করুণা ও অনুতাপের মৃদু হাসি হেসে, হাত ও পা অসহায়ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে, পিয়ের তার চওড়া বুকটা দলখভের দিকে সোজা করে মেলে ধরে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। দেনিসভ, রস্তভ ও নেসভিৎস্কি চোখ বুজল। ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের কানে এল গুলির আওয়াজ ও দলখভের কুদ্ধ চিৎকার।
ফস্কে গেল! বলেই দলখভ অসহায়ভাবে মুখ থুবড়ে বরফের উপর পড়ে গেল। পিয়ের নিজের কপাল চেপে ধরে হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে ঘন বরফের উপর দিয়ে বনের দিকে ছুটতে ছুটতে অসংলগ্নভাবে বলতে লাগল :
বোকামি…বোকামি!…মিথ্যা কথা…
নেসভিৎস্কি তাকে থামিয়ে বাড়ি নিয়ে গেল।
আহত দলখভকে নিয়ে রস্তভ ও দেনিসভও ফিরে গেল।
দলখভ চোখ বুজে নীরবে স্লেজের মধ্যে শুয়ে রইল, কোনো প্রশ্নেরই জবাব দিল না। কিন্তু মস্কোতে ঢুকেই সহসা সে যেন সম্বিৎ ফিরে পেল, একটু চেষ্টা করে মাথাটা তুলে রভের হাতটা চেপে ধরল।
রভ বলল, আচ্ছা? কেমন বোধ করছ?
খারাপ! কিন্তু সেকথা থাক বন্ধু– হাঁপাতে হাঁপাতে দলখভ বলল। আমরা এখন কোথায়? মস্কোতে তা জানি। আমার কি হল তাতে কিছু যায় আসে না, কিন্তু তাকে আমি মেরে ফেললাম, মেরে ফেললাম…এ আঘাত সে সইতে পারবে না! সে বাঁচবে না…
কে রস্তভ জিজ্ঞেস করল। আমার মা! আমার মা, আমার স্বর্গের দেবী, আমার আরাধ্যা জননী!রস্ততের হাতে চাপ দিয়ে দলখভ কেঁদে ফেলল।
একটু শান্ত হয়ে সে রস্তভকে বুঝিয়ে বলল, সে এখন মার কাছেই আছে, তাকে এভাবে মরতে দেখলে মা বাঁচবে না। রশুভকে অনুরোধ করল, সে যেন আগেই গিয়ে তার মাকে প্রস্তুত করে তোলে।
সেই কথামতো কাজ করতে রস্তভ এগিয়ে গেল। আর সবিস্ময়ে জানতে পারল যে ঝগড়াটে দলখভ, ষণ্ডামার্কা দলখভ মস্কোতে থাকে তার বুড়ি মা ও কুঁজী বোনের সঙ্গে, তার মতো স্নেহময় সন্তান ও ভাই দ্বিতীয়টি হয় না।
*
অধ্যায়-৬
ইদানীং স্ত্রীর সঙ্গে নির্জনে পিয়েরের বড় একটা দেখাসাক্ষাৎ ঘটে না। কি পিটার্সবুর্গে, কি মস্কোতে, তাদের বাড়িটা সব সময়ই অতিথি সমাগমে ভরে থাকে। দ্বৈত যুদ্ধের পরে সে-রাতে সে তার শোবার ঘরে গেল না, অন্য অনেক দিনের মতোই তার বাবার ঘরেই রইল–সেই বড় ঘরটা যেখানে কাউন্ট বেজুখভ মারা গিয়েছিল।
সোফায় শুয়ে পড়ল, ভাবল, ঘুমিয়ে পড়লেই সবকিছু ভুলে যাবে, কিন্তু ঘুমতে পারল না। এতসব ভাব, চিন্তা ও স্মৃতি ঝড়ের বেগে সহসা মনের মধ্যে ঢুকতে লাগল যে সে ঘুমতে পারল না, এমন কি এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতেও পারল না, লাফ দিয়ে উঠে ঘরময় অতিদ্রুত পায়চারি করতে লাগল।
নিজেকে প্রশ্ন করল, কি ঘটেছে? তার প্রেমিককে, আমার স্ত্রীর প্রেমিককে আমি খুন করেছি। হ্যাঁ, ঠিক তাই! কিন্তু কেন? কেন এ কাজ করলাম?–ভিতর থেকে কে যেন জবাব দিল, কারণ তুমি তাকে বিয়ে করেছ।
