নানান জায়গায় দেখা সাক্ষাৎ উপলক্ষে ছুটোছুটি করে খুবই ক্লান্ত নিকলাস সেদিন বাড়ি ফিরল ডিনারের ঠিক আগে। বাড়িতে ঢুকে বাড়ির প্রেমের আবহাওয়ায় কেমন যেন একটা টান-টান ভাব লক্ষ্য করল। সোনিয়া, দলখভ এমন কি বুড়ি প্রিন্সেস এবং কিছুটা নাতাশাকেও যেন বিচলিত মনে হল। সে বুঝতে পারল, সোনিয়া ও দলখভের মধ্যে একটা কিছু ঘটেছে। সেদিন সন্ধ্যায়ই একটা বল-নাচের আসর বসবে, নৃত্যশিক্ষক ইয়োগেল ছুটির মধ্যে তার ছাত্রছাত্রীর জন্য এই নাচের আয়োজন করেছে।
নাতাশা বলল, নিকলাস, তুমি ইয়োগেলের ওখানে যাচ্ছ তো? দয়া করে যেও! সে তোমাকে যেতে বলেছে, ভাসিলি দিমিত্রিচও (দেনিসভ) যাচ্ছে।
দেনিসভ বলে উঠল, কাউন্টেসের হুকুম হলে আমি কোথায় না যেতে পারি! এমন কি pas de chale নাচতেও রাজি আছি।
নিকলাস জবাব দিল, যদি সময় পাই। কিন্তু আমি যে আর্থারভদের কথা দিয়েছি, তাদের একটা পার্টি আছে।
আর তুমি? সে দেনিসভকে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু প্রশ্নটা করেই তার মনে হল কাজটা ঠিক হয়নি।
সোনিয়ার দিকে তাকিয়ে দলখভ রাগত নিরুত্তাপ গলায় জবাব দিল, হয়তো।
নিশ্চয় একটা কিছু ঘটেছে, নিকলাস ভাবল। তার এই সিদ্ধান্ত আরো পাকা হল যখন ডিনারের পরেই দলখভ সেখানে থেকে চলে গেল। নাতাশাকে ডেকে জানতে চাইল ব্যাপারটা কি।
ছুটে এসে নাতাশা বলল, আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম। বিজয়িনীর ভঙ্গিতে বলল, আমি তো বলেছিলাম, তুমি বিশ্বাস করনি। সে সোনিয়ার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করেছে।
নিকলাস ইদানীং সোনিয়াকে নিয়ে বড় একটা মাথা ঘামায় না, তবু খবরটা শুনে তার মনের কোথায় যেন একটা ধাক্কা লাগল। একটি যৌতুকহীনা, বাপ-মা-হারা মেয়ের পক্ষে দেনিসভ তো সত্যি উপযুক্ত এবং কোনো কোনো বিষয়ে খুবই ভালো বর। বুড়ি কাউন্টেস ও সমাজের দিক থেকেও সোনিয়ার পক্ষে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কাজেই খবরটা শুনে প্রথমেই নিকলাসের মনে সোনিয়ার প্রতি রাগ দেখা দিল।…সে বলতে চাইল এ তো চমৎকার, ছেলেমানুষী প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে এ প্রস্তাব গ্রহণ করাই তো তার উচিত, কিন্তু সে-কথা বলার আগেই নাতাশা আবার শুরু করে দিল।
আর ভাব তো! সে পরিষ্কারভাবে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে! একটু থেমে আবার বলল, তাকে বলে দিয়েছে ও নাকি আর কাউকে ভালোবাসে।
ঠিক, আমার সোনিয়া এ ছাড়া আর কিছু করতে পারে না! নিকলাস ভাবল।
মামণি এত পীড়াপীড়ি করল, সে কিছুতেই শুনল না, আমি জানি, সে যখন একবার না বলেছে তখন আর মত বদলাবে না…
মামণি তাকে চাপ দিয়েছিল? নিকলাসের গলায় তিরস্কারের সুর।
