ভিতর থেকে ভয়ার্ত কণ্ঠে কে যেন বলল, আপনি ভিতরে আসবেন না! আসবেন না!
সে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। আর্তনাদ থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড পার হয়ে গেল। তারপর একটা ভয়ংকর চিৎকার ভেসে এল শোবার ঘর থেকে–এ চিৎকার তো তার হতে পারে না, এরকম চিৎকার করতে সে পারে না। প্রিন্স আন্দ্রু দরজার কাছে ছুটে গেল, আর্তনাদ থেকে গেছে, সে শুনতে পেল শিশুর কান্না।
প্রথম সেকেন্ডে প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, একটি শিশুকে ওরা এখানে এনেছে কিসের জন্য? একটি শিশু? কোন শিশু…? ওখানে শিশু কেন? অথবা শিশুটি কি জন্ম নিল?
তখনই সহসা সেই কান্নার আনন্দময় অর্থটি তার হৃদয়ঙ্গম হল, তার স্বর অশ্রুরুদ্ধ হল, জানালার গোবরাটে কনুই রেখে সে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। দরজা খুলে গেল। ডাক্তার বেরিয়ে এল ঘর থেকে। তার গায়ে কোট নেই, হাতের আস্তিন গোটানো, মুখ বিবর্ণ, চোয়াল কাঁপছে। প্রিন্স আন্দ্রু তার দিকে মুখ ঘোরাল, কিন্তু ডাক্তার বিহ্বল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কোনো কথা না বলে চলে গেল। একটি স্ত্রীলোক ছুটে বেরিয়ে এসে প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখে ইতস্তত করে চৌকাঠের উপরেই দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রিন্স আন্দ্রু স্ত্রীর ঘরে ঢুকল। পাঁচ মিনিট আগে যে অবস্থায় দেখে গিয়েছিল তার মৃত স্ত্রী সেইভাবেই শুয়ে আছে, দৃষ্টি স্থির এবং গাল দুটি নিষ্প্রভ হলেও মনোরম শিশুর মতো মুখখানিতে সেই একই ভাব ফুটে আছে।
তার সুন্দর, করুণ, মরা মুখখানি যেন বলছে, আমি তো তোমাদের সবাইকে ভালোবাসি, কারো কোনো ক্ষতি করিনি, আর তুমি আমার জন্য কি করেছ?
ঘরের এককোণে মারি বগদানভনার কাঁপা দুটি শাদা হাতের মধ্যে একটা লাল ক্ষুদে কি যেন তারস্বরে চিৎকার করে চলেছে।
দুই ঘণ্টা পরে আস্তে পা ফেলতে ফেলতে প্রিন্স আন্দ্রু তার বাবার ঘরে গেল। ইতিমধ্যে বুড়ো মানুষটি সবই জানতে পেরেছে। সে দরজার কাছেই দাঁড়িয়েছিল, দরজা খুলতেই তার কর্কশ বার্ধক্যজীর্ণ হাত দুটি সাঁড়াশির মতো ছেলের গলা জড়িয়ে ধরল, কোনো কথা না বলে সে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
.
তিন দিন পরে ছোট প্রিন্সেসকে কবর দেওয়া হল। তাকে বিদায়-চুম্বন দিতে প্রিন্স আন্দ্রু শবাধারের কাছে উঠে গেল। শবাধারের মধ্যে সেই একই মুখ, যদিও চোখ দুটি বোজা। সে চোখ যেন বলছে, আঃ, আমার প্রতি তুমি কি ব্যবহার করেছ? প্রিন্স আন্দ্রুর মনে হল, তার বুকটা ভেঙে যাচ্ছে, এমন একটা পাপ সে করেছে যার কোনো প্রতিকার সে করতে পারবে না, যা সে ভুলতেও পারবে না। কাঁদতেও পারল না। বুড়ো মানুষটিও উঠে এসেছে, বুকের উপর স্থির হয়ে থাকা দুইখানি মোমের মতো ছোট হাতে সেও চুমো খেল, সেই মুখ যেন তাকেও বলল : আঃ, তুমি আমার কি করেছ, কেন করেছ? আর সে দৃশ্য দেখে বুড়ো মানুষটি রেগে সেখান থেকে চলে গেল।
