পিয়ের ভাবতে লাগল, হা, সে খুবই সুদর্শন, আমি তাকে চিনি। যেহেতু আমি তার উপকার করেছি, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি, তাকে সাহায্য করেছি, তাই আমার নামে কলঙ্ক লেপন করতে, আমাকে পরিহাসের পাত্র করে তুলতে তার তো মজা লাগবেই। এটা যদি সত্যি হয় তাহলে আমাকে ঠকাবার আনন্দটা যে কত মশলাদার হবে সেটা তো আমি জানি, বুঝি। হ্যাঁ, যদি এটা সত্যি হয়, কিন্তু আমি এটা বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করার কোনো অধিকার আমার নেই, বিশ্বাস করতে আমি পারি না। রস্তভ বারবার পিয়েরের দিকে তাকাচ্ছিল এবং তার অন্যমনস্কতা ও তাকে না চনিতে পারার জন্য পিয়েরের উপর বিরক্ত হচ্ছিল। এমন কি যখন সম্রাটের স্বাস্থ্য পান করা হচ্ছিল তখনো পিয়ের চিন্তায় ডুবে ছিল, উঠে দাঁড়াল না, গ্লাসটাও তুলে ধরল না।
বেপরোয়া হয়ে রস্তভ চেঁচিয়ে বলল, তোমার কি হয়েছে? শুনতে পাচ্ছ না হিজ ম্যাজেস্টি সম্রাটের। স্বাস্থ্যপান করা হচ্ছে।
পিয়ের দীর্ঘশ্বাস ফেলল, মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়াল, গ্লাসটা শেষ করল, তারপর সকলে বসে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে সদয় হাসি হেসে রস্তভের দিকে মুখ ফেরাল।
বলল, আরে আমি তো তোমাকে চিনতেই পারিনি! কিন্তু রস্তভ তখন অন্য কাজে ব্যস্ত, সে হুররা বলে চেঁচাচ্ছে।
দলখভ রশুভকে বলল, পরিচয়টা নতুন করে ঝালিয়ে নাও না কেন?
লজ্জা পাবে, ও একটা মুখখু! রস্তভ বলল।
সুন্দরী রমণীদের স্বামীর সঙ্গে দহরম-মহরম রাখা উচিত, দেনিসভ বলল।
এই সব কথাবার্তা ধরতে না পারলেও পিয়ের বুঝল যে তার কথাই হচ্ছে। মুখ লাল করে সে সরে গেল।
আচ্ছা, এবার তাহলে সুন্দরী নারীদের স্বাস্থ্যের উদ্দেশে, মুখখানা গম্ভীর হলেও ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি ফুটিয়ে দলখভ গ্লাসটা নিয়ে পিয়েরের দিকে এগিয়ে গেল।
বলল, পিতারকিন, এ গ্লাস মনোরমা নারীদের স্বাস্থ্যের উদ্দেশে–আর তাদের প্রেমিকদেরও!
দলখভের দিকে না তাকিয়ে বা তার কথার জবাব না দিয়ে পিয়ের চোখ নামিয়ে গ্লাসে চুমুক দিল। পরিচারক কুতুজভের গীতি-কাব্যের পুস্তিকাটি বিলি করছিল, অন্যতম প্রধান অতিথি হিসেবে পিয়েরের সামনেও একখানা রাখল। পিয়ের হাত বাড়াবার আগেই দলখভ ঝুঁকে পড়ে সেটা ছিনিয়ে নিয়ে পড়তে শুরু করে দিল। দলখভের দিকে তাকিয়ে পিয়ের চোখ নামাল। যে ভয়ংকর দানবীয় কিছু এতক্ষণ তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছিল সেটা আবার মাথা তুলে তাকে পেয়ে বসল। টেবিলের উপর সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ে সে চেঁচিয়ে উঠল, কোন সাহস তুমি ওটা নিলে?
সে চিৎকার শুনে এবং কাকে বলা হচ্ছে বুঝতে পেরে নেসভিৎস্কি ও পার্শ্ববর্তী ভদ্রলোক সভয়ে বেজুকভের দিকে মুখ ঘোরাল।
ভীত গলায় ফিসফিস করে বলল, ওরকম করবেন না! করবেন না! আপনার হল কি?
