দলখভও মাঝে মাঝে রস্তভের কাছে এমন সব কথা বলে যা কেউ তার কাছ থেকে আশা করে না।
সে বলে, আমি জানি লোকে আমাকে খারাপ বলে! বলুক! যাদের আমি ভালোবাসি তারা ছাড়া আর যে যাই বলুক তাতে আমার কিছুই যায়-আসে না। আমি যাদের ভালোবাসি তাদের জন্য প্রাণ দিতে পারি, বাকিরা আমার পথের বাধা হলে তাদের আমি পায়ে দলি। আমার মা আছে, তাকে আমি পূজা করি, সে আমার অমূল্য রত্ন, আর আছে দু-তিনটি বন্ধু-তাদের মধ্যে তুমি একজন, বাকিদের নিয়ে আমি কথা ঘামাই কারণ আমার পক্ষে হয় তারা ক্ষতিকর, আর না হয় উপকারী। আর বেশির ভাগই ক্ষতিকারক, বিশেষত স্ত্রীলোকরা। সত্যি হে বাপু, স্নেহশীল, মহৎ, উচ্চ অন্তঃকরণের পুরুষ আমি দেখেছি, কিন্তু এমন একটি মেয়েমানুষও দেখিনি-কাউন্টেস থেকে রাধুনি পর্যন্ত–যে দুশ্চরিত্রা নয়। মেয়েদের মধ্যে যে স্বর্গীয় পবিত্রতা ও আন্তরিকতা আমি খুঁজে বেড়াই আজ পর্যন্ত তার দেখা পাইনি। যদি পেতাম তার জন্য জীবন দিতেও রাজি হতাম। কিন্তু ওরা!… সে একটা ঘৃণাসূচক অঙ্গভঙ্গি করল। কিন্তু বিশ্বাস কর, আজও যে আমার কাছে জীবনের মূল্য আছে তার কারণ আমি এখনো আশা রাখি যে এমন কোনো স্বর্গীয় প্রাণীর সঙ্গে আমার দেখা হবেই যে আমাকে নতুন করে গড়ে তুলবে, পবিত্র করবে, উন্নত করবে। কিন্তু আমার কথা তুমি বুঝতে পারবে না।
ওঃ, হ্যাঁ, তোমাকে খুব বুঝতে পারি, রস্তভ বলল, নতুন বন্ধুটির প্রভাব পড়েছে তার মনে।
.
হেমন্তকালে রস্তভ-পরিবার মস্কোতে ফিরে এল। শীতের গোড়ায় দেনিসভও ফিরে এল তাদের কাছে। ১৮০৬ সালের শীতের অর্ধেকটা সময় রস্তভ মস্কোতে কাটাল। তার কাছে এবং গোটা পরিবারের কাছে এ সময়টা অত্যন্ত সুখের, অত্যন্ত আনন্দের দিন। নিকলাসের সঙ্গে অনেক যুবক তাদের বাড়িতে আসত। ভেরা যখন বিশ বছরের সুন্দরী, সোনিয়া ষোল বছরের ফুটন্ত ফুলটি, নাতাশা অর্ধেক তরুণী, অর্ধেক বালিকা।
যেসব যুবকদের রস্তভ এ বাড়ির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল তাদের প্রথম সারির একজন হল দলখভ, নাতাশা ছাড়া বাড়ির আর সকলেরই তাকে ভালো লাগল। দলখভকে নিয়ে সে তো দাদার সঙ্গে প্রায় ঝগড়া করে আর কি। নাতাশা বার বার বলতে লাগল, সে খারাপ লোক, বেজুখভের সঙ্গে দ্বৈত যুদ্ধের ব্যাপারে পিয়ের নির্দোষ, দোষ দলখভের, তাছাড়া সে কেমন যেন বিরক্তিকর ও অস্বাভাবিক।
দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে সে চেঁচিয়ে বলে, আমার, বোঝবার কিছু নেই, লোকটি দুষ্ট, হৃদয়হীন। বরং তোমার দেনিসভকে আমি পছন্দ করি, লম্পটই হোক আর যাই হোক, তবু তাকে আমি পছন্দ করি, তাহলেই দেখতে পাচ্ছ আমি সব বুঝি। কথাটা কীভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না…এই লোকটি সবকিছুতেই হিসেব মাফিক চলে, আর সেটাই আমি পছন্দ করি না। কিন্তু দেনিসভ…
নিকলাস বলে উঠল, ওঃ, দেনিসভ অন্য ধরনের মানুষ, দলখভের মধ্যে যে একটা মন আছে সেটা তোমাকে বুঝতে হবে, তোমার উচিত তার মায়ের সঙ্গে তাকে দেখা। কী হৃদয়!
