.
এ রাতটাও মার্চ মাসের সেইসব রাতের অন্যতম যখন মনে হয় শীত বুঝি নতুন করে শাসনক্ষমতা হাতে নিয়েছে, প্রচণ্ড বেগে ছড়িয়ে দিয়েছে তার শেষ বরফ ও ঝড়। বড় রাস্তার বিভিন্ন ঘাঁটিতে পরপর পাঠানো হয়েছে অনেকগুলো ঘোড়া মস্কো থেকে আগত জার্মান ডাক্তারকে আনবার জন্য, যে কোনো মুহূর্তে তার এসে পড়ার কথা, লণ্ঠন হাতে ঘোড়সওয়ারদের পাঠানো হয়েছে গ্রামের ছোট রাস্তার কানাখন্দ ও বরফ-ঢাকা ডোবা পেরিয়ে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসতে।
প্রিন্সেস মারি অনেকক্ষণ হল বই রেখে চুপচাপ বসে আছে। নার্স সাবিশনা বলল, ঈশ্বর করুণাময়, কখনো ডাক্তারের দরকার হয় না।
হঠাৎ একটা বাতাসের ঝাপ্টা প্রচণ্ড বেগে এসে জানালার পাল্লার উপর আছড়ে পড়ল। জানালা থেকে ডবল ফ্রেমগুলো খুলে ফেলা হয়েছে, বুড়ো প্রিন্সের হুকুমে ভরত পাখির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিটি ঘরের একটা করে জানালার ফ্রেম খুলে ফেলা হয়েছে। (রাশিয়ার বাড়িতে শীতকালে ডবল জানালা থাকে। যেহেতু তাতে হাওয়া চলাচলে বাধা হয় সেজন্য আবহাওয়া একটু ভালো হলেই দুটোর একটা ফ্রেম খুলে ফেলাই ভালো।) হাওয়ার দাপটে ঢিলে ছিটকানিটা খুলে যাওয়ায় ঠাণ্ডা বাতাসে ঘরের দামাস্কাস পর্দাগুলো উড়তে লাগল, মোমবাতিগুলো নিভে গেল। প্রিন্সেস মারি শিউরে উঠল, তার নার্স সেলাইটা রেখে জানালার কাছে গেল এবং বাইরে ঝুঁজে পড়ে জানালার পাল্লাটা ধরতে চেষ্টা করল। ঠাণ্ডা হাওয়ায় তার মাথার রুমালের কোণ ও শাদা চুল উড়তে লাগল।
পাল্লাটা ধরে বন্ধ না করেই সে বলল, সোনা প্রিন্সেস, পথে কে যেন গাড়ি ছুটিয়ে আসছে। সঙ্গে লণ্ঠন। খুব সম্ভব ডাক্তার।
হে ঈশ্বর! তোমাকে ধন্যবাদ! প্রিন্সেস মারি বলল। আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। তিনি তো রুশ ভাষা জানেন না।
মাথার উপর একটা শাল জড়িয়ে নবাগতের সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রিন্সেস মারি ছুটে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতেই সামনের ঘরের জানালা দিয়ে দেখাল, লণ্ঠনসহ একটা গাড়ি ফটকে দাঁড়িয়ে আছে। সে সিঁড়ির দিকে গেল।
সিঁড়ির বাঁকে নামতেই পায়ের শব্দ শুনতে পেল। পরিচিত একটা গলার স্বরও যেন কানে এল।
কণ্ঠস্বর বলছে, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আর বাবা?
