যখন সব ব্যবস্থা হয়ে গেল, সীমানা-নির্ধারণের জন্য বরফের মধ্যে তরবারি পোতা, হল, পিস্তলে গুলি ভরা হল, তখন নেসভিৎস্কি গেল পিয়েরের কাছে।
ভীরু গলায় সে বলল, এই সংকটকালে, অতীব সংকট-মুহূর্তে আপনাকে যদি পুরো সত্য কথাটা না বলি তাহলে আমার কর্তব্যে ত্রুটি ঘটবে, আমাকে আপনার সমর্থক নির্বাচন করে যে বিশ্বাস ও সম্মান আপনি আমাকে দেখিয়েছেন তার প্রতি অবিচার করা হবে। এই ব্যাপারের, এবং এ নিয়ে রক্তপাত ঘটাবার যথেষ্ট কারণ নেই বলেই আমি মনে করি।…আপনি ঠিক কাজ করেননি…আবেগের বশে আপনি…
সত্যি, খুবই বোকার মতো কাজ করেছি, পিয়ের বলল।
নেসভিৎস্কি বলল, তাহলে আপনার এই আক্ষেপের কথাটা প্রকাশ করার অনুমতি দিন, আমার বিশ্বাস আপনার প্রতিপক্ষও সেটা মেনে নেবেন। আপনি তো বোঝেন কাউন্ট, কোনো ব্যাপার সংশোধনের অতীত হয়ে যাবার আগেই ভুলটাকে স্বীকার করা অনেক বেশি সম্মানজনক। তাতে কোনো পক্ষেরই অপমান নেই। তাহলে অনুমতি করুন, ওদের বলি…
পিয়ের বলে উঠল, না! বলাবলির কি আছে? সবই সমান…সব প্রস্তুত তো? শুধু বলে দাও কোথায় যেতে হবে, কোথায় গুলি ছোঁড়া হবে? অস্বাভাবিক শান্ত হাসির সঙ্গে সে বলল।
পিস্তলটা হাতে নিয়ে সে ঘোড়া টেপার ব্যাপারে নানা কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগল, কারণ এর আগে সে কখনো হাত দিয়ে পিস্তল ধরেনি–অথচ সে কথাটা স্বীকার করার ইচ্ছা নেই।
ওঃ, হ্যাঁ, এইভাবে, আমি জানি, তবে ভুলে গিয়েছিলাম, সে বলল।
ক্ষমা চাইবার প্রশ্নই ওঠে না, দেনিসভের মিটমাটের প্রস্তাবের উত্তরে এই কথা বলে দলখভও নির্দিষ্ট জায়গার দিকে এগিয়ে গেল।
দ্বৈত যুদ্ধের স্থান নির্বাচিত হয়েছে রাস্তা থেকে আমি পা দূরে। পাইনের বনের মধ্যে একটা পরিষ্কার ছোট জায়গা, বরফে ঢাকা, গত কয়েকদিন হল বরফ গলতেও শুরু করেছে। পরিষ্কার জায়গাটার একপ্রান্তে গিয়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী চল্লিশ পা দূরে দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল। বরফ গলার ফলে জায়গাটা কুয়াশায় ঢেকে গেছে, চল্লিশ পা দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তিন মিনিট হয়ে গেল সকলেই প্রস্তুত, কিন্তু সকলেই দেরি করতে লাগল, সকলেই নিশ্চুপ।
*
অধ্যায়-৫
দলখভ বলল, তাহলে শুরু হোক!
