এখনো আপনার স্বামীর সঙ্গে আমি তর্ক করছিলাম। কেন যে সে যুদ্ধে যেতে চাইছে তা তো আমি বুঝতে পারি না। যুবতীদের সঙ্গে কথা বলার সময় সাধারণত যুবকরা যে রকম বিব্রত বোধ করে থাকে তার কোনোরকম ধার না ধেরে পিয়ের প্রিন্সেসকে কথাগুলি বলল।
এবার প্রিন্সেস শুরু করল। পিয়েরের কথাগুলি তার মনে খুব লেগেছে।
সে বলল, আঃ, ঠিক ওই কথাই তো আমিও তাকে বলি! আমিও বুঝতে পারি না। পুরুষ মানুষরা কেন যুদ্ধ ছাড়া থাকতে পারে না সেটা আমি মোটেই বুঝতে পারি না। আমাদের মেয়েদের তো ওসব দরকার হয় না। আপনিই আমাদের কথাগুলি বিচার করুন। আমি সব সময় ওকে বলি : এখানে সে তো খুড়ো এড-ডি কং, চমৎকার চাকরি। সকলে তাকে চেনে, সকলে কত প্রশংসা করে। এই তো সেদিন অপ্রাকসিনদের বাড়িতে একটি মহিলাকে বলতে শুনলাম : ইনিই কি বিখ্যাত প্রিন্স আন্দ্রু? সত্যি শুনেছি। সর্বত্রই তার কত সমাদার। সে তো অনায়াসেই সম্রাটের এড-ডি-কং হতে পারে। আপনারা তো জানেন, সম্রাট কত আদর করে তার সঙ্গে কথা বলেন। কেমন করে সে ব্যবস্থাটা করা যায় তা নিয়ে আনেৎ ও আমি কথাও বলেছি। আপনি কি মনে করেন?
পিয়ের বন্ধুর দিকে তাকাল। সে আলোচনাটা পছন্দ করছে না দেখে কোনো জবাব দিল না।
জিজ্ঞাসা করল, আপনারা কবে রওনা হবেন?
ওঃ, তার যাবার কথা আর তুলবেন না, মোটেই তুলবেন না। সে কথা শুনতে আমি চাই না। আজ যখনই মনে পড়ছে যে এইসব মধুর মিলন ভেঙে দিতে হবে…আর তারপরে আপনারা তো জানেন আন্দ্রে…(অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে সে স্বামীর দিকে তাকাল) আমার ভয় করছে, আমার ভয় করছে। ফিসফিস করে সে কথাগুলি বলল; দৃষ্টিতে সে স্বামীর দিকটা কাঁপুনি নেমে গেল আছে দেখে বিস্মিত
পিয়ের ও নিজে ছাড়া আরো একজন ঘরে আছে দেখে বিস্মিত দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কঠিন অথচ বিনীত গলায় প্রিন্স তাকে বলল :
কিসে তোমার ভয় করছে লিজে? আমি তো বুঝতে পারছি না।
এই তো, পুরুষ মাত্রই কী স্বার্থপর : সব, সব্বাই স্বার্থপর! শুধুমাত্র খেয়ালের বশে সে আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে, আমাকে একলা আটকে রেখে যাচ্ছে গ্রামের বাড়িতে।
মনে রেখো, আমার বাবা ও বোনের কাছে, প্রিন্স আন্দ্রু শান্ত স্বরে বলল।
তবু তো একাই…বন্ধুবান্ধব ছাড়া…আর সে আশা করে যে আমি ভীত হব না।
তার গলার স্বর খুঁতখুঁতে; ঠোঁট ওল্টানো; কেমন কাঠবিড়ালীর মতো মুখের ভাব। সে থামল; বুঝতে পারল যে পিয়েরের সামনে নিজের গর্ভাবস্থার কথা বলাটা অশোভন হবে, যদিও সেটাই আসল কথা।
স্ত্রীর দিক থেকে চোখ না সরিয়েই প্রিন্স আন্দু বলল, আমি এখনো বুঝতে পারছি না কিসে তোমার এত ভয়।
প্রিন্সেসের মুখ লাল হয়ে উঠল; হতাশার ভঙ্গিতে সে হাত দুটি তুলল।
না আন্দু, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে তুমি বদলে গেছে। ওঃ, তুমি কত…
