তার হেপাজতে। তার বিয়ের প্রস্তাব সোনিয়ার প্রত্যাখ্যানের পরে তার সঙ্গে রস্তভের দেখা হয়নি, তাই রস্তভের কিছুটা অস্বস্তি হতে লাগল।
দলখভ কিন্তু রস্তভ ঘরে ঢুকতেই নির্বিকার চোখে তার দিকে তাকাল।
বলল, অনেকদিন আমাকে দেখা হয়নি। এসেছ বলে ধন্যবাদ। তাসটা এখনই শেষ হবে, তারপরই শুরু হবে ইলিউশকার সমবেত সঙ্গীত।
রস্তভ একটু লাল হয়ে বলল, দুই একবার তোমার বাড়িতেও ঢুঁ মেরেছি।
দলখভ কোনো জবাব দিল না।
শুধু বলল, তুমিও খেলতে পার।
সেই মুহূর্তে দলখভের একটা আশ্চর্য কথা রশুভের মনে পড়ে গেল, সে বলেছিল, একমাত্র বোকারা ছাড়া আর কেউ তাদের ভাগ্যে বিশ্বাস করে না।
যেন রশুভের মনের কথাটা ধরতে পেরেই দলখভ এবার বলল, নাকি আমার সঙ্গে খেলতে তোমার ভয় করছে?
রস্তভ অস্বস্তি বোধ করল। দলখভের কথার জবাবে একটা ঠাট্টা করতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। কিন্তু সে কিছু ভেবে উঠবকার আগেই দলখভ বলল, ঠিক আছে, তোমার না খেলাই ভালো। এক প্যাকেট নতুন তাস শাফল করে বলল : মশাইরা, টাকা ছাড় ন!
সে তাস বাটতে শুরু করল। রস্তভ তার পাশে বসল, প্রথমে খেলায় যোগ দিল না। দলখভ বারবার তার দিকে তাকাতে লাগল।
