কুতুজভ লিখেছে, একটি রেজিমেন্টের প্রধান হিসেবে পতাকা হাতে নিয়ে আপনার পুত্র আমার চোখের সামনেই মাটিতে পড়ে গেল-পিতা ও পিতৃভূমির উপযুক্ত সন্তান হিসেবে একটি বীরের মতোই মাটিতে পড়ল। আমার পক্ষে এবং সমগ্র বাহিনীর পক্ষে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে সে বেঁচে আছে কিনা সেটাই এখনো অনিশ্চিত। আমার ও আপনার কাছে এই আশাই একমাত্র সান্ত্বনা যে আপনার পুত্র জীবিত আছে, কারণ অন্যথায় সন্ধির পতাকার সঙ্গে রণক্ষেত্রে প্রাপ্ত অফিসারদের যে তালিকা আমাকে পাঠানো হয়েছে তাতে তার উল্লেখ অবশ্যই থাকত।
সন্ধ্যার কিছু পরে এই সংবাদ যখন আসে বুড়ো প্রিন্স তখন তার পড়ার ঘরে একাই ছিল, পরদিন সকালে সে যথারীতি বেড়াতে বের হল, কিন্তু নায়েব, মালী ও স্থপতির কাছে চুপ করেই থাকল, তাকে খুব গম্ভীর দেখালেও কাউকে কিছুই বলল না।
প্রিন্সেস মারি যখন নির্দিষ্ট সময়ে তার ঘরে গেল তখনো সে লেদতেন্ত্র কাজে ব্যস্ত ছিল, এবং যথারীতি মুখ ঘুরিয়ে তাকে চেয়েও দেখেনি।
হঠাৎ বাটালিটা ফেলে দিয়ে অস্বাভাবিক গলায় ডাকল, আঃ, প্রিন্সেস মারি!
মারি তার কাছে এগিয়ে গেল, তার মুখের দিকে তাকাল, বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল। বাবার মুখের ভাবে দুঃখ নয়, ভেঙে পড়ার লক্ষণ নয়, ছিল শুধু ক্রোধ ও অস্বাভাবিকতা। সেই মুখ দেখেই মারি বুঝতে পারল, একটা ভয়ংকর দুর্ভাগ্য তার মাথার উপর ঝুলছে, তাকে বিচূর্ণ করতে উদ্যত হয়েছে, তার জীবন এসেছে সেই চরমতম দুর্ভাগ্য যা আগে কখনো তার অভিজ্ঞতায় ধরা দেয়নি, যা অপূরণীয় ও সকল বোধের অতীত–প্রিয়জনের মৃত্যু।
বাবা! আন্দ্রু! এমন অবর্ণনীয় দুঃখ ও আত্মবিস্মৃতির সঙ্গে বিচলিত প্রিন্সেস কথা দুটি বলল যে তার বাবা মেয়ের চোখের দিকে তাকাতে না পেরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে দূরে সরে গেল।
দুঃসংবাদ! বন্দিদের মধ্যেও তার নাম নেই, নিহতদের মধ্যেও নেই! কুতুজভ লিখেছেন… এমন মর্মন্তুদ স্বরে সে আর্তনাদ করে উঠল যেন সেই আর্তনাদের দ্বারাই সে প্রিন্সেসকে জানিয়ে দিতে চাইল…নিহত।
প্রিন্সেস মাটিতে পড়ে গেল না বা মূৰ্ছিত হল না। তার মুখ আগেই বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এই কথাগুলো শোনার পরে তার মুখটা বদলে গেল, সুন্দর চোখ দুটিতে কী যেন ঝলমল করে উঠল। যেন কোনো আনন্দ-জাগতিক সুখ-দুঃখের অতীত এক পরম আনন্দ-তার অন্তরের চরম দুঃখকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল। বাবাকে ঘিরে যত ভয় সব সে ভুলে গেল, তার কাছে এগিয়ে গেল, তার হাত ধরল, তাকে নিচু করে দুই হাতের শীর্ণ অস্থির গলাটা জড়িয়ে ধরল।
বলল, বাবা, আমাকে দূরে ঠেলে দিও না, এসো আমরা একসঙ্গে কাঁদি।