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, ডাক্তার তোমাকে সকাল-সকাল শুতে বলেছে। তুমি বরং শুতে চলে যাও।
প্রিন্সেস কোনো কথা বলল না; হঠাৎ তার পাতলা লোমশ ঠোঁট দুটি কাঁপতে লাগল। প্রিন্স আন্দ্রু উঠে দাঁড়াল; কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল।
পিয়ের অবাক বিস্ময়ে কখনো এর দিকে কখনো ওর দিকে তাকাতে লাগল চশমার উপর দিয়ে। উঠতে গিয়েও মনের ইচ্ছাটা পাল্টে নিল।
মঁসিয় পিয়ের এখানে আছেন তো কি হয়েছে? ছোট প্রিন্সেস হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে উঠল; উচ্ছ্বসিত কান্নায় তার সুন্দর মুখখানি বিকৃত হয়ে গেল। অনেক দিন থেকেই তোমাকে বলতে চেয়েছি, আন্দ্রু কেন তুমি আমার প্রতি এতটা বদলে গেছ? আমি তোমার কি করেছি? তুমি যুদ্ধে চলে যাচ্ছ, আমার জন্য তোমার এতটুকু করুণা নেই। কেন? কেন?
লিজে! প্রিন্স আন্দ্রু শুধু এইটুকুই বলল। কিন্তু এই একটি শব্দেই প্রকাশ পেল অনুনয়, শাসানি, এবং এই দৃঢ় প্রত্যয় যে ছোট প্রিন্সেস যা বলেছে তার জন্য তার নিজেরই দুঃখিত হওয়া উচিত। সে কিন্তু তাড়াতাড়ি বলে উঠল, তুমি আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার কর যেন আমি একজন পঙ্গু, একটা ছোেট শিশু। আমি সব বুঝতে পারি! ছমাস আগে কি তুমি এ রকম ব্যবহার করতে?
প্রিন্স আন্দ্রু এবার আরো জোরের সঙ্গে বলল, লিজে, আমার মিনতি, তুমি থাম।
এইসব কথাবার্তা শুনে পিয়ের ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠছিল। এবার সে প্রিন্সেসের কাছে এগিয়ে গেল। চোখের জল সে সইতে পারে না; মনে হল বুঝি সে নিজেই কেঁদে ফেলবে।
শান্ত হোন প্রিন্সেস! আপনার এ-কথা মনে হচ্ছে কারণ…আমি বলছি, এ অভিজ্ঞতা আমার নিজেরও হয়েছে…আর তাই…কারণ…না, না, আমাকে ক্ষমা করুন। বাইরের কোনো লোক এখানে বেমানান…না, আপনি দুঃখ করবেন না।…বিদায়।
প্রিন্স আন্দ্রু তার হাতটা ধরে ফেলল।
দাঁড়াও পিয়ের! এটুকু দয়া প্রিন্সেসের মনে আছে যে আজকের সন্ধ্যাটা তোমার সঙ্গে কাটাবার সুখ থেকে সে আমাকে বঞ্চিত করবে না।
না, সে শুধু নিজের কথাটাই ভাবে, বলতে বলতে তীব্র ক্ষোভে প্রিন্সেসের চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগল।
লিজে! প্রিন্স আন্ডু শুকনো গলায় বলল, তার গলা এতদূর চড়েছে যাতে বোঝা যায় যে তার ধৈর্য ফুরিয়ে গেছে।
সহসা প্রিন্সেসের সুন্দর মুখের সেই ক্রুদ্ধ, কাঠবিড়ালী ধরনের ভাব পাল্টে গিয়ে সেকানে ফুটে উঠল একটা করুণ ভয়ের ভাব। সুন্দর চোখের সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে সে স্বামীর দিকে তাকাল; কুকুর যখন লেজ গুটিয়ে অতি দ্রুত লেজটা নাড়তে থাকে তখন তার মুখে যে ভাব ফুটে ওঠে ঠিক সেই ভাব ফুটে উঠল প্রিন্সেসের মুখে।