নায়েব দেমিয়ানের গলায় জবাব শোনা গেল, শুতে গেছেন।
তখন সেই কণ্ঠস্বর আরো কিছু বলল, দেমিয়ান তার জবাব দিল, সিঁড়িতে পায়ের শব্দ দ্রুততর হল।
এ কি আন্দ্রু! প্রিন্সেস মারি ভাবল। না, তা হতে পারে না, সেটা বড় বেশি অসাধারণ ব্যাপার হয়ে যাবে। এই চিন্তায় সঙ্গে সঙ্গেই সিঁড়ির চাতালে দেখা দিল প্রিন্স আর মুখ ও মূর্তি। বরফে ঢাকা মোটা কলারের একটা লোমের জোব্বা তার গায়ে। মোমবাতি হাতে জনৈকি পরিচারক সেখান দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁ, এই তো সেই মুখ, বিবর্ণ, শীর্ণ, ঈষৎ পরিবর্তিত। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে সে বোনকে জড়িয়ে ধরল।
তোমরা আমার চিঠি পাওনি? বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে অপেক্ষা করলেও উত্তর পেত না, কারণ প্রিন্সেসের তখন কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না–সে ঘুরে দাঁড়াল এবং ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে (শেষ ডাক ঘাঁটিতে তাদের দেখা হয়েছিল) আবার দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে হল-ঘরে ঢুকল। সেখানে বোনকে আর একবার আলিঙ্গন করল।
কী বিচিত্র ভাগ্য রে মাশা! জোব্বা ও বুট ছেড়ে সে ছোট প্রিন্সেসের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
*
অধ্যায়-৯
ছোট প্রিন্সেস বালিশে ভর দিয়ে শুয়ে আছে। মাথায় একটা ছোট টুপি (ব্যথাটা সবেমাত্র চলে গেছে), ঘামে ভেজা গালের উপর কালো চুল ছড়িয়ে পড়েছে, সুন্দর গোলাপি মুখের উপর ঠোঁটটি খোলা, খুশির হাসি মুখে লেগে রয়েছে। প্রিন্স আন্দ্রু ঘরে ঢুকল, সোফাটার পায়ের কাছে থেমে স্ত্রীর দিকে তাকাল। শিশুর মতো ভয় ও উত্তেজনায় ভরা দুটি চোখ মেলে সেও স্বামীর দিকে তাকাল। সে চোখ যেন বলছে, আমি তো তোমাদের সব্বাইকে ভালোবাসি, কারো কোনো ক্ষতি করিনি, তাহলে আমি এত কষ্ট পাচ্ছি কেন? আমাকে বাঁচাও! প্রিন্স আন্দ্রু সোফাটা ঘুরে গিয়ে তার কপালে চুমো খেল।
সোনা আমার! সে বলল-এ কথাটি সে আগে কখনো বলেনি। ঈশ্বর করুণাময়…
ছোট প্রিন্সেস জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল, তার চোখে শিশুসুলভ তিরস্কার।
তোমার কাছে আমি সাহায্য পাব আশা করেছিলাম, কিছুই পাইনি! তার চোখ যেন বলতে চাইছে। প্রিন্স আর আগমনে সে অবাক হয়নি, সে যে এসেছে এটাই বুঝতে পারছে না। প্রিন্স আন্দ্রুর আসার সঙ্গে তার যন্ত্রণার বা তার উপশমের কোনো সম্পর্কই নেই। আবার ব্যথা শুরু হল, মারি বগদানভনা প্রিন্স আন্দ্রুকে ঘর থেকে চলে যেতে বলল।
ডাক্তার ঢুকল। প্রিন্স আন্দ্রু বেরিয়ে গেল। প্রিন্সেস মারির সঙ্গে দেখা হওয়ায় দুজনে ফিসফিস করে কথাবার্তা বলতে লাগল, কিন্তু মাঝে মাঝেই কথা থামিয়ে তারা কান পেতে অপেক্ষা করতে থাকল।
প্রিন্সেস মারি বলল, তুমি যাও দাদা।
প্রিন্স আন্দ্রু গিয়ে স্ত্রীর পাশের ঘরে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। একটি স্ত্রীলোক ভয়ার্ত মুখে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখতে পেয়ে থতমত খেয়ে গেল। প্রিন্স আন্দ্রু দু হাতে মুখটা ঢেকে কয়েক মিনিট সেইভাবেই কাটাল। দরজা দিয়ে ভেসে আসছে করুণ, অসহায়, জান্তব আর্তনাদ। প্রিন্স আন্দ্রু উঠে দরজার কাছে গেল, দরজাটা খুলতে চেষ্টা করল। কে যেন সেটাকে আটকে ধরে আছে।