নিষ্ঠুর খুশি-খুশি চোখে দলখভ পিয়েরের দিকে তাকাল, তার সেই বিশেষ হাসিটি যেন বলতে চাইছে, আহা! এই তো আমি চাই!
পরিস্কার গলায় বলল, এটা তুমি পাবে না!
পিয়েরের মুখ কালো হয়ে গেছে, ঠোঁট কাঁপছে, পুস্তিকাটি সে একটানে ছিনিয়ে নিল।
হুংকার দিয়ে বলল…, তুমি…! তুমি…তুমি শয়তান। আমি তোমাকে দ্বৈত যুদ্ধে আহ্বান করছি! চেয়ারটা ঠেলে দিয়ে সে উঠে দাঁড়াল।
ঠিক সেই মুহূর্তে কথাগুলি বলার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীর দোষের যে প্রশ্নটা সারা দিন তাকে যন্ত্রণা দিয়েছে তার একটা চরম ও নিঃসন্দেহে সমর্থনসূচক উত্তর যেন সে পেয়ে গেল। মনে জাগল স্ত্রীর প্রতি ঘৃণা, চিরদিনের মতো তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তখনকার মতো পিয়ের বাড়ি ফিরে গেল, কিন্তু দলখভ ও দেনিসভকে নিয়ে রস্তভ আরো অনেক সময় ক্লাবেই থাকল, জিপসি ও অন্যান্যদের গান শুনল।
ক্লাবের ফটকে রভের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় দলখভ বলল, আচ্ছা, তাহলে কাল দেখা হচ্ছে সকোলনিকিতে।
তোমার মন বেশ শান্ত আছে তো? রস্তভ জিজ্ঞেস করল।
দলখভ একটু চুপ করে থেকে তারপর কথা বলল।
দেখ, দুটো কথায় তোমাকে দ্বৈত যুদ্ধের সব গোপন তথ্য বলে দিচ্ছি। দ্বৈত যুদ্ধে না মরবার আগে তুমি যদি একটা উইল কর, বাবা-মাকে মমতাভরা চিঠি লেখ, যদি মনে কর তুমি মারা যাবে, তাহলে তুমি একটা মূর্খ, তোমার পরাজয় অনিবার্য। তুমি যুদ্ধে যাবে এই দৃঢ় অভিপ্রায় নিয়ে যে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তুমি প্রতিপক্ষকে মেরে ফেলবে, বাস, তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কমায় আমাদের ভালুক-শিকারী বলত, সকলেই ভালুককে ভয় করে, কিন্তু ভালুককে সামনাসামনি দেখামাত্রই তোমার সব ভয় চলে যাবে, তোমার একমাত্র চিন্তা হবে সেটাকে ছেড়ে না দেওয়া! আমিও ঠিক তাই বলি। A demain, mon cher. (প্রিয় বন্ধু কাল দেখা হবে।)
পরদিন সকাল আটটায় পিয়ের ও নেসভিৎস্কি ঘোড়ায় চড়ে সকোলনিকি বনে পৌঁছে দেখল, দলখভ, দেনিসভ ও রস্তভ আগেই সেখানে হাজির হয়েছে। পিয়েরের বিপর্যস্ত মুখটা হলদে হয়ে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে, রাতে সে ঘুমোতে পারেনি। দুটো চিন্তায় সে সম্পূর্ণ ডুবে আছে : এক, তার স্ত্রীর দোষ-বিদ্রি রাত কাটাবার পরে এ সম্পর্কে তার মনে তিলমাত্র সন্দেহ নেই, আর দুই, দলখভের নির্দোষিতা। পিয়ের ভাবছে, তার জায়গায় হলে আমিও তো এই করতাম। তাহলে কেন এই দ্বৈতযুদ্ধ, এই হত্যা! হয় আমি তাকে হত্যা করব, না হয় সে আমার মাথায়, কনুইতে বা হাঁটুতে আঘাত করবে। আমি কি এখান থেকে চলে যেতে পারি, দৌড়ে পালাতে পারি, কোথাও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারি? আবার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও করছে, আর কত দেরি? সব প্রস্তুত তো?