আরো পাঁচদিন কেটে গেল, ছোট্ট প্রিন্স নিকলাস আন্দ্রীভিচ-এর দীক্ষা হল। দাই তার থুতনি দিয়ে ঢাকনাটা চেপে ধরল, আর পুরোহিত একটা হাঁসের পালক দিয়ে বালকের লাল পায়ের পাতায় ও হাতের তালুতে তেল মাখিয়ে দিল।
ঠাকুর্দাই হল তার ধর্মাপ, পাছে শিশুকে ফেলে দেয় এই ভয়ে কাঁপা হাতে শিশুকে ঘুরিয়ে এনে ধৰ্মমা প্রিন্সেস মারির হাতে তুলে দিল। প্রিন্স আন্দ্রু আর একটা ঘরে অনুষ্ঠানের সমাপ্তির অপেক্ষায় বসে রইল। নার্স তাকে নিয়ে এলে সে খুশি হয়ে তার দিকে তাকাল, আর নার্স যখন বলল যে শিশুর চুলের মোম জলে ডুবে না গিয়ে ভেসেই ছিল। (জলে ডুবে যাওয়াটা দুর্ভাগ্যের লক্ষণ) তখন সে ধীরে ধীরে মাথাটা নাড়তে লাগল।
*
অধ্যায়-১০
বুড়ো কাউন্টের চেষ্টায় বেজুখভের সঙ্গে দলখভের দ্বৈত যুদ্ধে রশুভের অংশগ্রহণের ব্যাপারটা চেপে দেওয়া হল, এবং তার পদাবনতি ঘটবে বলে যে আশংকা করা হয়েছিল তার পরিবর্তে সে মস্কোর গভর্নর-জেনারেলের অ্যাডজুটান্টের পদে নিযুক্ত হল। ফলে পরিবারের অন্য সকলের সঙ্গে সে গ্রামের বাড়িতে যেতে পারল না, নতুন কর্তব্যের খাতিরে সারা গ্রীষ্মকালটা তাকে মস্কোতেই কাটাতে হল। দলখভ সুস্থ হয়ে উঠল, আর ভালো হয়ে ওঠার সময়টাকে রস্তভের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। অসুস্থ অবস্থায় দলখভ তার মায়ের কাছেই ছিল, আদরের ফেদিয়ার বন্ধু হিসেবে রস্তভও মারি আইভানভনার খুব প্রিয় পাত্র হয়ে উঠল। প্রায়ই তার সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে অনেক কথা হয়।
মা বলে, সত্যি কাউন্ট, আজকের চরিত্রভ্রষ্টতার যুগে ছেলে আমার বড় ভালো, পবিত্র হৃদয়, এখন কেউ গুণের আদর করে না, সকলের কাছেই সেটা যেন দোষের ব্যাপার। তুমিই বল কাউন্ট, বেজুখভের পক্ষে কাজটা কি ঠিক হয়েছে, সম্মানজনক হয়েছে? আর ফেদিয়া তো এখনো তাকে ভালোবাসে, তার বিরুদ্ধে একটা কথাও বলে না। পিটার্সবুর্গে একজন পুলিশকে নিয়ে ওরা যখন মজা করেছিল, তখনো কি দুই জনে মিলেই সে কাজ করেনি? আর দেখ! বেজুখভ বেকসুর খালাস পেয়ে গেল, আর যত দোষ চাপল ফেদিয়ার ঘাড়ে। একবার ভাব তো, তাকে কত হুজুতি পোয়াতে হয়েছিল! একথা সত্যি যে সে তার স্বপদেই বহাল হয়েছিল, কিন্তু তা না করে কি তাদের উপায় ছিল? তার মতো এমন সাহসী দেশভক্ত ছেলে তো বেশি মেলে না। আর এখন–এই দ্বৈত যুদ্ধ! এ মানুষগুলোর কি মনের বালাই নেই? সম্মান বলে কিছু নেই। একমাত্র ছেলে জেনেও তাকে দ্বৈত যুদ্ধে আহ্বান করা হল, সোজা গুলি করা হল। তবু রক্ষা যে ঈশ্বর আমাদের করুণা করেছেন। আর এসব কিসের জন্য? একটু-আধটু গোপন প্রেম আজকাল কে না করে? আরে, তার মনে যদি এতই ঈর্ষা তো সেটা আগে দেখালেই হত, তা নয়, মাসের পর মাস সেটা চলতে দিয়ে তারপর একেবারে যুদ্ধের ডাক। ফেদিয়া তার কাছ থেকে টাকা ধার করেছিল, কাজেই সে যে যুদ্ধ করবে না এটা তো জানাই ছিল। কী নিচতা! প্রিয় কাউন্ট, আমি জানি তুমি ফেদিয়াকে ঠিক বুঝতে পার। কিন্তু লোকে তাকে বোঝে না। সে এত মহৎ, তার অন্তর এত স্বর্গীয়!