দেখ, ওসব আমি জানি না, কিন্তু তার সঙ্গ আমার কাছে অস্বস্তিকর। আর তুমি কি জান সে সোনিয়ার প্রেমে পড়েছে?
কী বাজে কথা…
আমি ঠিকই বলছি, দেখে নিও।
নাতাশার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হল। দলখভ সাধারণত মেয়েদের এড়িয়েই চলে, কিন্তু এ-বাড়িতে সে প্রায়ই আসতে লাগল, আর কেউ মুখে না বললেও সে যে কার জন্য আসে সেটাও অচিরেই বোঝা গেল। সোনিয়ার জন্যই সে আসে। মুখে না বললেও সোনিয়াও সেটা জানে, আর দলখভকে দেখলেই তার মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে।
বোঝা গেল এই বিচিত্র চরিত্রের শক্তিমান লোকটি এই মনোরমা মেয়েটির দুর্নিবার আকর্ষণে বাঁধা পড়েছে, তারা পরস্পরকে ভালোবাসে।
১৮০৬-এর হেমন্তকালে নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধের কথা আবার নতুন করে সকলের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। নতুন করে সৈন্য সংগ্রহের হুকুম জারি হয়ে গেছে, নিয়মিত সেনাদলে প্রতি হাজারে দশজন, আর স্বদেশ রক্ষী সেনাদলে (militia) প্রতি হাজারে নয়জন। সর্বত্র বোনাপার্তকে শাপশাপান্ত করা হতে লাগল, আর সারা মস্কো জুড়ে আসন্ন যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো কথা রইল না। এই যুদ্ধায়োজনে রস্ত পরিবারের একমাত্র চিন্তা নিকলাসকে নিয়ে, সে তো কারো কথায়ই মস্কোতে থাকবে না, বড়দিনের পরে দেনিসভের ছুটি ফুরিয়ে গেলেই তাকে নিয়ে রেজিমেন্টে ফিরে যাবে। কিন্তু আসন্ন বিদায়ের জন্য তার হাসিখুশিতে কোনোরকম বাধা হল না, বরং সে আরো প্রাণ খুলে আসর জমাতে লাগল। ডিনারে, পার্টিতে ও বল-নাচেই সে বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে কাটাতে লাগল।
০৪.২ বড়দিনের পর
অধ্যায়-১১
বড়দিনের পরবর্তী তৃতীয় দিনে নিকলাস বাড়িতেই ডিনার খেল, ইদানীং এ কাজটা সে বড় একটা করেনি। একটা বড় মাপের বিদায়-ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল, কারণ এপিফেনি পর্বের পরেই সে ও দেনিসভ রেজিমেন্টে যোগ দিতে যাত্রা করবে। দেনিসভ ও দলখভ সহ প্রায় বিশজন তাতে উপস্থিত হয়েছিল।
এবারকার ছুটির সময়টাতে বাতাসে যেভাবে ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়েছিল, রস্তভদের বাড়িতে প্রেমের যে জোরালো আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনটি আগে কখনো হয়নি। সুখের মুহূর্তটাকে আঁকড়ে ধরে, ভালোবাস, ভালোবাসা পাও! পৃথিবীতে এটাই তো একমাত্র সত্য। আর সবই বোকামি। এখানে এটাই তো আমাদের একমাত্র আকর্ষণ-এই বাণীই যেন সর্বত্র শোনাতে লাগল।
