সেই রাতেই খানসামাকে ডেকে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে নিতে বলল, সে পিটার্সবুর্গে চলে যাবে। স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলার কথা সে ভাবতেই পারল না। স্থির করল, পরদিনই সে চলে যাবে, একটা চিঠি লিখে তাকে জানিয়ে যাবে যে চিরদিনের মতো সে তাকে ত্যাগ করতে চায়।
পরদিন সকালে কফি নিয়ে ঘরে ঢুকে খানসামা দেখল, একখানা খোলা বই হাতে নিয়ে পিয়েরের অটোমানের উপর শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। জেগে উঠে অবাক হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল, সে যে কোথায় আছে সেটাই বুঝতে পারছে না।
খানসামা বলল, কাউন্টেস আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি বাড়িতে আছেন কি না।
পিয়ের স্ত্রীকে কী বলে পাঠাবে সেটা স্থির করার আগেই রুপোর কাজকরা শাদা সাটিনের ড্রেসিং-গাউন পরে কাউন্টেস নিজেই ঘরে ঢুকল। তার শান্ত, গম্ভীর মুখের মর্মরসদৃশ ভুরুর উপর একটা ক্রোধের ভাঁজ পড়েছে শুধু। খানসামার সামনে সে কোনো কথা বলল না। দ্বৈত যুদ্ধের খবর সে জেনেছে, আর তা নিয়ে কথা বলতেই এসেছে। খানসামা কফির সরঞ্জাম সাজিয়ে দিয়ে ঘর থেকে চলে যাওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করে রইল। পিয়ের চশমার ফাঁক দিয়ে ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকাল, শিকারি কুকুরপরিবৃত খরগোসের মতো সে বই পড়াটাই চালিয়ে যেতে চেষ্টা করল। কিন্তু সে কাজটা যেমন অর্থহীন তেমনই অসম্ভব বুঝতে পেরে সে পুনরায় ভীরু চোখে স্ত্রীর দিকে তাকাল। স্ত্রী কিন্তু বসল না, তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে তার দিকে তাকিয়ে খানসামার চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
তারপর কঠিন স্বরে বলল, আচ্ছা, এসব কী হচ্ছে? আমি জানতে চাই তুমি এসব কী করে বেড়াচ্ছ?
আমি? আমি কি… পিয়ের তো তো করে বলল।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তুমি এখন মহাবীর, কী বল? শোন, কী নিয়ে এ দ্বৈতযুদ্ধ হল? কী প্রমাণ করতে চাও? তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি।
অটোমানের উপর ঘুরে পিয়ের মুখ খুলল, কিন্তু কিছু বলতে পারল না।
হেলেনই আবার কথা বলল, তুমি যদি জবাব না দাও তো আমিই বলি।… লোকে যা বলে তুমি তাই বিশ্বাস কর। লোকে বলল… হেলেন হেসে উঠল, …দলখভ আমার প্রেমিক আর তুমি তাই বিশ্বাস করলে। আচ্ছা, তুমি কি প্রমাণ করলে? এই দ্বৈত যুদ্ধে কী প্রমাণ হল? প্রমাণ হল যে তুমি একটা বোকা, কিন্তু সে কথা তো সকলেই জানে। এর ফল কী হবে? সারা মস্কো আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে, সকলেই বলবে যে মাতাল হয়ে, কী করছ না বুঝেই বিনা কারণে একটা মানুষের প্রতি ঈর্ষাবশত তুমি তাকে দ্বৈত যুদ্ধে আহ্বান করেছ।
হেলেনের গলা ক্রমেই চড়তে লাগল, সে ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠল, অথচ সে মানুষটি সব দিক থেকে তোমার চাইতে অনেক ভালো…
তার দিকে না তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে পিয়ের গরগর করে শুধু বলল, হুম…হুম…
আর তুমিই বা কী করে বিশ্বাস করলে যে সে আমার প্রেমিক? কেন? কারণ তার সঙ্গ আমার ভালো লাগে? তুমি যতি আরো বুদ্ধিমান হতে, আরো প্রীতিপ্রদ হতে, তাহলে তো তোমার সঙ্গই আমার ভালো লাগত।
আমাকে কিছু বলল না… তোমাকে মিনতি করছি, কর্কশ গলায় পিয়ের তো তো করে বলল।
কেন বলব না? আমার যা খুশি তাই বলব, তোমাকে খোলাখুলিই বলছি, তোমার মতো স্বামীর স্ত্রীর হয়েও অন্য প্রেমিকে আসক্ত হয়নি এরকম স্ত্রীর সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু সে কাজও আমি করিনি।
পিয়ের কী যেন বলতে চাইল, এমন চোখ তুলে তাকাল যার অর্থ হেলেন বুঝতে পারল না, তারপর আবার শুয়ে পড়ল। সেই মুহূর্তে তার শারীরিক কষ্ট হচ্ছে, বুকের উপর যেন একটা বোঝ চেপে বসেছে, শ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে।
ভাঙা গলায় তো-তো করে বলল, আমাদের আলাদা হওয়াই ভালো।
আলাদা! খুব ভালো, অবশ্য তুমি যদি আমাকে সম্পত্তি দিয়ে দাও, হেলেন বলল। আলাদা! এই কথা শুনিয়ে আমাকে ভয় দেখাতে চাও!