পাজির দল! বদমাসের দল! মেয়ের কাছ থেকে মুখটা ঘুরিয়ে বুড়ো আর্তনাদ করে উঠল। সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করল, মানুষগুলোকে মারল! কিন্তু কেন? যাও, যাও, লিজেকে বলল।
অসহায়ভাবে পাশের হাতল-চেয়ারটায় বসে পড়ে প্রিন্সেস কাঁদতে লাগল। দাদা যখন তার ও লিজার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিল ঠিক সেই চেহারাটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল : চোখের দৃষ্টি কোমল অথচ সগর্ব।
চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সে বলল, বাবা, কেমন করে এটা ঘটল আমাকে বলো।
যাও! যাও! যুদ্ধে মারা গেছে, সেই যুদ্ধে যেখানে রাশিয়ার সব সেরা মানুষদের আর রাশিয়ার গৌরবকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। যাও প্রিন্সেস মারি। যাও, লিজেকে বলল। আমি পরে যাচ্ছি।
প্রিন্সেস মারি যখন বাবার কাছ থেকে ফিরে গেল, ছোট প্রিন্সেস তখন বসে বসে কাজ করছিল। প্রিন্সেস মারির দিকে না তাকিয়ে সে তাকিয়ে ছিল মনের মধ্যে… নিজের মধ্যে… সেখানে আনন্দময় ও রহস্যময় যা ঘটে চলেছে সেইদিকে।
সেলাইটা সরিয়ে রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে বলল, তোমার হাতটা দাও। তারপর ননদের হাতটা ধরে কোমরের নিচে রাখল।
তার চোখে প্রত্যাশার হাসি, লোমশ ঠোঁটটা একটু তুলল, শিশুর মতো হাসি ফুটিয়ে তেমনই তুলেই রাখল।
প্রিন্সেস মারি তার পাশে হাঁটু ভেঙে বসে তার পোশাকের ভাজের মধ্যে মুখ লুকাল।
এখানে, এখানে! বুঝতে পারছ? আমার এমন অদ্ভুত লাগে। তুমি কি জান মারি, ওকে আমি খুব ভালোবাসব। খুশি ভরা উজ্জ্বল চোখ মেলে তাকিয়ে লিজা বলল।
প্রিন্সেস মারি মাথা তুলতে পারল না, সে কাঁদছে।
কি হয়েছে মারি?
কিছু না…আমার বড় খারাপ লাগছে…আন্দ্রুর জন্য মন কেমন করছে, চোখের পানি মুছে মারি বলল।
সারাটা সকাল প্রিন্সেস মারি বার কয়েক চেষ্টা করল লিজার মনটাকে প্রস্তুত করতে, কিন্তু প্রতিবারই শুধু কাঁদতে লাগল। হোট প্রিন্সেসের খেয়াল কিছু কম, তবু কারণ না বুঝলেও এই কান্না দেখে সেও বিচলিত বোধ করল। মুখে কিছুই বলল না, কিন্তু চারদিকে কি যেন খুঁজে বেড়াতে লাগল।
ডিনারের আগে বুড়ো প্রিন্স তার ঘরে এল। লিজা তাকে সবসময়ই ভয় পায়। কেমন যেন অস্থিরভাবে সে ঘরে ঢুকল। আবার কোনো কথা না বলেই বেরিয়ে গেল। দেখে শুনে হতভম্ব হয়ে ছোট প্রিন্সেস হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল।
বলল, আন্দ্রুর কোনো খবর এসেছে কি?
না, তুমি তো জান খবর আসার সময় এখনো হয়নি। কিন্তু আমার বাবা চিন্তিত হয়ে পড়েছে, আর তাই আমারও ভয় করছে।
তাহলে কোনো খবর আসেনি?
না, প্রিন্সেস মারি একদৃষ্টিতে লিজার দিকে তাকিয়ে বলল।