কিন্তু আমার দোষটা কোথায়? সে জিজ্ঞেস করল। ভালো না বেসে তাকে বিয়ে করায়, নিজেকে ও তাকে ঠকানোতে। প্রিন্স ভাসিলির বাড়িতে নৈশভোজনের ঠিক পরের সেই মুহূর্তটি স্পষ্টভাবে তার মনে পড়ে গেল যখন কোনোরকমে সে বলতে পেরেছিল : আমি তোমাকে ভালোবাসি। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, সেখান থেকেই শুরু, তখনই এটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বুঝতে পেরেছিলাম এটা ঠিক হচ্ছে না, একাজ করার কোনো অধিকার আমার ছিল না। আর আজ সেটাই সত্য হয়ে উঠেছে।
আনাতোল প্রায়ই আমার স্ত্রীর কাছে আসত টাকা ধার করতে, তার খোলা কাঁধে চুমো খেতে। সে তাকে টাকা দিত না, কিন্তু চুমো খেতে দিত। তার বাবা ঠাট্টা করে তার মনে ঈর্ষা জাগাতে চাইত, কিন্তু সে শান্ত হাসির সঙ্গে জবাব দিত যে ঈর্ষান্বিত হবার মতো বোকা সে নয় : তার যা ইচ্ছা করুক, আমার সম্পর্কে সে বলত। একদিন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, গর্ভাবস্থার কোনো লক্ষণ সে বুঝতে পারছে কি না। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সে জবাব দিল, সন্তান কামনা করবার মতো বোকা সে নয়, আমার সন্তানকেও সে গর্ভে ধারণ করবে না।
তখনই তার মনে পড়ে গেল স্ত্রীর নিচু স্তরের চিন্তার কথা, তার ভাষার গ্রাম্যতার কথা, অথচ বেশ উঁচু মহলেই সে লালিত-পালিত হয়েছিল।
আমি তেমন বোকা নই।…চেষ্টা করেই দেখা না।…তুমি এ ব্যাপারে নাক গলাতে এস না, সে প্রায়ই বলত। যুবক, বৃদ্ধ ও নারীদের সঙ্গে স্ত্রীর চালচলনের সাফল্য দেখে পিয়ের কিছুতেই বুঝতে পারত না কেন সে তার স্ত্রীকে ভালোবাসে না।
সে নিজেকে বলতে লাগল, হা, আমি তাকে কোনোদিন ভালোবাসিনি, আমি জানতাম সে চরিত্রহীনা, তবু নিজের কাছে সেটা স্বীকার করার সাহস আমার ছিল না। আর এখন জোরকরা হাসির সঙ্গে বরফের উপর বসে দলখভ মরতে বসেছে, আর নকল সাহসিকতার সঙ্গে আমার মনস্তাপকে উপভোগ করছে।
সব, সব আমার স্ত্রীর দোষ, কিন্তু তাতে কী হল? তার ব্যাপারে আমি কেন অন্ধ হয়ে ছিলাম? না, দোষ আমার, আমাকেই ভুগতে হবে।… কি? আমার নামে কলঙ্ক লাগবে? আমার জীবনে দুর্ভাগ্য দেখা দেবে? আঃ, যত সব বাজে কথা।
পিয়েরের মাথায় নতুন চিন্তা দেখা দিল : মোড়শ লুইর মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল কারণ লোকে বলে সে ছিল সম্মানের অযোগ্য ও অপরাধী, আর তাদের দিক থেকে তারা ঠিকই বলে, আবার যারা তাকে মহাপুরুষ বলে মনে করে তার জন্য শহীদের মৃত্যু বরণ করেছিল তারাও তো ঠিকই বলে। পরে রোবেস পিয়েরের মাথা কাটা গেল সে স্বেচ্ছাচারী বলে। কে ঠিক, আর কার ভুল? কেউ না! যতক্ষণ বেঁচে আছবেঁচে থাক, কালই তো তুমিও মরে যেতে পার, যেমন একঘণ্টা আগে আমিও মরতে পারতাম। অনন্তকালের তুলনায় মানুষ যখন মাত্র একটি মুহূর্তের জীবনের অধিকারী তখন অনুশোচনার যন্ত্রণায় সময় কাটানো চলে কি?