ঠিক আছে, একইভাবে হেসে পিয়ের বলল।
বাতাসে একটা ত্রাসের অনুভূতি ছড়িয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে, হাল্কাভাবে শুরু হলেও ব্যাপারটাকে এখন আর এড়ানো যাবে না, মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর না করে ঘটনা এখন নিজের পথেই এগিয়ে চলেছে। দেনিসভই প্রথম সীমানায় গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল :
প্রতিপক্ষরা যখন মিটমাট করতে রাজি হলেন না তখন কাজ শুরু হোক। আপনাদের পিস্তল তুলে নিন, আর তিন বলার সঙ্গে সঙ্গে অগ্রসর হোন।
এক, দুই, তিন! চিৎকার করে বলেই সে একপাশে সরে গেল।
দুই প্রতিপক্ষ এগিয়ে চলল, ক্রমাগতই একে অপরের কাছাকাছি হতে লাগল, কুয়াশার ভিতর দিয়ে পরস্পরকে দেখতে পেল। সীমানার কাছে পৌঁছে যে কোনো সময় গুলি ছুঁড়বার অধিকার তাদের আছে। দলখভ পিস্তল না তুলেই ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল, তার উজ্জ্বল ঝকঝকে নীর চোক একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখের দিকে।
তাহলে আমি যখন খুশি গুলি করতে পারি? পিয়ের বলল। তিন বলার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট পথ ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে যেতে গিয়ে তার পা পড়ল পুরু বরফের মধ্যে। ছয় পা এগিয়ে সে আবার বরফের মধ্যে পা ফেলল, নিজের পায়ের দিকে তাকাল, তারপরেই অতি দলখভের দিকে তাকিয়ে আঙুল বাঁকিয়ে ঘোড়া টিপল। পিস্তলের শব্দ যে এত বেশি হবে তা সে বুঝতে পারেনি, শব্দ শুনে কেঁপে উঠে পরমুহূর্তেই সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কুয়াশার আরো বেশি ঘন হওয়া ধোয়ার ভিতর দিয়ে প্রথমে সে কিছুই দেখতে পেল না, যে দ্বিতীয় গুলির শব্দটা সে আশা করেছিল তাও শোনা গেল না। শুধু শুনতে পেল দলখভের দ্রুত পায়ের শব্দ, ধোয়ার ভিতর দিয়ে তার মূর্তিটা চোখে পড়ল। এক হাতে বাঁ দিকটা চেপে ধরেছে, অন্য হাতে ধরে আছে হেলেপড়া পিস্তলটা। মুখটা বিবর্ণ। রস্তভ ছুটে গিয়ে কী যেন বলল।
না-আ-আ! দলখভ দাঁতের ফাঁক দিয়ে কথাটা উচ্চারণ করল, না, এখনো শেষ হয়নি! টলতে টলতে আরো কয়েক পা এগিয়ে একেবারে তলোয়ারের কাছে পৌঁছে সে বরফের উপর এলিয়ে পড়ল। বাঁ হাতটা রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে, হাতটাকে কোটের উপর মুছে তার উপরেই শরীরের ভার রাখল। ভ্রুকুঞ্চিত বিবর্ণ মুখখানা কাঁপছে।
দয়া… দলখভ কথাটা পুরো উচ্চারণ করতে পারল না।
অনেক চেষ্টার পর বলল, দয়া কর।
কোনোরকমে কান্না চেপে পিয়ের দলখভের দিকে ছুটে গেল, কিন্তু সীমানা পেরিয়ে যাবার আগেই দলখভ চিৎকার করে উঠল, তোমার সীমানায় ফিরে যাও!
তার কথার অর্থ বুঝতে পেরে পিয়ের নিজের তরবারির কাছেই থেমে গেল। দুজনের মাঝখানে মাত্র দশ পায়ের ব্যবধান। দলখভ বরফের উপর মাথাটা নিচু করল, লোভীর মতো তাতে কামড় বসল, তারপর মাথাটা তুলে কোনোরকমে উঠে বসল। চুষে চুষে ঠাণ্ডা বরফটা গিলে ফেলল, ঠোঁট কাঁপতে লাগল, কিন্তু দুই চোখে তখনো হাসির ঝিলিক। অবশিষ্ট শক্তি একত্র করে পিস্তলটা তুলে নিশানা স্থির করল।
পাশে সরে যান। নিজেকে পিস্তল দিয়ে আড়াল করুন! নেসভিকি চেঁচিয়ে বলল।