লাফ দিয়ে সোফা থেকে উঠে পিয়ের টলতে টলতে তার দিকে ছুটে গেল।
টেবিলের উপর থেকে শ্বেতপাথরের কাগজ-চাপাটাতে সজোরে চেপে ধরে সেটাকে ঘোরাতে ঘোরাতে আরো কয়েক পা এগিয়ে পিয়ের চেঁচিয়ে বলল, আমি, তোমাকে খুন করব!
হেলেনের মুখটা ভয়ংকর হয়ে উঠল, আর্তনাদ করে সে লাফিয়ে একপাশে সরে গেল। পিয়েরের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করল তার বাবার প্রকৃতি। সে অনুভব করল বিকৃত মনের আকর্ষণ ও উল্লাস। পাথরটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল, সেটা টুকরো-টুকরো হয়ে গেল, দুই হাত বাড়িয়ে হেলেনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভয়ংকর স্বরে চিৎকার করে বলল বেরিয়ে যাও! যে সারা বাড়িটাই সড়য়ে সে কথাটা শুনতে পেল। হেলেন যদি ঘর থেকে পালিয়ে না যেত তাহলে সেই মুহূর্তে সে যে কি করে বসত তা ঈশ্বরই জানেন।
.
এক সপ্তাহ পরে তার সম্পত্তির বড় অংশ বৃহত্তর রাশিয়ার সব জমিদারির পূর্ণ কর্তৃত্ব স্ত্রীকে দিয়ে পিয়ের একাকি পিটার্সবুর্গ যাত্রা করল।
*
অধ্যায়-৭
অস্তারলিজের যুদ্ধ ও প্রিন্স আন্দ্রুর নিখোঁজ হবার খবর বন্ড হিলসে পৌঁছার পরে দুই মাস কেটে গেছে, দূতাবাসের মারফত চিঠিপত্র পাঠানো এবং নানাবিধ খোঁজখবর সত্ত্বেও তার কোনো খবরই পাওয়া যায়নি, বন্দির তালিকাতেও তার নাম নেই। তার আত্মীয়স্বজনের পক্ষে যেটা সব চাইতে খারাপ সেটা হল, এখনো এমন একটা সম্ভাবনা আছে যে স্থানীয় লোকরা হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে তাকে তুলে নিয়ে গেছে এবং সে হয়তো এখনো অপরিচিত লোকদের মধ্যে শয্যাশায়ী হয়ে হয় ভালো হয়ে উঠছে আর না হয়তো মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে, অথচ নিজের কোনো খবর পাঠাতে পারছে না। যে গেজেট থেকে বুড়ে প্রিন্স অস্তারলিজে পরাজয়ের খবর প্রথম জেনেছিল তাতে যথারীতি খুব সংক্ষেপে ও অস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে চমৎকার যুদ্ধ করার পর রুশদের পশ্চাদপসরণ করতে হয় এবং তারা সুশৃঙ্খলভাবে সরে যেতে পেরেছে। এই সরকারি প্রতিবেদন থেকেই বুড়ো প্রিন্স বুঝতে পারে যে আমাদের বাহিনী পরাজিত হয়েছে। অস্তারলিজের যুদ্ধর গেজেট প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরে কুতুজভের কাছ থেকে পাওয়া একটা চিঠিতে বুড়ো প্রিন্স ছেলের ভাগ্যবিপর্যয়ের কথা জানতে পেরেছে।
