সে স্থির করেছে সন্তান প্রসবের আগে এই দুঃসংবাদ তাকে জানাবে না, বাবাকেও বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করেছে সব কথা গোপন রাখতে। প্রিন্সেস মারি ও বুড়ো প্রিন্স নিজের মতো করে তাদের দুঃখ সহ্য করতে লাগল। বুড়ো প্রিন্স মনের মধ্যে কোনো আশাই পোষণ করে না, সে স্থির বুঝে নিয়েছে যে প্রিন্স আন্দ্রু নিহত হয়েছে, ছেলের খোঁজ করতে একজন কর্মচারীকে অস্ট্রিয়ায় পাঠালেও এদিকে মস্কোতে একটা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির নির্দেশও পাঠিয়ে দিয়েছে, ছেলের স্মৃতিরক্ষার্থে সেটাকে তার নিজের বাগানে প্রতিষ্ঠা করবে, সকলকেই সে বলে বেড়াতে লাগল যে তার ছেলে যুদ্ধে নিহত হয়েছে। সে চেষ্টা করতে লাগল যাতে তার আগেকার জীবনযাত্রার কোনো পরিবর্তন না ঘটে, কিন্তু শক্তিতে কুলোল না। তার বেড়ানো কমে গেল, আহার কমে গেল, ঘুম কমে গেল, দিন-দিন শরীর দুর্বল হতে লাগল। প্রিন্সেস মারির মনে তবু আশা। জীবিত দাদার জন্যই সে প্রার্থনা করে চলল, তার প্রত্যাবর্তনের সংবাদের জন্য অপেক্ষা করে রইল।
*
অধ্যায়-৮
১৯ মার্চ সকালে প্রাতরাশের সময় ছোট প্রিন্সেস ডাকল, সোনা আমার! পুরনো অভ্যাসবশেই ছোট ঠোঁটটা উপরে ঠেলে উঠল, কিন্তু যেহেতু সেই দুঃসংবাদ আসার পর থেকে এ বাড়ির প্রতিটি কথায়, এমনকি প্রতিটি পায়ের শব্দে ফুটে উঠছে দুঃখের আভাস, তাই হোট প্রিন্সেসের হাসিও সকলকে মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই একই দুঃখের স্মৃতি।
সোনা আমার, আমার ভয় হচ্ছে আজ সকালের ফ্রুস্তিক (কথাটা আসলে ফ্রহুস্তকু=প্রাতরাশ)–রাঁধুনি ফুকা যেভাবে বলে আর কি–আমার ঠিক সহ্য হয়নি।
ছুটে তার কাছে গিয়ে প্রিন্সেস মারি সভয়ে বলল, তোমার কি হয়েছে সোনা আমার? তোমাকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। আঃ, তুমি খুব ফ্যাকাসে হয়ে গেছ।
একটি দাসী কাছেই ছিল, সে বলল, ইয়োর এক্সেলেন্সি, মারি বগদানভনাকে কি ডেকে পাঠানো উচিত নয়? (মারি বগদানভনা একজন ধাত্রী, পাশের শহরে থাকে, গত পক্ষকাল ধরে বল্ড হিলসে আছে।)
প্রিন্সেস মারি সম্মতি জানাল, হা, হয়তো সেই ব্যাপারই হবে। আমি যাই। মনে সাহস আন পরি আমার। লিজাকে চুমো খেয়ে সে যাবার জন্য পা বাড়াল।
না, না, না! বিবর্ণতা ও শারীরিক যন্ত্রণা ছাড়াও ছোট প্রিন্সেসের মুখে ফুটে উঠল অপরিহার্য যন্ত্রণার একটা শিশু সুলভ ভীতি।
না, এটা বদহজম মাত্র…। তুমি বল যে এটা বদহজম, বল মারি! বল…যন্ত্রণাকাতর শিশুর মতো ছোট প্রিন্সেস নিজের খেয়ালেই কাঁদতে শুরু করে দিল। প্রিন্সেস মারি বগদানভনাকে আনার জন্য দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
যেতে যেতেই তার কানে এল, ঈশ্বর আমার! ঈশ্বর আমার! ওঃ!