নাতাশা বলল, হ্যাঁ। তুমি কি জান নিকলাস-রাগ করো না কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি যে তুমি তাকে বিয়ে করবে না।
নিকলাস বলল, না, সেকথা তুমি মোটেই জান না। কিন্তু আমি ওর সঙ্গে কথা বলব। সোনিয়া কত ভালো মেয়ে! সে হেসে বলল।
আঃ, সত্যি সে বড় ভালো মেয়ে! আমি তাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার কাছে। দাদাকে চুমো খেয়ে নাতাশা ছুটে বেরিয়ে গেল।
এক মিনিট পরে সোনিয়া এল, তার চোখে-মুখে ভয় ও অপরাধের ভাব। নিকলাস এগিয়ে গিয়ে তার হাতে চুমো খেল। ফিরে আসার পরে এই প্রথম তারা নির্জনে তাদের ভালোবাসার কথা বলতে লাগল।
প্রথমে ভীরু গলায় তারপর ক্রমাগত সাহসের সঙ্গে নিকলাস বলতে লাগল, সোফি, যে লোকটি শুধু যে ভালো ও সুবিধাজনক বর তাই নয়, যে অত্যন্ত চমৎকার ও মহান…সে আমার বন্ধু…তাকে যদি তুমি ফিরিয়ে দিতে চাও…
সোনিয়া বাধা দিল।
তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমি তো আগেই ফিরিয়ে দিয়েছি।
যদি আমার জন্য ফিরিয়ে দিয়ে থাক তো আমার আশংকা হচ্ছে আমি…
সোনিয়া আবার বাধা দিল। ভয়ার্ত, মিনতি ভরা চোখে তার দিকে তাকাল।
নিকলাস, ও কথা আমাকে বল না, সোনিয়া বলল।
না, আমাকে বলতেই হবে। এটা আমার অহংকার বলে মনে হতে পারে, তবু একথা বলাই ভালো। আমার জন্য যদি তুমি তাকে ফিরিয়ে দিয়ে থাক তাহলে সব কথা আমাকে বলতেই হবে। আমি তোমাকে ভালোবাসি, আর আমি মনে করি অন্য সকলের চাইতে তোমাকে আমি বেশি ভালোবাসি…
আমার কাছে সেটাই যথেষ্ট, লজ্জায় লাল হয়ে সোনিয়া বলল।
না, কিন্তু আমি হাজারবার প্রেমে পড়েছি, আবারও প্রেমে পড়ব, কিন্তু তোমার মতো এমন করে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস ও ভালোবাসার বাঁধনে আর কারো সঙ্গে বাঁধা পড়িনি। তাছাড়া আমার বয়স অল্প। মামণির এটা ইচ্ছা নয়। এক কথায়, আমি কোনো কথা দিতে পারছি না। আমি মিনতি করছি, দলখভের প্রস্তাবটা তুমি আর একবার বিবেচনা করে দেখ, অনেক কষ্টে বন্ধুর নামটি উচ্চারণ করে সে বলল।
আমাকে ও-কথা বল না! আমি কিছু চাই না। তোমাকে আমি দাদার মতো ভালোবাসি, চিরদিন তাই বাসব। এর বেশি কিছু চাই না।
তুমি একটি দেবদূত : আমি তোমার উপযুক্ত নই, কিন্তু আমার ভয় হয় পাছে তোমাকে ভুলপথে নিয়ে যাই।
নিকলাস আর একবার তার হাতে চুমো খেল।
.
অধ্যায়-১২
মস্কোতে ইয়োগেলের নাচের আসর খুবই উপভোগ্য হল। ছেলেমেয়েদের নতুন-শেখা নাচ দেখে মায়েরা সে কথা বলল, যারা অক্লান্তভাবে নেচে গেল সেই তরুণ-তরুণীরাও সে-কথা বলল, আর যেসব বয়স্ক যুবক যুবতীরা যেন কৃপা করেই নাচের আসরে এসেছিল তাদেরও খুবই ভালো লাগল। বেজুখভের বাড়ির নাচ ঘরটাই ইয়োগেল নিয়েছিল, আর সকলেই বলল যে আসরটা খুবই সফল হয়েছে। যেসব সুন্দরী সেখানে হাজির হয়েছিল, রস্ত পরিবারের দুই মেয়েই তাদের মধ্যে সেরা সুন্দরী।