ধাত্রী ছোট মোটা দুটি হাত ঘষতে ঘষতে নিজের থেকেই আসছিল। তাকে দেখেই প্রিন্সেস মারি সভয়ে বলল, মারি বগদানভনা, মনে হচ্ছে শুরু হয়ে গেছে।
একইভাবে হাঁটতে হাঁটতে মারি বগদানভনা বলল, আচ্ছা, প্রভুকে ধন্যবাদ দিন প্রিন্সেস। তবে আপনাদের মতো তরুণীদের তো এসব জানবার কথা নয়।
কিন্তু মস্কো থেকে ডাক্তার এখনো এলেন না কেন? প্রিন্সেস বলল।
ঠিক আছে প্রিন্সেস, ঘাবড়াবেন না। ডাক্তার ছাড়াই আমরা ভালোভাবে সামাল দিতে পারব।
পাঁচ মিনিট পরে তার ঘর থেকেই প্রিন্সেস মারি একটা ভারি কিছু বয়ে নিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল। সে বাইরে তাকাল। প্রিন্স আর পড়ার ঘরের বড় চামড়ার সোফাটাকে চাকররা শোবার ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের মুখ শান্ত ও গম্ভীর।
প্রিন্সেস মারি নিজের ঘরে একলা বসে বাড়ির নানারকম শব্দ শুনতে পাচ্ছে, আর কেউ সেখান দিয়ে গেলেই দরজা খুলে দেখছে। হঠাৎ তার দরজাটা আস্তে খুলে গেল, আর তার বুড়ি নার্স প্রাস্কোভয়া সাবিশনা মাথায় একটা শাল জড়িয়ে চৌকাঠের উপর দেখা দিল। বুড়ো প্রিন্স নিষেধ করায় আজকার সে এ-ঘরে বড় একটা আসে না।
বুড়ি বলল, তোমার কাছে একটু বসতে এলাম মাশা, প্রিন্সের সন্তের সামনে জ্বালিয়ে দেবার জন্যে তার বিয়ের মোমবাতিগুলো নিয়ে এসেছি। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ওঃ, নার্স, আমি খুব খুশি হলাম!
+ছোট্ট পাখিটি, ঈশ্বর করুণাময়।
নার্স দেবমূর্তির সামনে মোমবাতিগুলো জ্বালিয়ে দিল, তারপর সেলাই নিয়ে দরজার পাশে বসল। প্রিন্সেস মারি একটা বই নিয়ে পড়তে শুরু করল। কোনো পায়ের শব্দ বা গলার স্বর শুনলেই তারা পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছে, প্রিন্সেস উৎকণ্ঠার সঙ্গে নানা প্রশ্ন করছে, আর নার্স তাকে সাহস দিচ্ছে।
দাসীদের বড় হল-ঘরে হাসির শব্দ নেই। চাকরদের হলে সকলেই নীরবে সতর্ক হয়ে অপেক্ষা করে বসে আছে। বাইরে ভূমিদাসদের ঘরে ঘরে মশাল ও মোমবাতি জ্বলছে, কেউ ঘুমোয়নি। বুড়ো প্রিন্স পড়ার ঘরে পা টিপে টিপে পায়চারি করছে, সংবাদ জানবার জন্য তিখোনকে পাঠাল মারি বগদানভনার কাছে গিয়ে শুধু বলবি প্রিন্স আমাকে জানতে পাঠিয়েছেন তারপর সে কি জবাব দেয় আমাকে এসে বলবি।
অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে মারি বগদানভনা বলল, প্রিন্সকে গিয়ে বল, প্রসব-বেদনা শুরু হয়েছে।
তিখোন সে-কথা প্রিন্সকে জানাল।
খুব ভালো! বলে প্রিন্স দরজাটা বন্ধ করে দিল, তারপরে পড়ার ঘর থেকে এতটুকু শব্দ আর তিখোন শুনতে পেল না।
কিছুক্ষণ পরে মোমবাতির পলতে কেটে দেবার জন্য তিখোন আবার ঘরে ঢুকে দেখল প্রিন্স সোফায় শুয়ে আছে, তার ক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে তিখোন মাথাটা নাড়ল, তার কাছে গিয়ে নিঃশব্দে তার কাঁধে চুমো খেল, তারপর সলতে না কেটে বা কাউকে কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পৃথিবীর সবচাইতে পবিত্র রহস্য তার পথেই এগিয়ে চলল। সন্ধ্যা পার হল, রাত নামল, সেই অতলস্পর্শের মুখোমুখি হয়ে কারো অন্তরের উৎকণ্ঠা ও দুর্বলতা এতটুকু হ্রাস পেল না, বরং বেড়েই চলল। কারো চোখে ঘুম নেই।
